৩১ আগস্ট : নেপালে ভয়াবহ হড়পা বান ও বন্যার পাঁচ দিন পরও পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়নি। প্রতিদিনই উদ্ধার হচ্ছে একের পর এক মৃতদেহ। সরকারি হিসাব অনুযায়ী, মৃতের সংখ্যা ৮০০-এর কাছাকাছি পৌঁছেছে। এখনও নিখোঁজ রয়েছেন আড়াই হাজারেরও বেশি মানুষ। নিখোঁজদের মধ্যে ভারতীয়-সহ বিভিন্ন দেশের নাগরিকও রয়েছেন।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে হাসপাতাল ও মর্গগুলিতে। চিতওয়ান হাসপাতালের মর্গ ইতিমধ্যেই পূর্ণ হয়ে গিয়েছে। জায়গার অভাবে মেঝেতেও রাখতে হচ্ছে মৃতদেহ। অশনাক্ত দেহের সংখ্যা ক্রমেই বাড়ছে। পচন ধরতে শুরু করায় ছড়িয়ে পড়ছে দুর্গন্ধ। জনস্বাস্থ্য নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন বিশেষজ্ঞরা। তাঁদের আশঙ্কা, দীর্ঘদিন দেহ সংরক্ষণ করা না গেলে সংক্রমণ ও রোগব্যাধি ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
মর্গে জায়গা না থাকায় অশনাক্ত মৃতদেহগুলিকে গণকবর দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে চিতওয়ান জেলা প্রশাসন। এক প্রশাসনিক আধিকারিকের কথায়, অশনাক্ত দেহের সংখ্যা ক্রমেই বাড়ছে। বাড়িগুলিতে শীতাতপ নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা করেও দেহ সংরক্ষণ করা হচ্ছে। কিন্তু সেখানেও জায়গা শেষ হয়ে আসায় গণকবর দেওয়া ছাড়া আর কোনও বিকল্প থাকছে না।
এদিকে, চিতওয়ান হাসপাতালের মর্গের বাইরে স্বজনহারা মানুষের ভিড় ক্রমেই বাড়ছে। নিখোঁজ প্রিয়জনের ছবি বা কোনও পরিচয়চিহ্নের আশায় হাসপাতাল চত্বরে অপেক্ষা করছেন বহু মানুষ। চিতওয়ান এক্সপো সেন্টারেও দূরদূরান্ত থেকে আসা পরিবারের সদস্যদের ভিড়। কান্না আর উৎকণ্ঠায় ভারী হয়ে উঠেছে পরিবেশ।
বিপর্যয়ের পাঁচ দিন পরেও বিভিন্ন জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের সুড়ঙ্গে বহু শ্রমিক আটকে থাকার আশঙ্কা রয়েছে। আপার ত্রিশূলী জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের সুড়ঙ্গে প্রায় সাড়ে তিনশো মানুষ আটকে রয়েছেন বলে জানা গেছে। নেপালি সেনার প্রায় ১০ হাজার সদস্য উদ্ধার অভিযানে নেমেছেন। পাশাপাশি ভারত ও চিনের বিশেষজ্ঞ দলও উদ্ধারকাজে সহযোগিতা করছে। নেপালের বিভিন্ন জলবিদ্যুৎকেন্দ্রের সুড়ঙ্গে মোট প্রায় ৯০০ শ্রমিক আটকে পড়েছেন বলে প্রশাসনিক সূত্রে খবর।
আটকে থাকা শ্রমিকদের উদ্ধারে সুড়ঙ্গের ভিতরে অক্সিজেন সরবরাহ এবং ভারী যন্ত্রপাতি ব্যবহার করা হচ্ছে। তবে সময় যত গড়াচ্ছে, জীবিত অবস্থায় তাঁদের উদ্ধারের সম্ভাবনা ততই ক্ষীণ হয়ে আসছে।
হড়পা বানে ক্ষতিগ্রস্ত বিস্তীর্ণ এলাকায় উদ্ধারকাজও কঠিন হয়ে পড়েছে। কাদা ও ধ্বংসস্তূপের স্তর সরিয়ে রাস্তা তৈরি করা সম্ভব হচ্ছে না সব জায়গায়। ফলে অনেক ক্ষেত্রে হেলিকপ্টারের সাহায্যে উদ্ধার অভিযান চালাতে হচ্ছে। এখনও পর্যন্ত প্রায় ৩৮০০ মানুষকে উদ্ধার করা হয়েছে বলে জানা গেছে।
এদিকে, নেপালের বীর হাসপাতালের পর টিচিং হাসপাতালেও উঠে এসেছে বিপর্যয়ের ভয়াবহ ছবি। হাসপাতালের দেওয়ালজুড়ে সাঁটানো হয়েছে নিখোঁজদের ছবি ও পোস্টার। প্রিয়জনের সন্ধানে সেখানে হন্যে হয়ে ঘুরছেন আত্মীয়রা।
ভয়াবহ এই প্রাকৃতিক বিপর্যয়ে নেপালের জনজীবন ও অর্থনীতি কার্যত বিপর্যস্ত। উদ্ধারকারী দল থেকে শুরু করে নিখোঁজদের পরিবার—সকলেই এখন অপেক্ষা করছেন কোনও অলৌকিক সুসংবাদের।



