বিশ্বজিৎ আচার্য, শিলচর।
বরাক তরঙ্গ, ১১ আগস্ট : স্বাধীনতা দিবসকে সামনে রেখে তিরঙ্গার রঙে সাজতে শুরু করেছে কাছাড়। দেশপ্রেম, জাতীয় ঐক্য এবং নাগরিক দায়িত্বের বার্তা সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে ‘হর ঘর তিরঙ্গা’ অভিযানকে ঘিরে জেলাজুড়ে নেওয়া হয়েছে একগুচ্ছ কর্মসূচি। একই সঙ্গে ১৪ আগস্ট যথাযথ মর্যাদায় পালিত হবে ‘বিভাজন বিভীষিকা স্মৃতি দিবস’। স্কুলের পড়ুয়া থেকে শুরু করে যুবসমাজ, স্বনির্ভর গোষ্ঠী, নাগরিক সংগঠন, সরকারি কর্মী সমাজের বিভিন্ন স্তরের মানুষকে এই কর্মসূচির সঙ্গে যুক্ত করার উদ্যোগ নিয়েছে জেলা প্রশাসন।
মঙ্গলবার শিলচরে জেলা আয়ুক্তের কার্যালয়ের পুরনো সম্মেলন কক্ষে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে গোটা কর্মসূচির বিস্তারিত তুলে ধরেন কাছাড়ের নবনিযুক্ত জেলা আয়ুক্ত রাহুল কুমার গুপ্ত, আইএএস। উপস্থিত ছিলেন অতিরিক্ত জেলা আয়ুক্ত ডেভিড কুমার বরা এসিএস।
এদিন সাংবাদিকদের জেলা আয়ুক্ত জানান, স্বাধীনতা দিবসের আবহকে আরও জনমুখী করে তুলতেই কর্মসূচিগুলির পরিকল্পনা করা হয়েছে। দেশপ্রেমের পাশাপাশি পরিচ্ছন্নতা, সামাজিক দায়বদ্ধতা, সম্প্রীতি এবং গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের বার্তাও পৌঁছে দেওয়া হবে এই উদ্যোগের মাধ্যমে। তাঁর বক্তব্য, সমাজের সর্বস্তরের মানুষের অংশগ্রহণেই ‘হর ঘর তিরঙ্গা’ প্রকৃত অর্থে একটি গণ-উদযাপনে পরিণত হবে।
তিনি জানান ইতিমধ্যেই ৯ আগস্ট জেলা পুলিশ এবং জেলা পরিবহণ বিভাগের যৌথ উদ্যোগে অনুষ্ঠিত হয়েছে ‘তিরঙ্গা বাইক র্যালি’। শিলচরের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ রাস্তা পরিক্রমা করা এই র্যালিতে দেখা যায় উৎসাহব্যঞ্জক অংশগ্রহণ। জাতীয় গৌরব ও দেশপ্রেমের বার্তা নিয়ে শহরের পথে বেরিয়ে আসা র্যালিটি স্বাধীনতা দিবসের আগে কর্মসূচির সূচনাপর্বে বিশেষ মাত্রা যোগ করেছে।
এর পরেই ১০ থেকে ১৪ আগস্ট পর্যন্ত জেলার সরকারি ও বেসরকারি স্কুল এবং বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে চলছে অঙ্কন, প্রবন্ধ ও বিতর্ক প্রতিযোগিতা। শিক্ষা দফতরের বিভিন্ন কর্মসূচির পাশাপাশি NCC ও NSS-এর সমন্বয় এবং স্কুল পরিচ্ছন্নতার উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে। ১৪ আগস্ট গান্ধী ভবনে হবে এই প্রতিযোগিতাগুলির চূড়ান্ত পর্ব। দেশের স্বাধীনতার ইতিহাস, গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ এবং জাতীয় ঐক্যের চেতনাকে নতুন প্রজন্মের মধ্যে আরও গভীর করে তোলাই এই উদ্যোগের লক্ষ্য।
স্বাধীনতার উৎসবের সঙ্গে পরিচ্ছন্নতার বার্তাকেও জুড়ে দিয়েছে জেলা প্রশাসন। ১০ থেকে ১৪ আগস্ট পর্যন্ত সরকারি দফতর, স্কুল, বাজার, জনসাধারণের স্থান এবং বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় চলছে পরিচ্ছন্নতা অভিযান। শিলচর পুর নিগম , লক্ষীপুর, সোনাই ও বদরপুর মিউনিসিপ্যাল বোর্ড, জেলা পরিষদ, বিডিও, নাগরিক সমাজ এবং বিভিন্ন সরকারি বিভাগের সহযোগিতায় এই কর্মসূচি বাস্তবায়িত হচ্ছে।
১২ আগস্ট বিকেল ৫টায় ডিএসএ শিলচর থেকে শুরু হবে ‘তিরঙ্গা র্যালি’। র্যালিটি গান্ধী বাগ পার্কের দিকে এগিয়ে যাবে। সেখানে গাওয়া হবে ‘বন্দে মাতরম্’। জেলা প্রশাসন ও পুলিশের পাশাপাশি NCC, NYK, NSS, ASRLM, NULM, বিভিন্ন নাগরিক সংগঠন, জেলা ক্রীড়া বিভাগ এবং অন্যান্য সরকারি বিভাগের প্রতিনিধিরাও এই কর্মসূচিতে অংশ নেবেন।
শুধু শহরেই নয়, দেশপ্রেমের এই বার্তা পৌঁছে যাবে গ্রামাঞ্চলেও। ১২ ও ১৩ আগস্ট ব্লক স্তরে আয়োজন করা হবে প্রভাত ফেরি এবং র্যালির। ASRLM ও ডেভেলপমেন্ট ব্লকগুলির সমন্বয়ে আয়োজিত এই কর্মসূচিতে CEO, জেলা পরিষদ এবং DSW-ও অংশ নেবেন। তিরঙ্গা স্টল, বিক্রয় কার্যক্রম, র্যালি এবং স্বনির্ভর গোষ্ঠীগুলির অংশগ্রহণের মাধ্যমে স্থানীয় উদ্যোগ ও জনসম্পৃক্ততাকে উৎসাহ দেওয়া হবে।
১৩ আগস্ট জেলার স্কুল, অঙ্গনওয়াড়ি কেন্দ্র, গাঁও পঞ্চায়েত কার্যালয়, ব্লক অফিস এবং সার্কেল অফিসে একযোগে গাওয়া হবে ‘বন্দে মাতরম্’। শিক্ষা বিভাগ , সমাজকল্যাণ দফতর, CEO, জেলা পরিষদ, সার্কেল অফিসার এবং CDC অফিসগুলির সমন্বয়ে এই কর্মসূচি বাস্তবায়িত হবে। অর্থাৎ জেলা সদর থেকে প্রত্যন্ত গ্রাম প্রতিটি স্তরেই পৌঁছবে স্বাধীনতা ও দেশপ্রেমের বার্তা।
দেশপ্রেমের সঙ্গে মানবিকতার বার্তাও থাকছে কর্মসূচিতে। জয়েন্ট ডিরেক্টর অব হেলথ সার্ভিসেস (JDHS)-এর সমন্বয়ে আয়োজন করা হচ্ছে একটি রক্তদান শিবির। স্বাধীনতা দিবসের উদযাপনকে সামাজিক দায়বদ্ধতার সঙ্গে যুক্ত করার ক্ষেত্রে এই উদ্যোগ বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ।
১৪ আগস্ট পালিত হবে ‘বিভাজন বিভীষিকা স্মৃতি দিবস’। দেশভাগের সময় মানুষের অসীম দুর্ভোগ, বাস্তুচ্যুতি এবং আত্মত্যাগের স্মৃতিকে শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করবে জেলা প্রশাসন। ওই দিন সন্ধ্যা ৬টা ৩০ মিনিটে শিলচরের ডি এস এ স্পোর্টস কমপ্লেক্স থেকে শুরু হবে মোমবাতি মিছিল। দেশভাগের যন্ত্রণা ও সেই সময়ের অসংখ্য মানুষের আত্মত্যাগের প্রতি শ্রদ্ধা জানানো হবে এই মিছিলের মাধ্যমে। পাশাপাশি আয়োজন করা হবে রক্তদান শিবিরেরও।
জেলা আয়ুক্ত জানান, গোটা কর্মসূচিকে সর্বজনীন করে তুলতে সরকারি দফতরের পাশাপাশি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, স্থানীয় সংস্থা, যুব সংগঠন, স্বনির্ভর গোষ্ঠী, ব্যবসায়ী সংগঠন, NGO এবং নাগরিক সমাজকে যুক্ত করা হয়েছে। জেলা প্রশাসন, পুলিশ, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও সমাজকল্যাণ দফতর, NCC, NSS, NYK, ASRLM, NULM, জেলা পরিষদ, ডেভেলপমেন্ট ব্লক, পুরসভা, সার্কেল অফিস, চেম্বারস অব কমার্স, ফুড গ্রেইন্স মার্চেন্টস অ্যাসোসিয়েশন-সহ বিভিন্ন দফতর ও সংগঠন কর্মসূচি সফল করতে একযোগে কাজ করছে।
এদিন সাংবাদিক বৈঠকে কাছাড়বাসীর উদ্দেশ্যে জেলা আয়ুক্ত রাহুল কুমার গুপ্তের আবেদন, স্বাধীনতার এই উৎসবে সকলে স্বতঃস্ফূর্ত ভাবে অংশ নিন এবং গর্ব ও মর্যাদার সঙ্গে ঘরে ঘরে তিরঙ্গা উত্তোলন করুন। তাঁর আহ্বান, ‘হর ঘর তিরঙ্গা’ যেন কেবল একটি কর্মসূচি হয়ে না থেকে ভারতের ঐক্য, বৈচিত্র্য, সম্প্রীতি এবং গণতান্ত্রিক চেতনার এক বৃহত্তর সম্মিলিত উদযাপনে পরিণত হয়। একই সঙ্গে পরিচ্ছন্নতা, নাগরিক দায়িত্ব এবং স্বাধীনতা সংগ্রামীদের আত্মত্যাগের প্রতি শ্রদ্ধার মূল্যবোধও যেন আরও দৃঢ় হয়।



