দিল্লির সাধারণ মেয়ে থেকে সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি! আফ্রিকায় ইতিহাস গড়ে ভারতের সর্বোচ্চ আদালতে ডাক পেলেন

Spread the news

৭ আগস্ট : মাত্র সাত বছর বয়সে জীবিকার তাগিদে বাবা-মায়ের হাত ধরে দেশ ছেড়ে আফ্রিকায় পাড়ি জমিয়েছিলেন এক ছোট্ট বালিকা। দীর্ঘ পাঁচ দশক পর সেই দিল্লির মেয়েটাই বিশ্বজুড়ে ভারতীয় বংশোদ্ভূতদের জন্য এক অনন্য ইতিহাস রচনা করলেন। জাম্বিয়ার সুপ্রিম কোর্টের প্রথম ভারতীয় বংশোদ্ভূত এবং প্রথম মহিলা বিচারপতি হিসেবে ঐতিহাসিক দায়িত্ব পালনের পর, ভারতের প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্তের বিশেষ আমন্ত্রণে দেশের সর্বোচ্চ আদালতের বিচারপীঠে আসন গ্রহণ করলেন বিচারপতি আভা নায়্যার প্যাটেল।

জাম্বিয়ার বিচারবিভাগের ইতিহাসে তো বটেই, ভারতের সর্বোচ্চ আদালতের এজলাসেও এভাবে কোনো জাম্বীয় বিচারপতির উপস্থিতি এই প্রথম।

১৯৭৩ সালে পরিবারের সঙ্গে জাম্বিয়ায় পাড়ি জমান আভা। সেখানেই তাঁর বেড়ে ওঠা এবং আইনি জীবনের বর্ণাঢ্য সূচনা। জাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আইন বিষয়ে স্নাতক (এলএলবি) ডিগ্রি অর্জনের পর তিনি যুক্তরাজ্যের বিখ্যাত কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর (এলএলএম) সম্পন্ন করেন। ১৯৮৯ সালে জাম্বিয়া বার অ্যাসোসিয়েশনে অন্তর্ভুক্ত হওয়ার পর তিনি পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। পরবর্তীতে ২০০৮ সালে ইংল্যান্ড ও ওয়েলসের সুপ্রিম কোর্টের রোল অব সলিসিটরস হিসেবেও নিজের নাম নথিভুক্ত করেন। ২০১৬ সালে তাঁকে মর্যাদাপূর্ণ ‘স্টেট কাউন্সেল’ সম্মানে ভূষিত করা হয়। বহু বছর ধরে পুরুষশাসিত আইনি পেশায় নিজের কঠোর পরিশ্রম, নিখুঁত সততা ও পেশাদারিত্বের জোরে তিনি এক অনন্য উচ্চতা অর্জন করেন।

আইনি পেশার পাশাপাশি তিনি একজন অত্যন্ত দক্ষ পর্বতারোহীও। ইতিমধ্যেই তিনি সাহসিকতার পরিচয় দিয়ে আফ্রিকার সর্বোচ্চ শৃঙ্গ মাউন্ট কিলিমাঞ্জারো সফলভাবে জয় করেছেন। এ ছাড়া তিনি একজন দক্ষ মধ্যস্থতাকারী ও প্রশিক্ষক হিসেবে আন্তর্জাতিক স্তরে বিশেষ পরিচিতি অর্জন করেছেন এবং চার্টার্ড ইনস্টিটিউট অব আরবিট্রেটরস-এর ফেলো নির্বাচিত হয়েছেন। জাম্বিয়ার বিচারব্যবস্থায় তাঁর এই দীর্ঘ ও সফল যাত্রার পর ২০১৯ সালের ৭ মার্চ জাম্বিয়ার হাইকোর্টের বিচারপতি নিযুক্ত হন তিনি। কিটওয়ে হাইকোর্টের কমার্শিয়াল ডিভিশনের বিচারপতি-ইন-চার্জ হিসেবে দায়িত্ব পালনের পর ২০২৩ সালের ৩ এপ্রিল তিনি কোর্ট অব আপিলে উন্নীত হন। অবশেষে ২০২৬ সালের ২৭ মে জাম্বিয়ার সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি হিসেবে শপথ নিয়ে তিনি বিশ্বমঞ্চে ভারতের মুখ উজ্জ্বল করেন।

সাম্প্রতিক নয়াদিল্লি সফরে এসে ভারতের সুপ্রিম কোর্টের এজলাসে প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত এবং অন্যান্য বিশিষ্ট বিচারকদের পাশাপাশি বিশেষ মর্যাদায় আসন গ্রহণ করেন বিচারপতি প্যাটেল। দেশের অ্যাটর্নি জেনারেল আর ভেঙ্কটরামানি সহ শীর্ষ আইনি আধিকারিকরা তাঁকে উষ্ণ সংবর্ধনা জানান। সফরকালে ‘এসসিএওআরএ’ আয়োজিত এক বিশেষ অনুষ্ঠানে ‘দ্য ফিউচার অব জাস্টিস ডেলিভারি’ শীর্ষক বিষয়ে মূল বক্তৃতায় তিনি স্পষ্ট ভাষায় জানান যে, বিচার প্রদান ব্যবস্থা মূলত উদ্ভাবন, সততা এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক ধারণার উপর প্রতিষ্ঠিত। বিচারিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই ব্যবহারের ক্ষেত্রে সতর্কবার্তা দিয়ে তিনি উল্লেখ করেন যে, প্রযুক্তির অতিরিক্ত ব্যবহারে যেন ঐতিহাসিক পক্ষপাত বা বৈষম্যের প্রতিফলন না ঘটে। দিল্লির এক সাধারণ বালিকা থেকে আফ্রিকার দেশের সুপ্রিম কোর্টের শীর্ষ আসনে পৌঁছানো এবং দেশের শীর্ষ আদালতের বিচারপীঠে বিশেষ অতিথি হিসেবে আসন গ্রহণ-আভা নায়্যার প্যাটেলের এই গৌরবময় পথচলা আজ বিশ্বজুড়ে প্রতিটি ভারতীয়র কাছে এক অদম্য অনুপ্রেরণার দীক্ষী হয়ে উঠেছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *