বরাক তরঙ্গ, ২০ জুলাই : শিবসাগর জেলায় দিখৌ নদী ভয়াবহ বন্যা পরিস্থিতি ক্রমশ আরও সংকটজনক হয়ে উঠছে। বন্যাকবলিত এলাকায় আটকে পড়া মানুষদের উদ্ধারে সেনাবাহিনীর হেলিকপ্টার ও মোটরচালিত নৌকা মোতায়েন করা হলেও তা পর্যাপ্ত নয় বলে অভিযোগ তুলেছেন স্থানীয়রা। এখনও হাজার হাজার মানুষ জলবন্দি অবস্থায় রয়েছেন। বহু দুর্গত পরিবারের কাছে পর্যাপ্ত খাদ্য, বিশুদ্ধ পানীয় জল ও প্রয়োজনীয় ত্রাণসামগ্রী পৌঁছায়নি বলে জানা গেছে।

স্থানীয়দের অভিযোগ, এসডিআরএফ, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা বিভাগ এবং জেলা প্রশাসনের ত্রাণ ও উদ্ধারকাজ প্রত্যাশিত গতিতে এগোচ্ছে না। দীর্ঘ সময় ধরে বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন থাকায় পানীয় জল সংগ্রহ ও দৈনন্দিন জীবনযাত্রাও মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে। জলসম্পদ মন্ত্রীর ভূমিকা নিয়েও ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন বন্যাদুর্গতরা।
সংবাদ লেখা পর্যন্ত দিখৌ নদীর বন্যায় শিবসাগর জেলায় অন্তত চারজনের মৃত্যুর খবর মিলেছে। এছাড়া একাধিক ব্যক্তি এখনও নিখোঁজ রয়েছেন। সোমবারও বন্যার জল নতুন নতুন এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে। ঐতিহাসিক বরআলি, খরিকটীয়া আলি, চিপাহীগাঁও সড়ক এবং জোলাগাঁও সড়ক সম্পূর্ণভাবে জলমগ্ন হয়ে পড়েছে।
রবিবার নাগা পাহাড় থেকে নেমে আসা প্রবল জলস্রোতে নদীতীরবর্তী শতাধিক গ্রাম প্লাবিত হয়। চন্টক ও বিহুবর এলাকায় বাড়িঘরের পাশাপাশি প্রধান সড়কও কোমরসমান জলে তলিয়ে যায়। হঠাৎ বন্যার জেরে বহু মানুষ ঘরের আসবাবপত্র ও প্রয়োজনীয় সামগ্রী নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়ার সুযোগ পাননি। প্রাণ বাঁচাতে অনেকে বাড়ির ছাদে আশ্রয় নিয়ে উদ্ধারকারীদের অপেক্ষায় রয়েছেন।

চন্টক পাঁচ আলির বাসিন্দা চিংকি বেগম ঘর থেকে জিনিসপত্র সরানোর সময় বন্যার জলে ভেসে যান। তাঁকে উদ্ধারের চেষ্টা করতে গিয়ে আরেক ব্যক্তি প্রবল স্রোতে নিখোঁজ হয়ে যান। পরে স্থানীয়রা চিংকি বেগমের মরদেহ উদ্ধার করলেও ওই ব্যক্তির এখনও কোনও সন্ধান মেলেনি। অন্যদিকে, আমগুড়ি এলাকায় আরও এক ব্যক্তি বন্যার জলে ভেসে গেছেন বলে খবর।
রবিবার সন্ধ্যায় শিবসাগরের দিখৌ সেতুর নিচে নদীতে একটি অজ্ঞাতপরিচয় পুরুষের মরদেহ ভেসে যেতে দেখেন স্থানীয় বাসিন্দারা। কালো প্যান্ট ও শার্ট পরিহিত মরদেহটি আংশিক পচাগলা অবস্থায় ছিল বলে জানা গেছে।
চন্টক এলাকায় শত শত নারী, পুরুষ ও শিশু কোমরসমান জল পেরিয়ে নিরাপদ স্থানে আশ্রয় নিয়েছেন। আবার অনেক পরিবার শিশু ও মহিলাদের নিয়ে বাড়ির ছাদে রাত কাটাতে বাধ্য হয়েছে। পরে শুরু হওয়া ভারী বৃষ্টিতে তাঁদের দুর্ভোগ আরও বেড়েছে। দিচাংঘাট থেকে আত্মীয়ের বাড়িতে বেড়াতে আসা একটি পরিবার একটি ছোট্ট শিশুকে নিয়ে এখনও বাড়ির ছাদে আটকে রয়েছে বলে জানা গেছে।

এদিকে শিমলুগুড়ি অঞ্চলের একাধিক নদীতীরবর্তী গ্রাম এবং গেলেকি এলাকার বিস্তীর্ণ অঞ্চল বন্যার জলে প্লাবিত হয়েছে। নাগাল্যান্ড থেকে নেমে আসা প্রবল জলস্রোতে নামদাং উপনদী উপচে পড়ায় কলগাঁও, গোহাঁবাড়ি, হাতীপটি, শিঙিবিল, মোরানগাঁও ও বামগাঁওসহ বিস্তীর্ণ এলাকা জলমগ্ন হয়ে পড়েছে।
গেলেকির ‘অয়েল ভ্যালি চা উদ্যোগ’-এর বিস্তীর্ণ চা-বাগান বন্যার জলে তলিয়ে গিয়ে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। একাধিক সড়ক ডুবে যাওয়ায় যোগাযোগ ব্যবস্থা কার্যত বিচ্ছিন্ন। এলাকার বিশিষ্ট ব্যবসায়ী রাজু আলি জানান, গত পাঁচ দশকে গেলেকিতে এত ভয়াবহ বন্যা তিনি দেখেননি। বর্তমানে শত শত পরিবার জলবন্দি অবস্থায় চরম দুর্ভোগের মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন।



