বিশ্বকাপ সেমিফাইনালে আর্জেন্টিনা-ইংল্যান্ড: ইতিহাস, আবেগ ও নতুন মহারণ

Spread the news

বদর উদ্দিন মজুমদার
(প্রাক্তন জেলা ক্রীড়াধিকারিক)
১৫ জুলাই : ফুটবল বিশ্বকাপের সেমিফাইনালের ইতিহাসে দুর্দান্ত এক রেকর্ড রয়েছে বর্তমান চ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনার। বিশ্বকাপের সেরা চারের লড়াইয়ে এখন পর্যন্ত কখনও হারেনি আলবিসেলেস্তেরা। পাঁচবার সেমিফাইনাল খেলে প্রতিবারই জয় তুলে নিয়ে ফাইনালে পৌঁছেছে তিনবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়নরা।
অন্যদিকে, ২০২৬ বিশ্বকাপের হিসাব বাদ দিলে ইংল্যান্ড এখন পর্যন্ত মাত্র তিনবার বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে খেলেছে। সেই তিন আসরের মধ্যে একবারই ফাইনালে উঠে শিরোপা জয়ের স্বাদ পেয়েছে থ্রি লায়ন্সরা।
এবার বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে আবারও মুখোমুখি আর্জেন্টিনা ও ইংল্যান্ড। এটি শুধু একটি ফুটবল ম্যাচ নয়; প্রায় দুই শতকের ইতিহাস, রাজনৈতিক টানাপোড়েন, আবেগ এবং অসংখ্য স্মরণীয় ঘটনার নতুন অধ্যায়। দীর্ঘ ২১ বছর পর আবারও কোনো প্রতিযোগিতামূলক মঞ্চে মুখোমুখি হচ্ছে দুই চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী। স্বাভাবিকভাবেই নজরের কেন্দ্রে লিওনেল মেসি। বিশ্বকাপের সর্বোচ্চ গোলদাতা আর্জেন্টিনাকে টানা দ্বিতীয়বারের মতো ফাইনালে তুলতে মুখিয়ে রয়েছেন।

আর্জেন্টিনা-ইংল্যান্ড ফুটবল বৈরিতার ইতিহাস ফুটবলেরও আগে শুরু। ১৮৬৭ সালে ব্রিটিশ রেলকর্মীদের হাত ধরেই আর্জেন্টিনায় প্রথম নথিভুক্ত ফুটবল ম্যাচ অনুষ্ঠিত হয়। নিউয়েলস ওল্ড বয়েজ, রোজারিও সেন্ট্রালের মতো ক্লাব গড়ে ওঠে ব্রিটিশদের উদ্যোগে। এমনকি রিভার প্লেট ও বোকা জুনিয়র্সের নামেও রয়েছে ইংরেজি ভাষার প্রভাব। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সেই সম্পর্ক রূপ নেয় তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতায়।

বিশ্বকাপে প্রথম মুখোমুখি হয় দুই দল ১৯৬২ সালে। তবে সেই ম্যাচ তেমন আলোচিত হয়নি। প্রকৃত উত্তেজনার সূচনা ১৯৬৬ বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে। ওয়েম্বলিতে ১-০ গোলে জয় পায় ইংল্যান্ড। কিন্তু আর্জেন্টিনায় ম্যাচটি আজও পরিচিত ‘শতাব্দীর ডাকাতি’ নামে।

অধিনায়ক আন্তোনিও রাত্তিনকে বিতর্কিত লাল কার্ড দেখানো, দীর্ঘ সময় খেলা বন্ধ থাকা, রেফারিকে ঘিরে উত্তেজনা এবং ম্যাচ শেষে দুই দলের খেলোয়াড়দের সংঘর্ষ পরিস্থিতিকে চরমে নিয়ে যায়। পরে ইংল্যান্ডের কোচ আলফ রামসে আর্জেন্টিনার ফুটবলারদের ‘পশু’ বলে মন্তব্য করলে দুই দেশের ফুটবল সম্পর্ক আরও তিক্ত হয়ে ওঠে।

ফকল্যান্ড যুদ্ধের মাত্র চার বছর পর ১৯৮৬ বিশ্বকাপে মেক্সিকো সিটির আজতেকা স্টেডিয়ামে ইতিহাসের অন্যতম বিখ্যাত ম্যাচে মুখোমুখি হয় দুই দল। দিয়েগো ম্যারাডোনা প্রথমে করেন বিতর্কিত ‘হ্যান্ড অব গড’ গোল। এরপর মাত্র চার মিনিটের ব্যবধানে নিজের অর্ধ থেকে বল নিয়ে পাঁচজন ডিফেন্ডারকে কাটিয়ে করেন অবিশ্বাস্য ‘গোল অব দ্য সেঞ্চুরি’। সেই ম্যাচে ২-১ ব্যবধানে জয় পায় আর্জেন্টিনা এবং শেষ পর্যন্ত বিশ্বকাপও জিতে নেয়।

ফ্রান্স বিশ্বকাপে আবারও জমে ওঠে আর্জেন্টিনা-ইংল্যান্ড দ্বৈরথ। গ্যাব্রিয়েল বাতিস্তুতা, অ্যালান শিয়ারার, মাইকেল ওয়েন এবং হাভিয়ের জানেত্তির গোলে নির্ধারিত সময় শেষ হয় ২-২ সমতায়। তবে ম্যাচের মোড় ঘুরিয়ে দেয় ডেভিড বেকহামের লাল কার্ড। দিয়েগো সিমিওনের উসকানিতে প্রতিক্রিয়া দেখিয়ে মাঠ ছাড়তে হয় ইংলিশ মিডফিল্ডারকে। শেষ পর্যন্ত টাইব্রেকারে ৪-৩ ব্যবধানে জিতে কোয়ার্টার ফাইনালে ওঠে আর্জেন্টিনা।

চার বছর পর জাপানের সাপ্পোরোতে ২০০২ বিশ্বকাপে প্রতিশোধ নেয় ইংল্যান্ড। মাইকেল ওয়েনকে ফাউল করায় পাওয়া পেনাল্টি থেকে ডেভিড বেকহামের একমাত্র গোলে ১-০ ব্যবধানে জয় পায় থ্রি লায়ন্সরা। সেই পরাজয়ে ১৯৬২ সালের পর প্রথমবারের মতো গ্রুপ পর্ব থেকেই বিদায় নিতে হয় আর্জেন্টিনাকে। এরপর ২০০৫ সালের একটি প্রীতি ম্যাচ ছাড়া আর দেখা হয়নি দুই দলের। এবার দীর্ঘ বিরতির পর আবারও বিশ্বকাপের মঞ্চে মুখোমুখি তারা।

১৯৬৬ সালের আগে চারটি বিশ্বকাপে অংশ নিয়ে দুবার গ্রুপ পর্ব এবং দুবার কোয়ার্টার ফাইনাল থেকেই বিদায় নিয়েছিল ইংল্যান্ড। ১৯৬৬ সালে প্রথমবার সেমিফাইনালে উঠে পর্তুগালকে ২-১ গোলে হারিয়ে ফাইনালে পৌঁছে। পরে পশ্চিম জার্মানিকে ৪-২ গোলে হারিয়ে নিজেদের ইতিহাসের একমাত্র বিশ্বকাপ জেতে। ১৯৯০ সালে আবার সেমিফাইনালে উঠলেও পশ্চিম জার্মানির কাছে টাইব্রেকারে ৪-৩ ব্যবধানে হেরে বিদায় নিতে হয়। এরপর ২০১৮ বিশ্বকাপে দীর্ঘ ২৮ বছর পর সেমিফাইনালে উঠে ক্রোয়েশিয়ার কাছে ২-১ গোলে হেরে স্বপ্নভঙ্গ হয় ইংল্যান্ডের।

বিশ্বকাপের ইতিহাসে অন্যতম সফল দল আর্জেন্টিনা। তারা ১৯৭৮ সালে নেদারল্যান্ডসকে ৩-১ গোলে হারিয়ে প্রথম শিরোপা জেতে। ১৯৮৬ সালে পশ্চিম জার্মানিকে ৩-২ ব্যবধানে হারিয়ে দ্বিতীয় বিশ্বকাপ জয় করে।
সবশেষ ২০২২ সালে কাতার বিশ্বকাপের ফাইনালে ফ্রান্সের সঙ্গে ৩-৩ গোলে ড্রয়ের পর টাইব্রেকারে জিতে তৃতীয়বারের মতো বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হয় আলবিসেলেস্তেরা।
এছাড়া ১৯৩০, ১৯৯০ ও ২০১৪ সালে রানার্সআপ হয় আর্জেন্টিনা। মোট ১৯টি বিশ্বকাপে অংশ নিয়ে ৯০টি ম্যাচে ৪৯টি জয় পেয়েছে দলটি। বিশ্বকাপে অংশগ্রহণের সংখ্যায় ব্রাজিল ও জার্মানির পরেই অবস্থান আর্জেন্টিনার।
এবারের সেমিফাইনাল তাই কেবল দুই ফুটবল শক্তির লড়াই নয়; এটি ইতিহাস, আবেগ, প্রতিশোধ ও গৌরবের আরেকটি রোমাঞ্চকর অধ্যায়। এখন দেখার বিষয়, আর্জেন্টিনা কি সেমিফাইনালে নিজেদের শতভাগ জয়ের রেকর্ড অক্ষুণ্ণ রাখতে পারে, নাকি ইতিহাস বদলে ফাইনালে জায়গা করে নেয় ইংল্যান্ড।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *