।। বিধায়ক দাশ পুরকায়স্থ ।।
২৯ জুন : ভারতের নবজাগরণের ইতিহাসে এমন অনেক ব্যক্তিত্ব রয়েছেন, যাঁদের অবদান রাজনৈতিক ইতিহাসের চেয়ে সাংস্কৃতিক ইতিহাসে অনেক বেশি গভীর ও সুদূরপ্রসারী। তাঁরা উপলব্ধি করেছিলেন, একটি জাতির শক্তি কেবল রাষ্ট্রক্ষমতা, অর্থনীতি বা সামরিক সামর্থ্যের ওপর নির্ভর করে না; তার প্রকৃত ভিত্তি নিহিত থাকে মানুষের চরিত্র, সংস্কৃতি, শ্রমবোধ, সামাজিক সংহতি এবং আত্মপরিচয়ের মধ্যে। এই বিরল দূরদর্শী ব্যক্তিত্বদের অন্যতম ছিলেন গুরুসদয় দত্ত। তিনি ছিলেন একাধারে আইসিএস কর্মকর্তা, সমাজসংস্কারক, লোকসংস্কৃতি গবেষক, শিক্ষাবিদ, লেখক এবং ব্রতচারী আন্দোলনের প্রবর্তক। কিন্তু তাঁর সর্বাপেক্ষা বড় পরিচয়—তিনি বাংলার লোকঐতিহ্যকে কেবল সংরক্ষণ করেননি; তাকে জাতি গঠনের এক মৌলিক শক্তিতে রূপ দেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন।
১৮৮২ সালের ১০ মে তৎকালীন সিলেট জেলার (বর্তমান বাংলাদেশের সিলেট বিভাগের অন্তর্গত) জকিগঞ্জ উপজেলার বিরশ্রী গ্রামে এক সম্ভ্রান্ত জমিদার পরিবারে তাঁর জন্ম। পিতা রামকৃষ্ণ দত্ত চৌধুরী এবং মাতা আনন্দময়ী দেবী। শৈশব থেকেই তাঁর অসাধারণ মেধার পরিচয় মেলে। সিলেটে শিক্ষাজীবন শেষ করে তিনি এন্ট্রান্স ও এফএ পরীক্ষায় আসাম প্রদেশে প্রথম স্থান অর্জন করেন। পরবর্তীকালে উচ্চশিক্ষার জন্য ইংল্যান্ডে গিয়ে ১৯০৪ সালে ইন্ডিয়ান সিভিল সার্ভিস (আই.সি.এস.) পরীক্ষায় কৃতিত্বের সঙ্গে উত্তীর্ণ হয়ে মেধাতালিকায় সপ্তম স্থান অধিকার করেন। সেই সময়ে আইসিএস-এ ভারতীয়দের প্রবেশ ছিল অত্যন্ত বিরল এবং কঠিন এক সাফল্য।
প্রশাসনিক জীবনে বাংলার বিভিন্ন জেলায় কাজ করার সুযোগ তাঁর হয়। কিন্তু এই প্রশাসনিক জীবনই তাঁকে এক ভিন্ন সত্যের সামনে দাঁড় করায়। গ্রামবাংলার মানুষের জীবনযাত্রা, গান, নাচ, উৎসব, ব্রত, লোকবিশ্বাস, কারুশিল্প, আলপনা, পটচিত্র এবং লোককথার মধ্যে তিনি দেখতে পান এক বিস্ময়কর সাংস্কৃতিক ঐশ্বর্য। একই সঙ্গে তিনি উপলব্ধি করেন, ঔপনিবেশিক শিক্ষাব্যবস্থা এবং তথাকথিত আধুনিকতার প্রভাবে শিক্ষিত সমাজ ক্রমশ এই লোকঐতিহ্য থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছে। নিজের সংস্কৃতিকে অবহেলা করে পাশ্চাত্য সংস্কৃতির অন্ধ অনুকরণকে শিক্ষিত হওয়ার লক্ষণ বলে মনে করা হচ্ছিল। গুরুসদয় দত্ত এই প্রবণতাকে গভীর উদ্বেগের সঙ্গে দেখেছিলেন।
তাঁর কাছে বিষয়টি কেবল সংস্কৃতির প্রশ্ন ছিল না; ছিল জাতীয় আত্মপরিচয়ের প্রশ্ন। তিনি বিশ্বাস করতেন, যে জাতি নিজের লোকঐতিহ্যকে ভুলে যায়, সে জাতি ধীরে ধীরে নিজের আত্মবিশ্বাসও হারিয়ে ফেলে। তাই তিনি কোনও রাজনৈতিক আন্দোলনের পরিবর্তে সাংস্কৃতিক পুনর্জাগরণের পথ বেছে নেন। এই অর্থে গুরুসদয় দত্ত ছিলেন সাংস্কৃতিক উপনিবেশবাদের বিরুদ্ধে এক নীরব কিন্তু সুদূরপ্রসারী প্রতিরোধের নির্মাতা।
প্রশাসনিক কাজের পাশাপাশি তিনি বাংলার গ্রামে গ্রামে ঘুরে হাজার হাজার লোকশিল্পের নিদর্শন সংগ্রহ করেন। পটচিত্র, গাজীর পট, যমপট, নকশিকাঁথা, ব্রতের আলপনা, সরা, মৃৎশিল্প, কাঠের খেলনা, লোকমূর্তি, গ্রামীণ কারুশিল্প—সবকিছুকেই তিনি জাতীয় সম্পদ হিসেবে বিবেচনা করতেন। সেই সময়ে যখন অধিকাংশ শিক্ষিত মানুষ এই শিল্পরূপগুলিকে গ্রাম্য বা নিম্নমানের বলে মনে করতেন, তখন গুরুসদয় দত্ত দেখিয়েছিলেন যে একটি জাতির সবচেয়ে গভীর সৃজনশীল শক্তি তার লোকজ সংস্কৃতির মধ্যেই নিহিত থাকে। তাঁর সংগৃহীত বিপুল সম্পদ পরবর্তীকালে কলকাতায় প্রতিষ্ঠিত গুরুসদয় সংগ্রহশালার ভিত্তি গড়ে তোলে, যা আজও বাংলার লোকসংস্কৃতি গবেষণার এক অমূল্য ভাণ্ডার।
লোকশিল্পের পাশাপাশি লোকনৃত্যের পুনর্জাগরণেও তাঁর অবদান অনন্য। বিশেষ করে রায়বেঁশে নৃত্য, কাঠি নাচ এবং বিভিন্ন ব্রতনৃত্যকে তিনি নতুনভাবে সংগঠিত করেন। তাঁর কাছে নৃত্য কেবল বিনোদন ছিল না; এটি ছিল শরীরচর্চা, সাহস, শৃঙ্খলা, দলগত চেতনা এবং আত্মবিশ্বাস গড়ে তোলার মাধ্যম। তিনি দেখিয়েছিলেন, লোকনৃত্যের মধ্যেও জাতীয় চরিত্র গঠনের শক্তি নিহিত থাকতে পারে।
গুরুসদয় দত্ত বিশেষভাবে উপলব্ধি করেছিলেন যে, বাংলার বহু প্রাচীন যুদ্ধনৃত্য ও লোকনৃত্য আধুনিকতার চাপে ধীরে ধীরে বিলুপ্তির পথে এগিয়ে যাচ্ছে। এর মধ্যে রায়বেঁশে নৃত্য ছিল অন্যতম। বীরত্ব, শারীরিক সক্ষমতা এবং দলগত শৃঙ্খলার প্রতীক এই নৃত্যকে তিনি নতুনভাবে সংগঠিত করেন, প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করেন এবং জনসমক্ষে পরিবেশনের মাধ্যমে নতুন মর্যাদা প্রদান করেন। তাঁর প্রচেষ্টায় রায়বেঁশে কেবল একটি লোকনৃত্য হিসেবেই নয়, বরং বাঙালির ঐতিহাসিক সাহস, আত্মবিশ্বাস এবং সাংস্কৃতিক পরিচয়ের প্রতীক হিসেবেও পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হয়। আজ রায়বেঁশে নৃত্যের যে পুনর্জাগরণ আমরা প্রত্যক্ষ করি, তার পেছনে গুরুসদয় দত্তের ভূমিকা মৌলিক ও ঐতিহাসিক।
এই উপলব্ধিরই পরিণতি ছিল ১৯৩২ সালে ব্রতচারী আন্দোলনের প্রতিষ্ঠা। “ব্রতচারী” শব্দের অর্থ—যিনি আদর্শকে জীবনের আচরণে ধারণ করেন। গুরুসদয় দত্ত বিশ্বাস করতেন, রাজনৈতিক স্বাধীনতা তখনই অর্থবহ হবে, যখন দেশের মানুষ নৈতিকভাবে দৃঢ়, শারীরিকভাবে সক্ষম, সাংস্কৃতিকভাবে সচেতন এবং সামাজিকভাবে দায়িত্বশীল হয়ে উঠবে।
ব্রতচারী আন্দোলনের ভিত্তি ছিল পাঁচটি মৌলিক আদর্শ—জ্ঞান, শ্রম, সত্য, ঐক্য এবং আনন্দ। এই পাঁচটি মূল্যবোধকে কেন্দ্র করে তিনি এমন এক জীবনদর্শন নির্মাণ করেন, যেখানে শিক্ষা, শরীরচর্চা, লোকসংগীত, সমবেত নৃত্য, উৎপাদনশীল শ্রম, সামাজিক সেবা এবং দেশপ্রেম একে অপরের পরিপূরক। তাঁর কাছে শিক্ষা মানে কেবল পরীক্ষায় ভালো ফল নয়; শিক্ষা মানে মানুষ হয়ে ওঠা। বর্তমান সময়ে যে “হোলিস্টিক এডুকেশন” বা সমন্বিত শিক্ষার কথা বলা হয়, গুরুসদয় দত্ত প্রায় এক শতাব্দী আগেই তার বাস্তব রূপরেখা উপস্থাপন করেছিলেন।
ব্রতচারী আন্দোলনের আরেকটি উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য ছিল এর অসাম্প্রদায়িক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক চরিত্র। ধর্ম, বর্ণ, ভাষা বা লিঙ্গ নির্বিশেষে সকলেই এই আন্দোলনের অংশ হতে পারতেন। নারী-পুরুষের সমান অংশগ্রহণ সে সময়ের সামাজিক বাস্তবতায় ছিল অত্যন্ত প্রগতিশীল পদক্ষেপ। তাঁর কাছে জাতীয় পরিচয়ের ভিত্তি ছিল না কোনো একক ধর্মীয় বা জাতিগত পরিচয়; বরং ছিল মানুষের যৌথ সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য। এই কারণেই তাঁর সাংস্কৃতিক জাতীয়তাবাদ ছিল বিভাজনের নয়, সংহতির দর্শন।
গ্রামীণ পুনর্গঠন সম্পর্কেও তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি ছিল ব্যতিক্রমী। তিনি মনে করতেন, ভারতের পুনর্জাগরণের ভিত্তি শহর নয়, গ্রাম। তাই ব্রতচারী আন্দোলনে পরিচ্ছন্নতা, স্বনির্ভরতা, সমবায়, কৃষির মর্যাদা, উৎপাদনশীল শ্রম এবং সামাজিক সহযোগিতাকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়। তাঁর কাছে শ্রম ছিল কেবল জীবিকা অর্জনের উপায় নয়; ছিল চরিত্র গঠনের অন্যতম ভিত্তি।
ইংল্যান্ডে অবস্থানকালে তিনি পাশ্চাত্যের বিভিন্ন যুব আন্দোলন, বিশেষত স্কাউট আন্দোলনের কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করেছিলেন। কিন্তু তিনি কোনো বিদেশি মডেলের অনুকরণ করেননি। বরং বাংলার লোকঐতিহ্য, লোকনৃত্য, লোকসংগীত ও গ্রামীণ সংস্কৃতির ভিত্তিতে সম্পূর্ণ দেশীয় একটি আন্দোলন গড়ে তুলেছিলেন। এই মৌলিকতাই ব্রতচারী আন্দোলনকে স্বতন্ত্র মর্যাদা দিয়েছে।

গুরুসদয় দত্ত কেবল সংগ্রাহক ছিলেন না; তিনি ছিলেন একজন গবেষক ও চিন্তাবিদও। বাংলার ব্রত, লোকবিশ্বাস, লোকনৃত্য, পটশিল্প এবং গ্রামীণ সংস্কৃতি নিয়ে তাঁর গবেষণা আজও মূল্যবান। তাঁর রচনাগুলিতে শুধু তথ্য নয়, একটি জাতির সাংস্কৃতিক আত্মমর্যাদা পুনর্গঠনের স্বপ্নও প্রতিফলিত হয়েছে।
আজ বিশ্বজুড়ে অমূর্ত সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য সংরক্ষণের ওপর যে গুরুত্ব আরোপ করা হচ্ছে, গুরুসদয় দত্ত সেই প্রয়োজনীয়তা বহু আগেই উপলব্ধি করেছিলেন। লোকসংস্কৃতি তাঁর কাছে অতীতের স্মৃতিচিহ্ন ছিল না; ছিল ভবিষ্যৎ নির্মাণের ভিত্তি। এই দৃষ্টিভঙ্গিই তাঁকে তাঁর সময়ের বহু মানুষ থেকে আলাদা করে।
তাঁর জীবন আমাদের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দেয়। অধিকাংশ আইসিএস কর্মকর্তা যেখানে প্রশাসনিক সাফল্যের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিলেন, সেখানে গুরুসদয় দত্ত প্রশাসনিক অভিজ্ঞতাকে ব্যবহার করেছিলেন মানুষের জীবন, সমাজ এবং সংস্কৃতিকে গভীরভাবে বোঝার জন্য। তিনি উপলব্ধি করেছিলেন, রাষ্ট্র কেবল আইন দিয়ে টিকে থাকে না; টিকে থাকে সংস্কৃতি, মূল্যবোধ এবং সামাজিক আস্থার ওপর।
দুর্ভাগ্যজনকভাবে স্বাধীনতার পর ভারতীয় ইতিহাসচর্চায় গুরুসদয় দত্তের নাম সেই অর্থে আলোচিত হয়নি। তিনি কোনো রাজনৈতিক দলের নেতা ছিলেন না, ক্ষমতার রাজনীতির অংশও ছিলেন না। ফলে তাঁর সাংস্কৃতিক অবদান দীর্ঘদিন মূলধারার আলোচনার বাইরে থেকে যায়। অথচ আজ গবেষণা যত এগোচ্ছে, ততই স্পষ্ট হচ্ছে যে ভারতীয় উপমহাদেশে লোকসংস্কৃতিকে জাতি গঠনের দর্শনের সঙ্গে সবচেয়ে সুসংগঠিতভাবে যুক্ত করার অন্যতম প্রথম চিন্তাবিদ ছিলেন গুরুসদয় দত্ত।
সিলেটের ইতিহাসের ক্ষেত্রেও তাঁর গুরুত্ব বিশেষভাবে স্মরণীয়। সুফি ঐতিহ্য, সাহিত্য বা চা-শিল্পের পাশাপাশি সিলেট এমন একজন মনীষীর জন্ম দিয়েছে, যিনি সমগ্র বাংলার লোকঐতিহ্যকে নতুন মর্যাদা দিয়েছেন। এই পরিচয়ও সমানভাবে মূল্যায়নের দাবি রাখে।
আজকের বিশ্বায়নের যুগে, যখন স্থানীয় ভাষা, লোকশিল্প, লোকসংগীত এবং আঞ্চলিক সংস্কৃতি নানা চ্যালেঞ্জের মুখে, তখন গুরুসদয় দত্তের দর্শন নতুন তাৎপর্য লাভ করে। তিনি দেখিয়েছিলেন, আধুনিক হওয়া মানে নিজের শিকড়কে অস্বীকার করা নয়; বরং সেই শিকড়ের শক্তির ওপর দাঁড়িয়েই বিশ্বকে গ্রহণ করা। তাঁর ব্রতচারী দর্শনের পাঁচটি ভিত্তি—জ্ঞান, শ্রম, সত্য, ঐক্য ও আনন্দ—আজও একটি মানবিক, সৃজনশীল এবং আত্মমর্যাদাসম্পন্ন সমাজ গঠনের জন্য সমানভাবে প্রাসঙ্গিক।
গুরুসদয় দত্তকে তাই কেবল একজন লোকসংস্কৃতি সংগ্রাহক বা ব্রতচারী আন্দোলনের প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে দেখলে তাঁর অবদানকে ছোট করে দেখা হবে। তিনি ছিলেন এমন এক দূরদর্শী জাতিনির্মাতা, যিনি বুঝেছিলেন—একটি জাতির ভবিষ্যৎ নির্মাণের জন্য তার অতীতের সাংস্কৃতিক ভিত্তিকে দৃঢ় করা অপরিহার্য। তাঁর জীবন ও কর্ম যত বেশি নতুন প্রজন্মের কাছে পরিচিত হবে, ততই সমৃদ্ধ হবে আমাদের সাংস্কৃতিক আত্মবিশ্বাস, ঐতিহাসিক চেতনা এবং জাতীয় আত্মপরিচয়ের ভিত্তি। ইতিহাসের আলোয় গুরুসদয় দত্ত তাই শুধু অতীতের এক উজ্জ্বল ব্যক্তিত্ব নন; তিনি আজও ভবিষ্যতের পথপ্রদর্শক।
গুরুসদয় দত্ত ছিলেন এমন এক বিরল চিন্তাবিদ, যিনি উপলব্ধি করেছিলেন—রাজনৈতিক স্বাধীনতা একটি জাতিকে মুক্ত করতে পারে, কিন্তু সাংস্কৃতিক আত্মমর্যাদা ছাড়া সেই স্বাধীনতা কখনোই পূর্ণতা লাভ করে না।



