কারবালার প্রান্তরে ইমাম হোসেন (রা.)-এর শাহাদাত: ইসলামের ইতিহাসের এক অবিস্মরণীয় অধ্যায়

Spread the news

২৬ জুন : কারবালার যুদ্ধ ইসলামের ইতিহাসে সবচেয়ে হৃদয়বিদারক ও তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনাগুলোর একটি। আজ ১০ মহরম ইরাকের কারবালার প্রান্তরে মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর প্রিয় দৌহিত্র ইমাম হোসেন ইবনে আলি (রা.) এবং তাঁর পরিবার ও সঙ্গীদের শাহাদাত মুসলিম উম্মাহর ইতিহাসে চিরস্মরণীয় হয়ে আছে। সত্য, ন্যায় ও আদর্শ প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে তাঁদের আত্মত্যাগ আজও অনুপ্রেরণার উৎস।

ইমাম হোসেন (রা.) ছিলেন চতুর্থ খলিফা হজরত আলি ইবনে আবি তালিব (রা.) ও হজরত ফাতিমা (রা.)-এর কনিষ্ঠ পুত্র এবং মহানবী (সা.)-এর আদরের নাতি। তাঁর বড় ভাই ছিলেন ইমাম হাসান (রা.)।
হাদিসে ইমাম হাসান (রা.) ও ইমাম হোসেন (রা.)-কে জান্নাতের যুবকদের নেতা হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়েছে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, “হোসেন আমার অংশ এবং আমিও হুসাইনের অংশ। আল্লাহ তাকে ভালোবাসেন, যে হুসাইনকে ভালোবাসে।”

হজরত আলি (রা.)-এর শাহাদাতের পর তাঁর বড় ছেলে ইমাম হাসান (রা.) মুসলিমদের আনুগত্য লাভ করেন। পরে তিনি মুসলিমদের ঐক্য রক্ষার স্বার্থে আমির মুয়াবিয়া (রা.)-এর সঙ্গে একটি শান্তিচুক্তির মাধ্যমে খেলাফতের দায়িত্ব হস্তান্তর করেন। তবে চুক্তির অন্যতম শর্ত ছিল, পরবর্তী খলিফা মনোনয়ন শুরার মাধ্যমে হবে।

পরবর্তীতে মুয়াবিয়া (রা.) তাঁর ছেলে ইয়াজিদকে উত্তরসূরি ঘোষণা করলে ইমাম হোসেন (রা.)-সহ বহু বিশিষ্ট সাহাবি এতে সম্মতি দেননি। এখান থেকেই বিরোধের সূত্রপাত।

ইয়াজিদের পক্ষ থেকে আনুগত্যের শপথ গ্রহণের আহ্বান প্রত্যাখ্যান করে ইমাম হোসেন (রা.) মক্কায় অবস্থান নেন। এ সময় কুফার অসংখ্য মানুষ তাঁকে চিঠি লিখে সেখানে এসে নেতৃত্ব গ্রহণের আহ্বান জানায়। পরিস্থিতি যাচাই করতে তিনি তাঁর চাচাতো ভাই মুসলিম ইবনে আকিল (রা.)-কে কুফায় পাঠান।

প্রথমদিকে কুফাবাসীরা সমর্থনের আশ্বাস দিলেও ইয়াজিদের নিযুক্ত গভর্নর উবায়দুল্লাহ ইবনে জিয়াদের ভয়ভীতি ও দমন-পীড়নের মুখে তারা প্রতিশ্রুতি থেকে সরে যায়। মুসলিম ইবনে আকিল (রা.)-কে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। কিন্তু সে সময় ইমাম হোসেন (রা.) ইতোমধ্যে কুফার উদ্দেশে রওনা হয়ে গিয়েছিলেন।

৬১ হিজরির ২ মহরম ইমাম হোসেন (রা.) ও তাঁর অল্পসংখ্যক সঙ্গী কারবালায় পৌঁছান। সেখানে উমর ইবনে সাদের নেতৃত্বাধীন ইয়াজিদের বিশাল বাহিনী তাদের ঘিরে ফেলে এবং ফোরাত নদী থেকে পানি সংগ্রহের পথ বন্ধ করে দেয়। নারী, শিশু ও বৃদ্ধরা চরম তৃষ্ণা ও কষ্টে দিন কাটাতে থাকেন।

আশুরার আগের রাতে ইমাম হোসেন (রা.) তাঁর সঙ্গীদের ইচ্ছা করলে ফিরে যাওয়ার অনুমতি দেন। কিন্তু সবাই মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তাঁর সঙ্গেই থাকার অঙ্গীকার করেন।

১০ মহরম সকালে ইমাম হোসেন (রা.) যুদ্ধ এড়াতে শান্তিপূর্ণ সমাধানের প্রস্তাব দিলেও ইয়াজিদের বাহিনী তা প্রত্যাখ্যান করে। শুরু হয় অসম যুদ্ধ। মাত্র কয়েক ডজন সঙ্গী নিয়ে তিনি হাজারো সৈন্যের বিরুদ্ধে সাহসিকতার সঙ্গে লড়াই করেন।

যুদ্ধের এক পর্যায়ে গুরুতর আহত অবস্থায় তৃষ্ণার্ত ইমাম হোসেন (রা.) ফোরাতের দিকে এগোতে চাইলে তাঁকে তীরবিদ্ধ করা হয়। পরে শিমরের নির্দেশে সিনান ইবনে আনাস তাঁর শিরশ্ছেদ করে। বর্ণনা অনুযায়ী, তাঁর পবিত্র দেহে অসংখ্য তরবারি ও বর্শার আঘাতের চিহ্ন ছিল।

এই যুদ্ধে আহলে বাইতের বহু সদস্য ও প্রায় ৭২ জন সঙ্গী শাহাদাত বরণ করেন। তাঁদের আত্মত্যাগ ইসলামের ইতিহাসে সত্য ও ন্যায়ের জন্য সর্বোচ্চ ত্যাগের প্রতীক হয়ে আছে।

আজও কারবালার শাহাদাত মুসলিম উম্মাহকে ন্যায়, সাহস, ধৈর্য ও আত্মত্যাগের শিক্ষা দিয়ে চলেছে। ইমাম হুসাইন (রা.) এবং তাঁর সঙ্গীদের আত্মত্যাগ ইতিহাসে চির অম্লান হয়ে থাকবে। (সংগৃহীত)

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *