নাগাল্যান্ডে ফের আফ্রিকান সোয়াইন ফিভারের প্রকোপ, কোহিমায় সতর্কতা জারি

Spread the news

বরাক তরঙ্গ, ১৯ জুন : নাগাল্যান্ডজুড়ে বারবার শূকর খামারে বিপর্যয় ডেকে আনা প্রাণঘাতী রোগ আফ্রিকান সোয়াইন ফিভার (এএসএফ) ফের মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে। কোহিমায় নতুন করে এই রোগের প্রাদুর্ভাব ধরা পড়ায় কৃষক ও খামারিদের মধ্যে উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়েছে। একই সঙ্গে রাজ্য প্রশাসনের প্রস্তুতি ও প্রতিরোধ ব্যবস্থা নিয়েও নতুন করে প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে।

কোহিমা জেলা প্রশাসন জানিয়েছে, টি. খেল মডেল ভিলেজের খিখা কলোনিতে এএসএফ সংক্রমণ শনাক্ত হয়েছে। রোগের বিস্তার রোধে আক্রান্ত এলাকা ঘিরে এক কিলোমিটার ব্যাসার্ধকে ‘সংক্রমিত অঞ্চল’ এবং ১০ কিলোমিটার ব্যাসার্ধকে ‘নজরদারি অঞ্চল’ হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে।

প্রশাসন অবিলম্বে আক্রান্ত এলাকায় জীবিত শূকরের চলাচল, আমদানি ও রফতানির ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে। পাশাপাশি শূকরের মাংস বিক্রির বাজার ও কসাইখানা বন্ধ রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। খামারিদের বায়োসিকিউরিটি ব্যবস্থা আরও জোরদার করতে এবং অস্বাভাবিকভাবে শূকরের মৃত্যু হলে দ্রুত প্রশাসনকে জানাতে বলা হয়েছে।

এই নতুন সংক্রমণ আবারও নাগাল্যান্ডের গ্রামীণ অর্থনীতির দুর্বলতাকে সামনে এনে দিয়েছে। রাজ্যের বহু পরিবারের আয়ের অন্যতম প্রধান উৎস শূকর পালন। অনেক পরিবারের কাছে শূকর শুধু গবাদিপশু নয়, বরং সঞ্চয়, সন্তানদের পড়াশোনার খরচ, চিকিৎসার জরুরি তহবিল এবং আর্থিক নিরাপত্তার গুরুত্বপূর্ণ ভরসা।
ফেক জেলার এক বাসিন্দা বলেন, “প্রতি বছরই একই সমস্যা দেখা দেয়। গত বছরও আমাদের গ্রামে তিনটি বড় শূকর খামার এবং প্রায় পুরো শূকরসম্পদ ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল। এ বছরও আবার শুরু হয়েছে। বিষয়টি অত্যন্ত উদ্বেগজনক।”

বহু খামারি ক্ষোভ প্রকাশ করে জানিয়েছেন, বছরের পর বছর ধরে এএসএফের প্রাদুর্ভাব চললেও রোগটি প্রতিরোধে কার্যকর ও স্থায়ী ব্যবস্থা নেওয়া যায়নি। তাঁদের মতে, গ্রামীণ জীবিকা রক্ষায় আরও শক্তিশালী প্রতিরোধমূলক পদক্ষেপ এবং পশুস্বাস্থ্য অবকাঠামোতে বড় ধরনের বিনিয়োগ প্রয়োজন।

গত কয়েক বছরে আফ্রিকান সোয়াইন ফিভার নাগাল্যান্ডের পশুপালন খাতে অন্যতম ক্ষতিকর রোগ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, গত পাঁচ বছরে এএসএফের কারণে মৃত্যু ও বাধ্যতামূলক নিধনের ফলে ৩৩ হাজারেরও বেশি শূকর নষ্ট হয়েছে।

সম্প্রদায়ের নেতাদের মতে, আক্রান্ত শূকরের চলাচল নিয়ন্ত্রণই রোগ প্রতিরোধের অন্যতম কার্যকর উপায়। কারণ সংক্রমিত পশু, দূষিত শূকরের মাংস, যানবাহন, সরঞ্জাম, খাদ্য এবং খামারগুলোর মধ্যে মানুষের যাতায়াতের মাধ্যমেও এএসএফ দ্রুত ছড়িয়ে পড়তে পারে।

জেলা প্রশাসন খামারিদের দর্শনার্থীদের প্রবেশ সীমিত রাখতে, নিয়মিত খামার জীবাণুমুক্ত করতে এবং শূকরের অস্বাভাবিক অসুস্থতা বা মৃত্যুর ঘটনা দ্রুত জানাতে নির্দেশ দিয়েছে। মৃত পশুর নিরাপদ সমাধি বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। জলাশয় বা খোলা জায়গায় মৃত পশু ফেলে দেওয়ার ওপরও কড়া নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে।
পশুচিকিৎসা বিভাগের কর্মকর্তারা খামারিদের অপরিশোধিত রান্নাঘরের উচ্ছিষ্ট খাবার শূকরকে না খাওয়ানোর পরামর্শ দিয়েছেন। পাশাপাশি কঠোর স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা এবং উচ্চ জ্বর, দুর্বলতা, ক্ষুধামন্দা ও আকস্মিক মৃত্যুর মতো উপসর্গ দেখা দিলে সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়েছেন।

যদিও আফ্রিকান সোয়াইন ফিভার মানুষের স্বাস্থ্যের জন্য কোনো ঝুঁকি সৃষ্টি করে না, তবে এর অর্থনৈতিক প্রভাব অত্যন্ত ভয়াবহ হতে পারে। গ্রামীণ নাগাল্যান্ডে এই রোগ বহু পরিবারের জীবিকার নীরব ঘাতক হয়ে উঠেছে, যা বছরের পর বছর ধরে গড়ে তোলা বিনিয়োগ মুহূর্তে ধ্বংস করে দিয়ে অনেক পরিবারকে আর্থিক সংকটের মুখে ঠেলে দিচ্ছে।

কোহিমায় নতুন বিধিনিষেধ কার্যকর হওয়ার পর এখন রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তের খামারিরা আশা করছেন, প্রশাসন দ্রুত পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এনে আরেক দফা বড় ক্ষয়ক্ষতি রোধ করতে সক্ষম হবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *