জারের ভিতরে ফর্মালিনে চোবানো অর্ধেক কাটা মাথা: আলভান্দর মার্ডার কেস আজও শিক্ষা দিচ্ছে ফরেনসিক চিকিৎসকদের

Spread the news

১৩ জুন : পরের পর কাঠের র‌‌্যাক। তাতে ধুলোর পুরু আস্তরণ। মনে হবে, বহু বছর কেউ হাত দেয়নি সেখানে। অন্ধকার ঘরের আবছা আলোর মধ্যে রাখা একটা কাচের জার। ভেতরে হলদেটে ফর্মালিনে ভেসে রয়েছে আড়াআড়া ভাবে কাটা মানুষের মাথার একটা অংশ। দেখলে গা শিউরে উঠবে। একটি চোখ, নাকের খানিকটা, ঠোঁটের ভাঙা রেখা। যেন অসমাপ্ত কোনও মুখ, যেন এখনই ঘুম ভেঙে জেগে উঠবে।

জারের গায়ে লেখা M11। মাদ্রাজ মেডিক্যাল কলেজের ফরেনসিক জাদুঘরে দীর্ঘদিন ধরে রয়েছে এই নমুনাটি। এ সঙ্গে কোনও ফাইল নেই। নথিপত্র বা সরকারি ব্যাখাও কিছু পাওয়া যায় না। কেন একটা মানুষের মাথা অর্ধেক কেটে রাখা আছে, তার কোনও স্পষ্ট উত্তর নেই। কিন্তু বহু ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে কাটা মাথাটি আছে।

এই অর্ধেক কাটা মাথা নিয়ে ফরেনসিক চিকিৎসকদের মধ্যে একটা গল্প চালু রয়েছে। মানুষটার নাম নাকি সি আলভান্দর। পেশায় পেন বিক্রেতা ছিলেন। ১৯৫২ সালে তাঁকে নির্মম ভাবে খুন করেছিল দুষ্কৃতীরা। খবরের কাগজের পাতায় সেই ঘটনার বিবরণ আলোড়ন তুলেছিল গোটা মাদ্রাজে। এখন মুখ থেকে কথা খসলেই ডিএনএ টেস্ট করা যায়। কম্পিউটার বা জেনেটিক প্রোফাইলিংও জলভাত। কিন্তু সেই সময়ে শিরশ্ছেদ ও পরিচয় নির্ধারণের একটি ক্লাসিক উদাহরণ রয়েছে এই মামলাটি।

গল্পের শুরু ১৯৫২ সালের ২৯ অগস্ট। সেই সময়ে ইন্দো-সিলন এক্সপ্রেস চালু ছিল। মাদ্রাজ থেকে সোজা কলম্বো। অবশ্য পুরোটা ট্রেনে যাওয়া যেত না। কিছুটা রাস্তা পাড়ি দিতে হতো স্টিমারে। সে যাই হোক। সেই ট্রেনের একটি সবুজ ট্রাঙ্ক থেকে দুর্গন্ধ বেরতে দেখে রেল পুলিশকে খবর দেন যাত্রীরা। মানামাদুরাই স্টেশনে ট্রেন থামতে শরু হয় তদন্ত। ডালা খুলতেই সকলের চক্ষু চড়কগাছ। ভিতরে একটি মৃতদেহ। কিন্তু তার মুণ্ডু নেই। কয়েক দিন পরে রায়াপুরম সমুদ্র সৈকতের বালির বিচ থেকে উদ্ধার হয় কাটা মাথাটি।

কাটা মুণ্ডু আর দেহাংশ, দু’টোই পাঠানো হয় মাদ্রাজ মেডিক্যাল কলেজে। দায়িত্ব তুলে দেওয়া হয় ফরেনসিক ডিপার্টমেন্টের চিকিৎসকদের কাঁধে। মাথা এবং দেহের ঘাড়ের হাড়ের সঙ্গে শরীরের বিভিন্ন অংশের গঠন খুঁটিয়ে পরীক্ষা করেন ডা. সিবি গোপালকৃষ্ণন। তিনি নিশ্চিত হয়ে যান, মুণ্ডু আর শরীর একই মানুষের।

সামনে আসে আরও কিছু তথ্য। জানা যায়, ওই ব্যক্তির বয়স ৪০। তাঁর ডান কানে দু’টি আর বাঁ কানে একটা ফুটো রয়েছে। যা এককথায় বিরল। পায়েও বিশেষ চিহ্ন রয়েছে। নিজেকে মৃতের স্ত্রী পরিচয় দিয়ে একজন দেহ শনাক্তকরণ করেন। পুরোনো সামরিক নথিতে তাঁর আঙুলের ছাপ পাওয়া যায়। ধীরে ধীরে স্পষ্ট হয়ে ওঠে মৃতের পরিচয়। ফরেনসিক বিশেষজ্ঞরা নিশ্চিত হয়ে যান, মৃত আর কেউ নন, তিনি সি আলভান্দর।

পুলিশি তদন্তে উঠে আসে, একাধিক মহিলার সঙ্গে সম্পর্ক ছিল আলভান্দরের। তার মধ্যে একজন দেবকী মেনন। তিনি বিবাহিত। কিন্ত তাঁর সঙ্গ লাভের জন্য উন্মুখ হয়ে উঠেছিলেন আলভন্দর। ১৯৫২ সালের ২৮ অগস্ট দেবকীর বাড়িতে যাওয়ার সময়েই তাঁকে খুন করা হয় বলে দাবি তদন্তকারীদের। ধারালো ছুরি দিয়ে তাঁর মাথা কেটে রায়াপুরমের সি বিচে বালি চাপা দিয়ে রাখে দুষ্কৃতীরা। আর শরীরটা একটা ট্রাঙ্কে ভরে তুলে দেওয়া হয় ট্রেনে।

মামলায় দেবকীর স্বামীর সাত বছরের কারাদণ্ড হয়। দেবকীরও জেল হয় তিন বছরের। মামলার নিষ্পত্তি হয়ে যায়। ধীরে ধীরে স্তিমিত হয়ে যায় জনমত। সংবাদপত্রের শিরোনাম বদলে যায়। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে মুছে যেতে থাকে হত্যাকাণ্ডের স্মৃতি। কিন্তু আলাভান্দারের গল্প শেষ হয় না।

ফরেনসিক শিক্ষার প্রয়োজনে তাঁর মাথাটি সংরক্ষণ করে রাখা হয় মাদ্রাজ মেডিক্যাল কলেজের জাদুঘরে। তবে এখানেই জন্ম নেয় আর-এক রহস্য। কোনও এক অজানা কারণে সংরক্ষিত মাথাটিকে আবার দু’ভাগ করা হয়। কেন? তার কোনও উত্তর নেই। মাথার একটি অংশ রয়ে যায় চেন্নাইয়ে। অন্য অংশটি পাঠানো হয় মাদুরাইয়ের একটি মেডিক্যাল কলেজে। মৃত্যুর পরেও ফরেনসিক বিজ্ঞানের পাঠশালায় নীরব শিক্ষক হয়ে রয়ে যান আলাভান্দার।

আজও কাচের জারের ভিতর নিশ্চুপ ভেসে রয়েছে সেই মুখের ভগ্নাংশ। এটি শুধু একটি হত্যাকাণ্ডের স্মারক নয়। ফরেনসিক বিজ্ঞানের ইতিহাসের এক গুরুত্বপূর্ণ দলিলও। চিকিৎসা শিক্ষার এক অস্বস্তিকর উপকরণ। আবার একই সঙ্গে মানুষের পরিচয়, স্মৃতি এবং মৃত্যুর পর দেহের অস্তিত্ব নিয়ে এক গভীর প্রশ্নও বটে। মৃত্যুর পর একজন মানুষের পরিচয় কত দূর পর্যন্ত তার নিজের থাকে?
খবর : এইসময় অনলাইন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *