।। বিধায়ক দাশ পুরকায়স্থ ।।
৬ জুন : সভ্যতার ইতিহাসে মানুষ যতবার প্রকৃতিকে জয় করার অহঙ্কার করেছে, ততবার প্রকৃতি তাকে তার সীমাবদ্ধতার কথা স্মরণ করিয়ে দিয়েছে। বন কেবল গাছের সমষ্টি নয়; বন হলো একটি জীবন্ত পরিবেশতন্ত্র, যা জলবায়ু নিয়ন্ত্রণ করে, নদীকে জীবিত রাখে, মাটিকে উর্বর করে, জীববৈচিত্র্যকে আশ্রয় দেয় এবং মানবসমাজের অস্তিত্বকে সুরক্ষিত রাখে।
বন না থাকলে—
বৃষ্টির জল দ্রুত নদীতে নেমে যায়,
মাটি ক্ষয় বৃদ্ধি পায়,
নদীর তলদেশ পলিতে ভরে যায়,
আকস্মিক বন্যার ঝুঁকি বৃদ্ধি পায়।
ফলে আজকের অসমে বন্যা শুধু একটি প্রাকৃতিক ঘটনা নয়; এটি আংশিকভাবে মানবসৃষ্ট পরিবেশগত সঙ্কট।
পূর্ব হিমালয় ও ইন্দো-বর্মা জীববৈচিত্র্য অঞ্চলের সংযোগস্থলে অবস্থিত অসম ভারতের অন্যতম সমৃদ্ধ প্রাকৃতিক ভূখণ্ড। অথচ গত পঁচিশ বছরে এই রাজ্য এমন এক পরিবেশগত সংকটের দিকে এগিয়েছে, যা আজ শুধু পরিবেশবিদদের নয়, সমগ্র সমাজের উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠেছে।
গ্লোবাল ফরেস্ট ওয়াচের সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, ২০০১ সাল থেকে অসম প্রায় ৩,৬০০ বর্গকিলোমিটার বৃক্ষাচ্ছাদন হারিয়েছে। এটি কেবল একটি পরিসংখ্যান নয়; এটি এক নীরব পরিবেশ-দুর্যোগের দলিল।
বননিধনের অন্তরালের বাস্তবতা
অসমের বন উজাড়ের কারণ কোনো একক ঘটনা নয়; বরং এটি বহু সামাজিক, অর্থনৈতিক ও প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার সম্মিলিত ফল।
ঝুম চাষের পরিবর্তিত বাস্তবতা
শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে কার্বি আংলং ও ডিমা হাসাও অঞ্চলের বহু আদিবাসী সম্প্রদায় ঝুম চাষের মাধ্যমে জীবিকা নির্বাহ করে এসেছে। অতীতে একটি জমি পরিষ্কার করার পর ১৫ থেকে ২০ বছর পর্যন্ত তাকে বিশ্রাম দেওয়া হতো, ফলে বনভূমি পুনরুজ্জীবিত হওয়ার সুযোগ পেত।
কিন্তু জনসংখ্যা বৃদ্ধি, জমির উপর চাপ এবং অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার কারণে এই পুনরুদ্ধার-চক্র অনেক ক্ষেত্রে ৩ থেকে ৫ বছরে নেমে এসেছে। ফলে বন আর পুনর্জন্মের সুযোগ পাচ্ছে না। ধীরে ধীরে পাহাড়ি বনভূমি স্থায়ীভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
কৃষি সম্প্রসারণ ও বাণিজ্যিক চাষাবাদ
ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার খাদ্যচাহিদা পূরণ এবং বাজারমুখী অর্থনীতির চাপে বহু বনভূমি কৃষিজমিতে রূপান্তরিত হয়েছে। চা বাগান, রাবার চাষ, তেলপাম প্রকল্প এবং অন্যান্য বাণিজ্যিক কৃষিকাজের জন্য বিপুল বনভূমি পরিষ্কার করা হয়েছে। এখানে একটি মৌলিক প্রশ্ন উঠে আসে—আমরা কি খাদ্য নিরাপত্তা অর্জনের জন্য পরিবেশগত নিরাপত্তাকে বিসর্জন দিচ্ছি?
খনিজ সম্পদ আহরণ ও পাহাড়ের ক্ষত
কার্বি আংলং এবং ডিমা হাসাও অঞ্চলে কয়লা, পাথর ও অন্যান্য খনিজ সম্পদের অনুসন্ধান ও উত্তোলন বন ধ্বংসের আরেকটি প্রধান কারণ। খনি কেবল যে বনভূমি ধ্বংস করে তাই নয়; এর সঙ্গে আসে রাস্তা, শ্রমিক বসতি, যানবাহন চলাচল এবং নতুন অবকাঠামো। ফলে ক্ষতির পরিধি খনির সীমানা অতিক্রম করে সমগ্র পরিবেশতন্ত্রে ছড়িয়ে পড়ে।
নগরায়ণ ও উন্নয়নের দ্বন্দ্ব
উন্নয়ন প্রয়োজনীয়। রাস্তা, রেলপথ, বিদ্যুৎ প্রকল্প, শিল্পাঞ্চল—এসব ছাড়া আধুনিক অর্থনীতি এগোতে পারে না। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এই উন্নয়ন কি পরিবেশগত মূল্য বিবেচনা করে হচ্ছে?
অসমে দ্রুত নগরায়ণের ফলে বহু বনভূমি খণ্ডিত হয়ে পড়েছে। বন আর একটানা বিস্তৃত ভূখণ্ড নয়; তা বিচ্ছিন্ন দ্বীপের মতো হয়ে যাচ্ছে। এই ‘ফরেস্ট ফ্র্যাগমেন্টেশন’ জীববৈচিত্র্যের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর।
জীববৈচিত্র্যের উপর আঘাত
অসমের বনভূমি এশীয় হাতি, টাইগার, মেঘলা চিতা, হুলুক গিবন, হর্নবিল এবং অগণিত বিরল উদ্ভিদ ও প্রাণীর আবাসস্থল।
বনভূমি সংকুচিত হলে প্রাণীরা কেবল বাসস্থান হারায় না; তারা খাদ্য, প্রজননক্ষেত্র এবং নিরাপদ চলাচলের পথও হারায়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, হুলুক গিবন ও ক্যাপড ল্যাঙ্গুরের মতো প্রজাতিগুলি ইতিমধ্যেই বন খণ্ডিত হওয়ার ফলে অস্তিত্ব সংকটে পড়েছে। একসময়ের সমৃদ্ধ বাস্তুতন্ত্র ধীরে ধীরে নীরব হয়ে যাচ্ছে।
বন্যার ভয়াবহতা বৃদ্ধি
অসমের মানুষ প্রতি বছর বন্যার সঙ্গে লড়াই করে। সাধারণভাবে বরাক ও ব্রহ্মপুত্রের প্রবল স্রোতকে এর জন্য দায়ী করা হলেও বননিধন এই সমস্যাকে বহুগুণ বাড়িয়ে তোলে।
বনভূমি বৃষ্টির জলকে ধরে রাখে, মাটিতে শোষিত হতে সাহায্য করে এবং নদীতে অতিরিক্ত পলি জমা পড়া রোধ করে।
বন না থাকলে—
বৃষ্টির জল দ্রুত নদীতে নেমে যায়,
মাটি ক্ষয় বৃদ্ধি পায়,
নদীর তলদেশ পলিতে ভরে যায়,
আকস্মিক বন্যার ঝুঁকি বৃদ্ধি পায়।
ফলে আজকের অসমে বন্যা শুধু একটি প্রাকৃতিক ঘটনা নয়; এটি আংশিকভাবে মানবসৃষ্ট পরিবেশগত সঙ্কট।
জলবায়ু পরিবর্তনের গতি ত্বরান্বিত হওয়া
বিজ্ঞানীরা দীর্ঘদিন ধরেই বলে আসছেন যে বন হলো পৃথিবীর ফুসফুস। গাছ কার্বন ডাই-অক্সাইড শোষণ করে জলবায়ুকে স্থিতিশীল রাখে।
অসমে গত দুই দশকের বননিধনের ফলে আনুমানিক ১৮০ মিলিয়ন টন কার্বন-সমতুল্য গ্রিনহাউস গ্যাস বায়ুমণ্ডলে নিঃসৃত হয়েছে।
এর প্রভাব সুদূরপ্রসারী—
তাপমাত্রা বৃদ্ধি,
অনিয়মিত বৃষ্টিপাত,
দীর্ঘস্থায়ী খরা,
চরম আবহাওয়ার ঘটনা বৃদ্ধি,
কৃষির উপর নেতিবাচক প্রভাব।
মাটি, জল ও কৃষির সঙ্কট
বনভূমির শিকড় মাটিকে দৃঢ়ভাবে ধরে রাখে। বন উজাড় হলে পাহাড়ি অঞ্চলে ভূমিধস বৃদ্ধি পায় এবং উর্বর মাটি নদীতে ভেসে যায়।
এর ফলে—
কৃষি উৎপাদন কমে,
নদী ভরাট হয়,
জলাধারগুলির ধারণক্ষমতা হ্রাস পায়,
গ্রামীণ অর্থনীতি দুর্বল হয়ে পড়ে।
একবার হারিয়ে যাওয়া উর্বর মাটি পুনর্গঠনে কখনও কখনও শতাব্দী লেগে যায়।
সমাজ ও অর্থনীতির উপর প্রভাব
অসমের হাজার হাজার মানুষ প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে বননির্ভর।
বন থেকে তারা পায়— জ্বালানি কাঠ, বাঁশ, বনজ খাদ্য, ঔষধি উদ্ভিদ, পানীয় জলের উৎস। বন ধ্বংস মানে কেবল পরিবেশের ক্ষতি নয়; এটি গ্রামীণ দরিদ্র মানুষের জীবনযাত্রার ভিত্তিকে দুর্বল করে দেওয়া।
মানুষ ও বন্যপ্রাণীর সংঘাত
যখন বনভূমি সংকুচিত হয়, তখন হাতি, বাঘ, চিতা ও অন্যান্য প্রাণী মানুষের বসতিতে প্রবেশ করতে বাধ্য হয়। ফসল নষ্ট হয়, প্রাণহানি ঘটে, প্রতিশোধমূলক হত্যা বাড়ে।
এভাবে বননিধন একটি দুষ্টচক্র সৃষ্টি করে—বননিধন → আবাসস্থল সংকোচন → প্রাণীর স্থানচ্যুতি → মানুষ-প্রাণী সংঘাত → জীববৈচিত্র্যের আরও ক্ষয়।
কী করা হয়েছে?
অসম সরকার ও বিভিন্ন সংস্থা ইতিমধ্যে কিছু গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে— বৃহৎ আকারের বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি, জলবায়ু সহনশীল গ্রাম প্রকল্প, স্যাটেলাইটভিত্তিক বন পর্যবেক্ষণ, সংরক্ষিত বনাঞ্চল সম্প্রসারণ, বনভূমি দখলমুক্ত করার অভিযান, স্থানীয় জনগোষ্ঠীকে সম্পৃক্ত করে বন সংরক্ষণ উদ্যোগ। তবে এসব পদক্ষেপ এখনও সমস্যার গভীরতার তুলনায় যথেষ্ট নয়।
নাগরিকদের কর্তব্য
প্রকৃতি রক্ষার দায় শুধু সরকারের নয়।
প্রতিটি নাগরিকের উচিত— স্থানীয় প্রজাতির গাছ রোপণ করা, বনজ সম্পদের অপচয় কমানো, বন অগ্নিকাণ্ড প্রতিরোধে সচেতন থাকা, অবৈধ গাছকাটা ও দখলের বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়া, পরিবেশ শিক্ষাকে সামাজিক আন্দোলনে পরিণত করা।
অসম কোন পথে?
অসমের ৩,৬০০ বর্গকিলোমিটার বৃক্ষাচ্ছাদন হারানোর ঘটনাটি কেবল একটি পরিবেশগত পরিসংখ্যান নয়; এটি উন্নয়নের প্রচলিত ধারণার প্রতি এক কঠিন প্রশ্ন। যে উন্নয়ন বন ধ্বংস করে, নদীকে বিপন্ন করে, জীববৈচিত্র্যকে নিশ্চিহ্ন করে এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের অধিকার কেড়ে নেয়—তা প্রকৃত উন্নয়ন হতে পারে না।
অসম আজ এক ঐতিহাসিক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। একদিকে স্বল্পমেয়াদি অর্থনৈতিক লাভের পথ, অন্যদিকে দীর্ঘমেয়াদি পরিবেশগত স্থিতিশীলতার পথ।
পছন্দটি আজকের প্রজন্মকেই করতে হবে। কারণ বন কেবল প্রকৃতির সম্পদ নয়; বন হলো সভ্যতার রক্ষাকবচ। অরণ্যের পতন মানে শেষ পর্যন্ত মানুষেরই পতন।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর একসময় লিখেছিলেন—“দাও ফিরে সে অরণ্য, লও এ নগর।” একবিংশ শতাব্দীর অসমে এই আহ্বান আর কাব্যের পঙ্ক্তি নয়; এটি হয়ে উঠেছে অস্তিত্ব রক্ষার শপথ।



