২৮ মে : কর্নাটকের রাজনীতিতে ফের চরম নাটকীয় পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। জোর জল্পনা চলছিল, কংগ্রেস হাইকম্যান্ডের নির্দেশ মেনে বৃহস্পতিবারই মুখ্যমন্ত্রীর পদ থেকে ইস্তফা দেবেন সিদ্দারামাইয়া। কিন্তু তার আগেই বুধবার গভীর রাতে আচমকাই বেঙ্গালুরু ছাড়লেন রাজ্যপাল থাওয়ারচাঁদ গেহলট। ফলে সিদ্দারামাইয়ার সম্ভাব্য ইস্তফা ঘিরে নতুন করে রাজনৈতিক ও আইনি অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে রাজ্যে।
সূত্রের খবর, বুধবার রাত সাড়ে ১০টা নাগাদ বেঙ্গালুরু থেকে রওনা দিয়ে রাত সাড়ে ১১টার বিমানে ইন্দোরের উদ্দেশে উড়ে যান রাজ্যপাল। রাজভবনের তরফে আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু জানানো না হলেও জানা গিয়েছে, জরুরি পারিবারিক কারণেই তাঁকে ইন্দোরে নিজের বাড়িতে যেতে হয়েছে। তবে তিনি কবে ফের বেঙ্গালুরু ফিরবেন, তা নিয়ে ধোঁয়াশা তৈরি হয়েছে। এমনকি তাঁর ফেরার বিমানের টিকিটও এখনও কাটা হয়নি বলে খবর।

এদিকে, রাজ্যপাল অনুপস্থিত থাকলেও নিজের অবস্থান থেকে সরছেন না সিদ্দারামাইয়া। মুখ্যমন্ত্রীর কার্যালয় ও কংগ্রেস সূত্রে খবর, পূর্ব নির্ধারিত সূচি মেনেই বৃহস্পতিবার সকাল ১১টা নাগাদ লোকভবনে গিয়ে রাজ্যপালের দপ্তরে নিজের পদত্যাগপত্র জমা দেবেন তিনি। পদত্যাগের আগে নিজের বাসভবনে মন্ত্রিসভার সদস্যদের জন্য সৌজন্যমূলক প্রাতঃরাশেরও আয়োজন করেছেন সিদ্দা। সেখানে উপস্থিত থাকার কথা উপমুখ্যমন্ত্রী ডিকে শিবকুমারেরও। রাজনৈতিক মহলের একাংশের মতে, তিনিই কর্নাটকের পরবর্তী মুখ্যমন্ত্রী হতে চলেছেন।
তবে রাজ্যপালের অনুপস্থিতিতে গোটা প্রক্রিয়া আইনিভাবে কতটা বিলম্বিত হতে পারে, তা নিয়ে শুরু হয়েছে নতুন জল্পনা। ইতিমধ্যেই কর্নাটকের রাজনৈতিক মহলে তীব্র চাঞ্চল্য ছড়িয়েছে এই ঘটনায়।
সূত্রের দাবি, কর্নাটকে এই নেতৃত্ব পরিবর্তনের নেপথ্যে রয়েছে কংগ্রেস হাইকম্যান্ডের দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক কৌশল। ২০২৮ সালের বিধানসভা নির্বাচনকে সামনে রেখে প্রদেশ কংগ্রেস সভাপতি তথা উপমুখ্যমন্ত্রী ডিকে শিবকুমারকে এখন থেকেই মুখ্যমন্ত্রীর আসনে বসাতে চাইছে এআইসিসি। ২০২৩ সালে কর্নাটকে কংগ্রেস সরকার গঠনের পর থেকেই সিদ্দারামাইয়া ও শিবকুমার শিবিরের মধ্যে ক্ষমতা ভাগাভাগির একটি ‘রোটেশনাল ফর্মুলা’ নিয়ে আলোচনা চলছিল। শিবকুমারের অনুগামীরা দীর্ঘদিন ধরেই সেই প্রতিশ্রুতি কার্যকর করার দাবি জানিয়ে আসছিলেন।
সম্প্রতি দিল্লিতে কংগ্রেস নেতৃত্বের সঙ্গে একাধিক বৈঠকে এই সংকট মেটানোর চেষ্টা হয়। কংগ্রেস সভাপতি মল্লিকার্জুন খাড়্গে, রাহুল গান্ধী এবং কেসি বেণুগোপাল দফায় দফায় সিদ্দারামাইয়া ও শিবকুমারের সঙ্গে আলোচনা করেন বলে দলীয় সূত্রে জানা গিয়েছে।
দলীয় অন্দরমহলের খবর, শিবকুমারের পক্ষে জোরালো সওয়াল করেছেন প্রিয়াঙ্কা গান্ধী। তিনি রাহুল গান্ধী, খাড়্গের পাশাপাশি সোনিয়া গান্ধীর সঙ্গেও এ বিষয়ে আলোচনা করেন এবং আগামী নির্বাচনের কথা মাথায় রেখে অবিলম্বে শিবকুমারকে মুখ্যমন্ত্রী করার পক্ষে মত দেন। রাজনৈতিক মহলের ধারণা, প্রিয়াঙ্কার সক্রিয় ভূমিকাতেই শেষ পর্যন্ত শিবকুমারের ভাগ্য খুলতে চলেছে। মঙ্গলবারই রাহুল গান্ধী ও খাড়্গে সিদ্দারামাইয়াকে পদত্যাগের স্পষ্ট বার্তা দেন বলেও সূত্রের দাবি।
তবে ওবিসি জননেতা সিদ্দারামাইয়াকে সম্পূর্ণভাবে অসন্তুষ্ট করতে চাইছে না কংগ্রেস নেতৃত্ব। তাঁকে সম্মানজনক পুনর্বাসনের প্রস্তাব হিসেবে রাজ্যসভায় পাঠানোর কথাও ভাবা হয়। পাশাপাশি ভবিষ্যতে সর্বভারতীয় স্তরে বড় সাংগঠনিক দায়িত্ব দেওয়ার আশ্বাসও দেওয়া হয় বলে জানা গিয়েছে। এমনকি তাঁর ঘনিষ্ঠ কাউকে প্রদেশ কংগ্রেস সভাপতির দায়িত্ব দেওয়ার সম্ভাবনাও খোলা রাখা হয়েছিল। কিন্তু ক্ষুব্ধ সিদ্দারামাইয়া সেই প্রস্তাব নাকচ করে দিয়েছেন বলে সূত্রের খবর। তিনি স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, দিল্লির রাজনীতিতে নয়, কর্নাটকের বিধায়ক হিসেবেই তিনি কাজ চালিয়ে যেতে চান।
কেরলে সদ্য ক্ষমতায় ফেরার পর কর্নাটকে লাগাতার গোষ্ঠীদ্বন্দ্বে স্বভাবতই অস্বস্তিতে কংগ্রেস নেতৃত্ব। তারই মধ্যে রাজ্যপালের আকস্মিক অনুপস্থিতি কর্নাটকের রাজনৈতিক সমীকরণকে আরও জটিল করে তুলেছে। এখন দেখার, এই রাজনৈতিক নাটকের পরবর্তী অধ্যায় কোন দিকে মোড় নেয়।



