মোহাম্মদ জনি, শ্রীভূমি।
বরাক তরঙ্গ, ৫ মে : রাজনীতিতে কিছুই স্থায়ী নয়—এই বহুল প্রচলিত কথাটিই যেন আবার প্রমাণ করল দক্ষিণ করিমগঞ্জের জনতা। প্রায় ২৬ বছর আগের এক বিতর্কিত রাজনৈতিক অধ্যায়ের জবাব এবার ভোটের মাধ্যমে দিলেন এলাকার মানুষ। আর সেই জবাবের কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এলেন প্রাক্তন গৃহমন্ত্রী আব্দুল মুক্তাদীর চৌধুরীর পুত্র আমিনুর রশিদ চৌধুরী। দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে এবারের নির্বাচনে রেকর্ড সংখ্যক ভোটে জয়লাভ করে আমিনুর শুধু একটি আসন দখল করেননি, বরং অনেকের মতে এটি ‘মধুর প্রতিশোধ’-এর প্রতিফলন। দক্ষিণ করিমগঞ্জের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা হয়েছে বলেই মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
উল্লেখযোগ্যভাবে, ২০০১ সালে আব্দুল মুক্তাদীর চৌধুরীর সঙ্গে রাজনৈতিক বিচ্ছেদের পর প্রথমবার বিধায়ক নির্বাচিত হয়েছিলেন সিদ্দিক আহমদ। সেই সময়ের রাজনৈতিক সমীকরণ নিয়ে নানা বিতর্ক থাকলেও, দীর্ঘ আড়াই দশক পর এবার ভোটাররা যেন নতুন করে সেই ইতিহাস লিখলেন। যদিও শারীরিক অসুস্থতার কারণে সিদ্দিক আহমদ সরাসরি নির্বাচনী লড়াইয়ে ছিলেন না, তবুও তাঁর সমর্থিত প্রার্থীর পক্ষে সক্রিয় প্রচার চালিয়েছিলেন। তবে শেষ পর্যন্ত জনতার রায় ভিন্ন বার্তা দিয়েছে।
ফলাফল ঘোষণার পর করিমগঞ্জ জেলা কংগ্রেসের মিডিয়া বিভাগের চেয়ারম্যান শাহাদাত আহমদ চৌধুরী কড়া প্রতিক্রিয়া জানিয়ে বলেন, “প্রায় তিন লক্ষ ভোটারের এই বিশাল এলাকায় গত ২৬ বছরে উন্নয়ন অত্যন্ত হতাশাজনক। চারবার বিধায়ক এবং মন্ত্রী থাকার পরও সিদ্দিক আহমদ দক্ষিণ করিমগঞ্জের সার্বিক উন্নয়নে ব্যর্থ হয়েছেন।”
তিনি অভিযোগ করেন, এলাকায় উন্নত রাস্তাঘাট, মানসম্পন্ন স্টেডিয়াম, স্বাস্থ্য পরিষেবা ও শিক্ষার পরিকাঠামোর চরম অভাব রয়েছে। শিল্প ও কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রেও উন্নয়ন হয়নি বলেও দাবি তাঁর। সীমান্ত উন্নয়নমন্ত্রীর দায়িত্বে থেকেও অবকাঠামোগত উন্নয়ন তেমন হয়নি বলে তিনি উল্লেখ করেন। নবনির্বাচিত বিধায়ক আমিনুর রশিদ চৌধুরীর সামনে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ এই পিছিয়ে পড়া অঞ্চলকে উন্নয়নের পথে এগিয়ে নেওয়া। শাহাদাত চৌধুরী বলেন, “দলীয় কর্মীরা তাঁর পাশে থাকবে। সবাইকে একসঙ্গে কাজ করে দক্ষিণ করিমগঞ্জকে নতুনভাবে গড়ে তুলতে হবে।”
অন্যদিকে, উত্তর করিমগঞ্জেও কংগ্রেসের সাফল্য প্রসঙ্গে তিনি বলেন, প্রার্থী জাকারিয়া আহমেদ পান্নার নাম ঘোষণার সঙ্গেই জয় অনেকটা নিশ্চিত হয়ে গিয়েছিল। শহরাঞ্চলে কংগ্রেসের ব্যাপক সমর্থন এবং ধর্ম-বর্ণের ঊর্ধ্বে উঠে ভোটদানকে তিনি ইতিবাচক দৃষ্টান্ত হিসেবে উল্লেখ করেন। এই নির্বাচনের একটি আবেগঘন দিকও সামনে এসেছে। প্রাক্তন মন্ত্রী আব্দুল মুক্তাদীর চৌধুরী জীবিত থাকতেই তাঁর পুত্রের ঐতিহাসিক জয় প্রত্যক্ষ করেছেন। জীবনের শেষ প্রান্তে দাঁড়িয়ে নিজের রাজনৈতিক উত্তরাধিকার যে তাঁরই পুত্রের হাতে সুরক্ষিত হয়েছে—এই দৃশ্য নিঃসন্দেহে হৃদয়স্পর্শী।
দক্ষিণ করিমগঞ্জে ২৬ বছরের রাজনৈতিক সমীকরণ বদলে দিয়ে ‘সিদ্দিক অধ্যায়’-এর অবসান ঘটেছে। এখন দেখার বিষয়, এই ‘মধুর প্রতিশোধ’ কতটা বাস্তব উন্নয়নের রূপ নেয় এবং জনতার প্রত্যাশা কতটা পূরণ করতে সক্ষম হন নবনির্বাচিত বিধায়ক।



