ডিজিটাল প্রজন্মের নিরব সংকট !

Spread the news

।। পাভলব লস্কর ।।
(প্রাক্তন ছাত্রনেতা, শিলচর)
৩১ মার্চ : বর্তমান যুগে আমরা যে ডিজিটাল মাধ্যমের যুগে বসবাস করছি, তার কিছু সুফল ও কুফল নিয়ে বিচার বিশ্লেষণের প্রয়োজন রয়েছে। একদিকে এই মাধ্যম বা প্রযুক্তি আমাদের দৈনন্দিন জীবনে অসীম সুবিধা নিয়ে এসেছে, অন্যদিকে এটি আমাদের মানসিক বিকাশ, চিন্তাশক্তি এবং সৃজনশীলতার ওপর এক অজানা চাপ সৃষ্টি করেছে। বিশেষত, উঠতি প্রজন্মের মাঝে যে পরিবর্তনটি আমরা লক্ষ করছি তা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। বাংলা ভাষায় পুস্তক, সংবাদপত্র এবং দীর্ঘ নিবন্ধ পড়ার আগ্রহ দিন দিন কমে যাচ্ছে। এর পরিবর্তে সোশ্যাল মিডিয়া, ছোট ভিডিও, গেম, এবং ওয়েব সিরিজে বিনোদন খুঁজে পেতে আগ্রহী হচ্ছে বিশেষত তরুণরা। এই পরিবর্তনকে শুধু একতরফা আধুনিকতার প্রতিফলন হিসেবে ধরে না নিয়ে এর পিছনের যে নেতিবাচক প্রভাব রয়েছে তার বিচার বিশ্লেষণ করাও জরুরী।

প্রযুক্তির প্রভাব প্রতিটি ক্ষেত্রেই প্রবাহিত হচ্ছে। ডিজিটাল ডিভাইসের মাধ্যমে সহজে তথ্য প্রাপ্তি, সোশ্যাল মিডিয়ার মাধ্যমে দ্রুত সম্পর্ক তৈরি এবং বিভিন্ন ধরনের বিনোদন উপকরণের সহজলভ্যতা, সবার মধ্যে নতুন ধরনের জীবনযাত্রার সৃষ্টি করেছে। তবে এতে একটি বড় সংকট ও তৈরি হচ্ছে — তা হলো, চিন্তাশক্তির বিলোপ। প্রয়োজনীয় চিন্তা-ভাবনা ছাড়া শুধুমাত্র দ্রুত তথ্য গ্রহণ করতে অভ্যস্ত হয়ে পড়ছে নতুন প্রজন্ম। চিন্তার গভীরতা এবং যুক্তির ব্যবহার ক্রমশঃ হারিয়ে যাচ্ছে।

আরও একটি উদ্বেগের বিষয় হলো এখনকার প্রজন্মের অধিকাংশ মানুষ পুস্তক বা দীর্ঘ নিবন্ধ পড়তে আগ্রহী নয়। তারা চায় দ্রুত এবং স্বল্প সময়ে তথ্য পেতে। এটি একদিকে সুবিধাজনক হলেও অন্যদিকে এটি ভাবনা চিন্তা, বিশ্লেষণ ক্ষমতা, এবং সৃজনশীলতাকে ক্ষয় করছে। পুস্তক বা নিবন্ধ পড়তে বসলে মনোযোগ আসে না। এর পরিবর্তে সোশ্যাল মিডিয়ার শর্ট ভিডিও, রিল এবং গেমস উপভোগ করার প্রবণতা বেশি লক্ষ্য করা যায়। এই পরিবর্তনটি ক্রমশ তরুণদের মধ্যে চিন্তাশক্তি এবং সৃজনশীলতা বিকাশের পথে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করছে।

এছাড়াও বাংলা ভাষা, যা আমাদের সাংস্কৃতিক ও জাতীয় পরিচয়ের অন্যতম অঙ্গ, আজকাল বেশিরভাগ বাঙালি তরুণদের কাছে একপ্রকার অবহেলিত হয়ে পড়েছে। পুস্তক এবং নিবন্ধের বদলে তারা ছোট ভিডিও, রিল, সোশ্যাল মিডিয়া পোস্ট ইত্যাদিতে অধিক আকর্ষিত, যা পড়াশোনার জন্য প্রয়োজনীয় ধৈর্য ও চিন্তা সঞ্চালনা করতে সহায়ক নয়। মাতৃভাষায় শিক্ষার গুরুত্ব অবহেলিত হচ্ছে, যা দেশের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য এবং চিন্তাশক্তির বিকাশে বিরূপ প্রভাব ফেলছে। যদি আমরা চিন্তা ও যুক্তির বিকাশে ব্যর্থ হই, তবে স্বাভাবিকভাবেই সৃষ্টিশীলতা কমে আসবে, সমাজে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। একজন যুব প্রজন্মের লোক, যদি তাঁর চিন্তা শক্তি প্রখর না হয় তবে তিনি সহজেই আবেগ বা অহংকার দ্বারা পরিচালিত হতে পারেন। তার মধ্যে যুক্তি বা নৈতিকতা, যা একজন ভাল নাগরিকের অন্যতম গুণ, তা সেভাবে গড়ে উঠবে না। এর ফলে সমাজে অস্থিতিশীলতা, দিশেহারা অবস্থা, গঠনমূলক কোনও সিদ্ধান্তে পৌঁছানো, ইত্যাদির উপর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে, যা ইতিমধ্যেই বিভিন্ন বিষয়ে বিভিন্ন সময়ে পরিলক্ষিত হয়।

তবে, এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের পথও খোলা আছে। আমাদের তরুণদের মধ্যে পাঠাভ্যাস ফিরিয়ে আনা, প্রযুক্তির ব্যবহার সংযত করে শিক্ষার গভীরতা বাড়ানো এবং ভাবনা বিকাশে গুরুত্ব দেওয়া অত্যন্ত প্রয়োজন। প্রিন্ট মিডিয়া, পুস্তক, লম্বা নিবন্ধ, বিতর্ক প্রতিযোগিতা, বক্তব্য, নিবন্ধ লিখা, আবৃত্তি, নাটক সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ইত্যাদির মাধ্যমে পরিস্থিতি বদলানো মনে হয় সম্ভব এবং চিন্তাশক্তি ও সৃজনশীলতা বৃদ্ধিতেও সহায়ক ভূমিকা পালন করবে।

প্রযুক্তি এবং বিনোদনের মাধ্যমগুলি অবশ্যই ব্যবহার হবে, তবে তা হওয়া উচিত সঠিকভাবে ব্যালেন্স করা। একটি আধুনিক যুব সমাজের জন্য যে চিন্তা ও যুক্তির বিকাশ প্রয়োজন, তা নিশ্চিত করতে আমাদের উচিত পড়াশোনা, মননশীলতা এবং বাস্তবতা থেকে বিচ্যুত না হয়ে সঠিক পথ অনুসরণ করা। এইভাবে, আমরা একটি শক্তিশালী, চিন্তাশীল, এবং সুস্থ যুব সমাজ গড়ে তুলতে পারব, যা আমাদের সমাজের শান্তি, সমৃদ্ধি, এবং প্রগতির ভিত্তি হয়ে দাঁড়াবে।

আশাকরি, এই নিবন্ধটি যেন তরুণ প্রজন্মের মনোযোগ আকর্ষণ করতে সক্ষম হয় এবং শিক্ষার প্রতি আগ্রহ ও চিন্তাশক্তির বিকাশে সহায়ক হয়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *