নাগরিকত্বের বিতর্কে বন্দি মানবতা

Spread the news

।। উত্তমকুমার সী ।।
(নিউজ এডিটর, দৈনিক সাময়িক প্রসঙ্গ)
১৮ জুন : কাঁটাতারের বেড়ার দু’পাশে দাঁড়িয়ে দুটি রাষ্ট্র। একদিকে ভারত, অন্যদিকে বাংলাদেশ। মাঝখানে কয়েকশো মিটার জমি- যার নাম নো-ম্যানস ল্যান্ড। আন্তর্জাতিক আইন ও সীমান্ত ব্যবস্থার ভাষায় এটি একটি নিরপেক্ষ অঞ্চল। কিন্তু সাম্প্রতিক মাসগুলোতে এই নো-ম্যানস ল্যান্ডই পরিণত হয়েছে এক ভয়াবহ মানবিক ট্র্যাজেডির মঞ্চে। সেখানে দিনের পর দিন আটকে থাকছেন নারী, শিশু ও বৃদ্ধ সহ বহু মানুষ। ভারত তাদের বাংলাদেশে পাঠাতে চাইছে, কিন্তু বাংলাদেশ তাদের গ্রহণ করতে অস্বীকার করছে। ফলে রাষ্ট্রের টানাপোড়েনের মাঝখানে মানুষের জীবন হয়ে উঠেছে সবচেয়ে সস্তা এবং সবচেয়ে অসহায় বাস্তবতা।

ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তে নো-ম্যানস ল্যান্ডের নীরব মানবিক বিপর্যয়_______

সম্প্রতি বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত ছবিগুলো এই সংকটের নির্মমতা আরও স্পষ্ট করে তুলেছে। কোথাও ধানক্ষেতের পাশে খোলা আকাশের নিচে বসে আছেন কয়েকজন নারী ও শিশু। কোথাও বৃষ্টির মধ্যে প্লাস্টিক টাঙিয়ে আশ্রয় নেওয়ার চেষ্টা করছেন সীমান্তে আটকে পড়া মানুষ। খাবার নেই, চিকিৎসা নেই, নিরাপত্তা নেই। আছে শুধু অনিশ্চয়তা। ছবির একটি ছোট্ট শিশুর মুখে হয়তো ক্ষুধার কান্না, কিন্তু সেই কান্না কোনও রাষ্ট্রের কূটনৈতিক আলোচনার বিষয় নয়। গত কয়েক মাস ধরে ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তের বিভিন্ন অংশে এমন ঘটনা বারবার ঘটছে। বিশেষ করে অসম, মেঘালয় ও পশ্চিমবঙ্গ সংলগ্ন সীমান্ত এলাকায় বহু মানুষকে সীমান্তে নিয়ে এসে বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। ভারতের দাবি, এদের অনেকেই অবৈধভাবে ভারতে বসবাসকারী বাংলাদেশি নাগরিক। অন্যদিকে বাংলাদেশের বক্তব্য, যাদের পাঠানো হচ্ছে তাদের পরিচয় ও নাগরিকত্ব নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত কাউকে গ্রহণ করা সম্ভব নয়। এই দ্বন্দ্বের ফলে তৈরি হয়েছে এক অদ্ভুত পরিস্থিতি। একজন মানুষকে ভারত বলছে বাংলাদেশি, আবার বাংলাদেশ বলছে তিনি তাদের নাগরিক নন। ফলে মানুষটি কার্যত কোনও রাষ্ট্রেরই নাগরিক হিসেবে স্বীকৃতি পাচ্ছেন না। নাগরিকত্বের এই অনিশ্চয়তা তাদের জীবনকে ঠেলে দিচ্ছে এক গভীর সংকটের দিকে।

সমস্যার শিকড় অবশ্য আজকের নয়। ভারত-বাংলাদেশ সীমান্ত বিশ্বের অন্যতম জটিল ও জনবহুল সীমান্ত। ইতিহাস, দেশভাগ, ভাষা, সংস্কৃতি এবং অর্থনৈতিক বাস্তবতার কারণে সীমান্তবর্তী অঞ্চলে মানুষের চলাচল বহু দশকের পুরনো ঘটনা। অনেক পরিবার আছে, যাদের আত্মীয়স্বজন দুই দেশেই ছড়িয়ে রয়েছে। আবার কর্মসংস্থান, দারিদ্র্য কিংবা সামাজিক কারণে সীমান্ত অতিক্রমের ঘটনাও দীর্ঘদিনের। ভারতে নাগরিকত্ব যাচাই, এনআরসি, বিদেশি ট্রাইব্যুনাল এবং অবৈধ অভিবাসন নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্ক গত এক দশকে আরও তীব্র হয়েছে। বিশেষত অসমে বহু মানুষকে ‘বিদেশি’ হিসেবে চিহ্নিত করার প্রক্রিয়া নিয়ে বিস্তর বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। মানবাধিকার সংগঠনগুলির অভিযোগ, অনেক ক্ষেত্রেই প্রকৃত ভারতীয় নাগরিকরাও নথিপত্রের জটিলতায় বিদেশি হিসেবে অভিযুক্ত হচ্ছেন। অন্যদিকে সরকারের বক্তব্য, দেশের নিরাপত্তা ও জনসংখ্যাগত ভারসাম্য রক্ষার জন্য অবৈধ অনুপ্রবেশ রোধ করা জরুরি।

১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময় কোটি কোটি শরণার্থীকে আশ্রয় দিয়ে ভারত যেমন মানবিকতার নজির গড়েছিল, তেমনি বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও সংকটের সময় দুই দেশই একে অপরের পাশে দাঁড়িয়েছে। সেই ইতিহাসই বলে, রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকতে পারে, কিন্তু মানবতার প্রশ্নে প্রতিবেশী দুই দেশের মধ্যে কোনও কাঁটাতার থাকা উচিত নয়। শেষ পর্যন্ত মনে রাখতে হবে, সীমান্ত মানচিত্রে আঁকা যায়, কিন্তু মানবতার কোনও সীমান্ত নেই। তাই এই সংকটের সমাধানও হতে হবে আইন, কূটনীতি এবং মানবিকতার সমন্বয়ে।

কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, একজন মানুষকে যদি সত্যিই অন্য দেশের নাগরিক বলে মনে করা হয়, তাহলে তাকে গ্রহণ করার বিষয়ে দুই দেশের মধ্যে স্পষ্ট কূটনৈতিক ও আইনি প্রক্রিয়া থাকা উচিত। আন্তর্জাতিক আইনও তাই বলে। কাউকে সীমান্তে ফেলে রেখে মানবেতর পরিস্থিতিতে বেঁচে থাকতে বাধ্য করা কোনও সভ্য রাষ্ট্রের আচরণ হতে পারে না। সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো শিশুদের অবস্থা। নো-ম্যানস ল্যান্ডে আটকে থাকা পরিবারগুলোর মধ্যে বহু শিশু রয়েছে। তারা বিদ্যালয়ে যেতে পারছে না, পুষ্টিকর খাবার পাচ্ছে না, চিকিৎসার সুযোগও নেই। একটি শিশু জানে না সে কোন দেশের নাগরিক, জানে না তার ভবিষ্যৎ কোথায়। রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারকদের কাছে এটি হয়তো একটি প্রশাসনিক সমস্যা, কিন্তু সেই শিশুর কাছে এটি তার সমগ্র জীবনের প্রশ্ন।

নারীদের পরিস্থিতিও অত্যন্ত করুণ। সীমান্তের খোলা প্রান্তরে নিরাপত্তাহীন পরিবেশে দিন কাটাতে হচ্ছে তাদের। স্বাস্থ্যবিধি, ব্যক্তিগত নিরাপত্তা এবং চিকিৎসা সবকিছুই অনিশ্চিত। এই বর্ষাকালে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ। বৃষ্টি, কাদা, সাপ-পোকামাকড় এবং রোগব্যাধির ঝুঁকি তাদের জীবনকে আরও দুর্বিষহ করে তুলেছে। মানবাধিকার সংগঠনগুলো বারবার সতর্ক করেছে, সীমান্ত ব্যবস্থাপনা ও অভিবাসন নিয়ন্ত্রণের নামে মানবাধিকারের মৌলিক নীতিগুলো যেন লঙ্ঘিত না হয়। একজন ব্যক্তির নাগরিকত্ব নিয়ে বিতর্ক থাকতে পারে, কিন্তু তার খাদ্য, আশ্রয়, চিকিৎসা ও মর্যাদার অধিকার নিয়ে কোনও বিতর্ক থাকতে পারে না। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সনদও একই কথা বলে।

ভারত ও বাংলাদেশ, দুই দেশই দীর্ঘদিনের বন্ধুপ্রতিম প্রতিবেশী। নিরাপত্তা, বাণিজ্য, যোগাযোগ ও আঞ্চলিক সহযোগিতার ক্ষেত্রে দুই দেশের সম্পর্ক বর্তমানে অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ। সেই কারণেই সীমান্তে আটকে থাকা এই মানুষগুলোর দুর্দশা আরও বেদনাদায়ক। কারণ এটি এমন একটি সমস্যা, যার সমাধান সংঘাত নয়, বরং আলোচনার মাধ্যমেই সম্ভব। দুই দেশের প্রশাসনের উচিত প্রতিটি ব্যক্তির পরিচয় যাচাইয়ের জন্য যৌথ ব্যবস্থা গড়ে তোলা, দ্রুত তদন্ত সম্পন্ন করা এবং সিদ্ধান্ত না হওয়া পর্যন্ত মানবিক সহায়তা নিশ্চিত করা। কোনও মানুষকে অনির্দিষ্টকালের জন্য নো-ম্যানস ল্যান্ডে ফেলে রাখা কখনও গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। কাঁটাতারের বেড়া রাষ্ট্রকে আলাদা করতে পারে, কিন্তু মানুষের ক্ষুধা, কান্না কিংবা বেঁচে থাকার আকাঙ্ক্ষাকে আলাদা করতে পারে না। সীমান্তের সেই ধানক্ষেতে বসে থাকা শিশুটি, বৃষ্টিভেজা প্লাস্টিকের নিচে আশ্রয় নেওয়া বৃদ্ধ মানুষটি কিংবা উদ্বিগ্ন মা কোনও ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণের অংশ নয়, তারা প্রথমত মানুষ। আর সভ্যতার প্রকৃত পরীক্ষা হয় তখনই, যখন রাষ্ট্র তার সীমান্ত রক্ষা করার পাশাপাশি মানুষের মর্যাদাকেও সমান গুরুত্ব দেয়।
নো-ম্যানস ল্যান্ডে আটকে থাকা এই মানুষগুলো কোনও পরিসংখ্যান নয়, কোনও রাজনৈতিক বিতর্কের উপকরণও নয়। তারা রক্ত-মাংসের মানুষ, যাদের স্বপ্ন আছে, পরিবার আছে, বেঁচে থাকার অধিকার আছে। নাগরিকত্বের প্রশ্ন, সীমান্ত নিরাপত্তা কিংবা রাষ্ট্রীয় আইন অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ মানবতা। কারণ সভ্যতার ইতিহাসে রাষ্ট্র এসেছে পরে, মানুষ এসেছে আগে। আজ প্রয়োজন ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে আরও কার্যকর কূটনৈতিক আলোচনা, যৌথ যাচাই-বাছাই ব্যবস্থা এবং মানবিক সংকট মোকাবিলায় সমন্বিত উদ্যোগ। যাদের নাগরিকত্ব নিয়ে বিতর্ক রয়েছে, তাদের পরিচয় যাচাই না হওয়া পর্যন্ত নিরাপদ আশ্রয়, খাদ্য, চিকিৎসা ও শিশুদের জন্য ন্যূনতম সুরক্ষার ব্যবস্থা করা দুই রাষ্ট্রেরই নৈতিক দায়িত্ব। সীমান্ত রক্ষার পাশাপাশি মানবিক মর্যাদা রক্ষাও সমান গুরুত্বপূর্ণ, এই উপলব্ধিই হওয়া উচিত ভবিষ্যতের পথনির্দেশ।
ভারত ও বাংলাদেশ অতীতে বহু কঠিন পরিস্থিতিতে মানবতার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে।

১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময় কোটি কোটি শরণার্থীকে আশ্রয় দিয়ে ভারত যেমন মানবিকতার নজির গড়েছিল, তেমনি বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও সংকটের সময় দুই দেশই একে অপরের পাশে দাঁড়িয়েছে। সেই ইতিহাসই বলে, রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকতে পারে, কিন্তু মানবতার প্রশ্নে প্রতিবেশী দুই দেশের মধ্যে কোনও কাঁটাতার থাকা উচিত নয়। শেষ পর্যন্ত মনে রাখতে হবে, সীমান্ত মানচিত্রে আঁকা যায়, কিন্তু মানবতার কোনও সীমান্ত নেই। তাই এই সংকটের সমাধানও হতে হবে আইন, কূটনীতি এবং মানবিকতার সমন্বয়ে।
নোবেলজয়ী কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ভাষায়, ‘মানুষের উপর বিশ্বাস হারানো পাপ, সে বিশ্বাস শেষ পর্যন্ত রক্ষা করতেই হবে।’ আজ নো-ম্যানস ল্যান্ডে আটকে থাকা মানুষগুলোর দিকে তাকিয়ে সেই বিশ্বাসটুকুই আবার নতুন করে জাগ্রত করার সময় এসেছে। কারণ রাষ্ট্রের শক্তি তার কাঁটাতারে নয়, মানুষের প্রতি তার আচরণেই সবচেয়ে বেশি প্রতিফলিত হয়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *