।। বিভূতিভূষণ গোস্বামী ।।
(এডিটর, মিজোরাম পোস্ট)
১৬ অক্টোবর : শরতের আকাশে সাদা মেঘের ভেলা। নদীর ধারে কাশফুলের দোলা। শিউলির গন্ধে ভোরের বাতাস যখন স্নিগ্ধ হয়ে ওঠে, তখনই বাঙালির ঘরে ঘরে শুরু হয় এক চিরপরিচিত অপেক্ষা—মা আসছেন। সঙ্গে তাঁর চার সন্তান—লক্ষ্মী, সরস্বতী, কার্তিক ও গণেশ। কৈলাস ছেড়ে মর্ত্যে আসবেন উমা, কয়েক দিনের জন্য ফিরে আসবেন পিতৃগৃহে। এই বিশ্বাসের মধ্যেই বাঙালির দুর্গাপুজোর আবেগ, আনন্দ ও পারিবারিক আত্মীয়তার এক আশ্চর্য মেলবন্ধন।
কিন্তু এই চিরপরিচিত দেবীকে ঘিরে একটি আপাতসরল প্রশ্ন কখনও কি আমাদের মনে জেগেছে? মা দুর্গার বয়স কত? তাঁর স্বামী মহাদেবের বয়সই বা কত? গণেশ, কার্তিক, লক্ষ্মী ও সরস্বতী—এঁরা কত বছরের? দেবলোকেও কি বয়স বাড়ে? সেখানেও কি শৈশব, যৌবন, বার্ধক্য রয়েছে? নাকি দেবদেবীরা এমন এক অস্তিত্বের অধিকারী, যেখানে সময়ের কোনও হিসাব চলে না?
এ কি কেবল শিল্পীর নির্মাণ? নিশ্চয়ই প্রতিমা শিল্পের সৃষ্টি। কিন্তু সেই শিল্পের ভিতরে রয়েছে মানুষের চিরন্তনকে ধরে রাখার আকাঙ্ক্ষা। মানুষ জানে, তার নিজের জীবন ক্ষণস্থায়ী। তাই সে এমন এক মাতৃরূপ কল্পনা করেছে, যাঁর কাছে ফিরে আসা যায় বারবার, যাঁর বয়সের সঙ্গে নিজের বয়সের প্রতিযোগিতা নেই। মায়ের কাছে সন্তান চিরকাল সন্তানই থাকে। এই অনুভূতির মধ্যেই বাঙালির দুর্গাপুজো কেবল ধর্মীয় উৎসবের সীমা অতিক্রম করে পারিবারিক ও সাংস্কৃতিক উৎসবে পরিণত হয়েছে।
(১)
প্রশ্নগুলি শুনতে কিছুটা কৌতূহলোদ্দীপক, এমনকি কারও কাছে অদ্ভুতও মনে হতে পারে। কিন্তু হিন্দু পুরাণ, শাক্তদর্শন এবং ভারতীয় কালচিন্তার গভীরে প্রবেশ করলে দেখা যায়, এই প্রশ্নের মধ্যে লুকিয়ে রয়েছে এক বিস্ময়কর দার্শনিক অনুসন্ধান। মানুষ সময়ের মধ্যে জন্মায়, সময়ের মধ্যেই বড় হয়, একদিন সময়ের কাছেই আত্মসমর্পণ করে। অথচ যাঁদের মানুষ দেবতা বলে কল্পনা করেছে, তাঁরা কি সেই একই সময়ের অধীন?
(২)
দেবী দুর্গার বয়সের সন্ধান করতে গেলে প্রথমেই ফিরে যেতে হয় মার্কণ্ডেয় পুরাণের অন্তর্গত দেবীমাহাত্ম্য বা শ্রীশ্রীচণ্ডী-র কাছে। সেখানে রাজা সুরথ মহামায়ার প্রকৃত পরিচয় জানতে চেয়েছিলেন ঋষি মেধসের কাছে। দেবী কে? কোথা থেকে তাঁর উৎপত্তি? কী তাঁর স্বরূপ? কীভাবে তিনি জগতে আবির্ভূত হন? ঋষির উত্তরে রয়েছে দেবীর বয়সসংক্রান্ত প্রশ্নের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সূত্র—
‘নিত্যৈব সা জগন্মূর্তিস্তয়া সর্বমিদং ততম্।’ অর্থাৎ, সেই দেবী নিত্যা। সমগ্র জগৎই তাঁর স্বরূপ, তিনি সমস্ত বিশ্বে পরিব্যাপ্ত।
এর পরেই বলা হয়েছে, দেবতাদের কার্যসিদ্ধির জন্য যখন তিনি আবির্ভূত হন, তখন জগতে তাঁকে জন্মগ্রহণ করেছেন বলে অভিহিত করা হয়। অথচ প্রকৃতপক্ষে তিনি নিত্যা। দেবীমাহাত্ম্য-র প্রথম অধ্যায়ের ৬৪–৬৬ শ্লোকের এই বক্তব্য শাক্তধর্মের অন্যতম মৌলিক দার্শনিক ভিত্তি। অর্থাৎ দেবীর আবির্ভাব আছে, কিন্তু তাঁর অস্তিত্বের কোনও নির্দিষ্ট সূচনা নেই। তিনি কোনও একটি সময়ে সৃষ্টি হয়েছেন, এমন নয়। প্রয়োজন অনুসারে তিনি বিভিন্ন রূপে প্রকাশিত হন।
এখানেই মানুষের জন্মের সঙ্গে দেবীর আবির্ভাবের মৌলিক পার্থক্য। মানুষের জন্ম একটি নির্দিষ্ট সময়ের ঘটনা। দেবীর জন্ম বলতে পুরাণে অনেক ক্ষেত্রেই বোঝানো হয়েছে তাঁর শক্তির প্রকাশ।
এই ব্যাখ্যা গ্রহণ করলে দেবী দুর্গার বয়স বছর, শতাব্দী কিংবা সহস্রাব্দে নির্ধারণ করা সম্ভব নয়। তিনি অনাদি, অর্থাৎ যাঁর আদির সন্ধান পাওয়া যায় না; আবার অনন্ত, যাঁর অস্তিত্বের শেষও নেই।
কিন্তু প্রশ্ন উঠতেই পারে, দেবী যদি জন্মরহিতা হন, তা হলে পুরাণে তাঁর জন্মকাহিনি এত বিস্তারিতভাবে বর্ণিত হয়েছে কেন? শিবপুরাণের রুদ্রসংহিতায় সতী ও পার্বতীর কাহিনি রয়েছে। প্রজাপতি দক্ষের কন্যা সতী ছিলেন মহাদেবের পত্নী। পিতা দক্ষের যজ্ঞে স্বামীর অপমান সহ্য করতে না পেরে তিনি দেহত্যাগ করেন। পরবর্তী সময়ে সেই সতীই হিমালয়রাজ হিমবান ও মেনকার কন্যা পার্বতীরূপে আবির্ভূত হন। পার্বতীর শৈশব আছে। কৈশোর আছে। কঠোর তপস্যার মধ্য দিয়ে শিবকে পতিরূপে লাভ করার কাহিনিও আছে। পুরাণের বর্ণনায় তিনি যেন এক মানবী, যাঁর জীবনের বিভিন্ন পর্যায় রয়েছে।

তা হলে পার্বতীর বয়স কি গণনা করা সম্ভব? একটি নির্দিষ্ট পৌরাণিক কাহিনির মধ্যে পার্বতীর জন্ম থেকে বিবাহ পর্যন্ত সময়ের ধারাবাহিকতা কল্পনা করা যায়। কিন্তু সেই বয়সকে দেবীর চিরন্তন সত্তার বয়স বলে ধরে নেওয়া যায় না। এখানে দুটি স্তর আলাদা করে বুঝতে হবে। একটি হল দেবীর মানবসদৃশ লীলাময় জীবন, অন্যটি তাঁর মহাশক্তির স্বরূপ। প্রথমটির মধ্যে জন্ম ও বয়সের ধারণা আছে। দ্বিতীয়টি সময়ের সীমা অতিক্রম করে।
(৩)
দুর্গার বয়সের প্রশ্নের সঙ্গে অবধারিতভাবে জড়িয়ে যায় মহাদেবের বয়স। বাঙালির লোককল্পনায় শিব কখনও ভোলানাথ, কখনও সংসারবিমুখ যোগী, কখনও আবার উমার স্বামী ও সন্তানদের পিতা। তাঁর মাথায় জটা, শরীরে ভস্ম, গলায় সাপ। কোনও কোনও লোকচিত্রে তিনি যেন এক বৃদ্ধ, অথচ তাঁর শক্তি ও অস্তিত্ব চিরযৌবনের। শৈবদর্শনে শিবকে অনাদি, অনন্ত ও মহাকাল বলা হয়। মহাকাল শব্দটির মধ্যেই রয়েছে সময়ের সীমা অতিক্রম করার ধারণা। যে সময় সমস্ত জীবকে জন্ম, বৃদ্ধি ও মৃত্যুর দিকে নিয়ে যায়, শিবকে সেই সময়েরও অতীত বলে কল্পনা করা হয়েছে।
তবে বিভিন্ন পুরাণে শিবের প্রকাশ ও সৃষ্টিতত্ত্বের ভিন্ন বর্ণনা পাওয়া যায়। কোথাও তিনি সর্বোচ্চ পরমসত্তা, কোথাও মহাজাগতিক সৃষ্টির এক বিশেষ পর্যায়ে তাঁর প্রকাশের কথা বলা হয়েছে। এই পার্থক্যগুলি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ হিন্দু পুরাণ কোনও একক লেখকের রচিত, সম্পূর্ণ অভিন্ন মতবাদের গ্রন্থ নয়। দীর্ঘকাল ধরে বিভিন্ন ধর্মীয় সম্প্রদায়, অঞ্চল ও দার্শনিক ধারার মধ্যে এর কাহিনিগুলি বিকশিত হয়েছে।
সুতরাং শিবের বয়স কত লক্ষ কিংবা কত কোটি বছর—এমন নির্দিষ্ট সংখ্যা দেওয়া শাস্ত্রসম্মতভাবে প্রতিষ্ঠিত নয়। শৈব ভাবনায় তিনি কালাতীত; আবার পুরাণের লীলাকাহিনিতে তিনি পার্বতীর স্বামী ও গণেশ-কার্তিকের পিতা। এই দুই পরিচয়ের মধ্যেই লুকিয়ে রয়েছে দেবত্বের এক গভীর বৈপরীত্য—যিনি সময়ের অতীত, তিনিই সময়ের মধ্যে সংসার করছেন।
(৪)
দুর্গার পরিবারের সদস্যদের মধ্যে গণেশের জন্মকাহিনি সম্ভবত সবচেয়ে পরিচিত। শিবপুরাণের একটি প্রচলিত বর্ণনা অনুযায়ী, পার্বতী নিজের দেহের মল বা অঙ্গরাগ থেকে এক বালকের সৃষ্টি করেন। তাঁকে দ্বাররক্ষার দায়িত্ব দেন। শিব সেখানে উপস্থিত হলে বালক তাঁকে প্রবেশ করতে বাধা দেয়। সংঘর্ষের এক পর্যায়ে শিব তার মস্তক ছিন্ন করেন। পরে পার্বতীর ক্রোধ প্রশমিত করতে হস্তীমস্তক সংযোজন করে বালককে পুনর্জীবিত করা হয়। সেই বালকই গণেশ। এই কাহিনিতে গণেশের সৃষ্টির একটি নির্দিষ্ট মুহূর্ত রয়েছে। অর্থাৎ তাঁর জন্মের ঘটনা আছে। কিন্তু সেই ঘটনা আজ থেকে কত বছর আগে ঘটেছিল, পুরাণ তার কোনও নির্ভরযোগ্য সংখ্যাগত হিসাব দেয় না।
তবে আরও একটি প্রশ্ন এখানে গুরুত্বপূর্ণ। গণেশকে আমরা কখনও শিশুরূপে দেখি, কখনও যুবকসুলভ দেবতা হিসেবে, আবার কখনও পরিণত জ্ঞানী রূপে। তাঁর গজানন, লম্বোদর কিংবা বিঘ্ননাশক পরিচয় কোনও নির্দিষ্ট বয়সের সঙ্গে সম্পর্কিত নয়। তিনি একই সঙ্গে মাতৃস্নেহের সন্তান এবং জ্ঞান ও সিদ্ধির অধিষ্ঠাতা দেবতা।
মানুষের ক্ষেত্রে শৈশব থেকে বার্ধক্যের দিকে অগ্রসর হওয়া একটি অনিবার্য জৈবিক প্রক্রিয়া। গণেশের ক্ষেত্রে পৌরাণিক কাহিনি সেই প্রক্রিয়ার কোনও পূর্ণ জীবনপঞ্জি দেয় না। সুতরাং গণেশের জন্মকাহিনি থাকলেও তাঁর বর্তমান বয়স নির্ধারণের সুযোগ নেই। জন্মের পৌরাণিক বিবরণ আর জন্ম থেকে অতিবাহিত বছরের হিসাব এক বিষয় নয়।
(৫)
দুর্গার আর এক পুত্র কার্তিক। দেবসেনাপতি, স্কন্দ, কুমার, ষণ্মুখ, সুব্রহ্মণ্য—নানা নামে তিনি পরিচিত। স্কন্দপুরাণ ও অন্যান্য পৌরাণিক আখ্যানের বিভিন্ন ধারায় কার্তিকের জন্মের সঙ্গে শিবের তেজ, অগ্নি, গঙ্গা এবং কৃত্তিকা নক্ষত্রের অধিষ্ঠাত্রী মাতৃকাদের সম্পর্কের কথা বলা হয়েছে। দেবসেনাপতি হিসেবে তাঁর প্রধান দায়িত্ব তারকাসুরবধ। কার্তিকের জন্মকাহিনিতে বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে তাঁর অসাধারণ শক্তি ও দ্রুত বিকাশ। অল্প বয়সেই তিনি অসুরবধের উপযুক্ত হয়ে ওঠেন। এই বর্ণনার মধ্যেও দেবতা ও মানুষের বয়সের ধারণার পার্থক্য স্পষ্ট।
বাংলার প্রতিমায় কার্তিক সাধারণত সুদর্শন যুবক। ময়ূরবাহন, সুগঠিত দেহ, মুখে যৌবনের দীপ্তি। লোকসংস্কৃতিতে তাঁর চিরকুমার পরিচয়ও বিশেষভাবে প্রচলিত, যদিও বিভিন্ন আঞ্চলিক পুরাণ ও উপাসনাধারায় তাঁর বিবাহসংক্রান্ত ভিন্ন কাহিনি রয়েছে। এখানে ‘কুমার’ শব্দটিকে কেবল বয়সের পরিচয় হিসেবে দেখলে ভুল হবে। এটি তাঁর দেবত্ব, যৌবন, বীরত্ব ও বিশেষ ধর্মীয় পরিচয়ের সঙ্গেও যুক্ত। কার্তিকের বয়স কি তা হলে ষোলো, কুড়ি কিংবা পঁচিশ বছর? না। তাঁর যুবকসুলভ প্রতিমা বয়সের প্রামাণ্য দলিল নয়। সেটি এক বিশেষ দেবভাবের শিল্পিত প্রকাশ। কার্তিক যেন সেই যৌবনের প্রতীক, যা সময়ের সঙ্গে ক্ষয়প্রাপ্ত হয় না।

(৬)
এবার আসা যাক এমন একটি প্রশ্নে, যেখানে পুরাণ এবং বাঙালির লোকবিশ্বাসের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য রয়েছে। আমাদের শারদীয় দুর্গাপ্রতিমায় লক্ষ্মী ও সরস্বতী দুর্গার দুই কন্যা। গণেশ ও কার্তিক তাঁর দুই পুত্র। এই পারিবারিক বিন্যাস বাঙালির কাছে এতটাই স্বাভাবিক যে এর বাইরে দুর্গাপ্রতিমা কল্পনা করাও কঠিন। কিন্তু প্রাচীন পুরাণের বিভিন্ন বর্ণনায় এই সম্পর্ক সর্বত্র এক নয়।
বৈষ্ণব পুরাণ ও ধর্মীয় ঐতিহ্যে লক্ষ্মী প্রধানত বিষ্ণুর সহধর্মিণী। সমুদ্রমন্থনের সময় তাঁর আবির্ভাবের কাহিনি বিশেষভাবে পরিচিত। অন্যদিকে সরস্বতী জ্ঞান, বাণী, সংগীত ও বিদ্যার অধিষ্ঠাত্রী দেবী। বিভিন্ন পুরাণে তাঁর সঙ্গে ব্রহ্মার সম্পর্কের ভিন্ন ভিন্ন বর্ণনা রয়েছে।
প্রাচীন পুরাণের প্রধান ধারাগুলিতে লক্ষ্মী ও সরস্বতীকে শিব-পার্বতীর দুই জৈবিক কন্যা হিসেবে ধারাবাহিকভাবে বর্ণনা করা হয়নি। বাংলার সপরিবার দুর্গার প্রতিমারূপে তাঁদের কন্যা হিসেবে প্রতিষ্ঠা মূলত আঞ্চলিক ধর্মীয় সংস্কৃতি ও লোকঐতিহ্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য।
এখানেই পুরাণ ও লোকসংস্কৃতির আশ্চর্য মিলন। বাংলার মানুষ দুর্গাকে শুধু মহিষাসুরমর্দিনী হিসেবে দেখেনি। তাঁকে ঘরের মেয়ে করেছে। সেই মেয়ের সঙ্গে সাজিয়ে দিয়েছে এক পূর্ণাঙ্গ সংসার। লক্ষ্মী সেখানে সমৃদ্ধির প্রতীক, সরস্বতী জ্ঞানের, গণেশ শুভারম্ভের, কার্তিক বীরত্বের। আর তাঁদের সকলের কেন্দ্রে মা দুর্গা—শক্তি ও মাতৃত্বের সমন্বিত প্রতিমা। লক্ষ্মী ও সরস্বতীর বয়স নির্ধারণের প্রশ্নেও তাই দুটি স্তর রয়েছে। তাঁদের স্বতন্ত্র দেবীসত্তার উৎস নিয়ে নানা পৌরাণিক বর্ণনা আছে; কিন্তু সেসব থেকে তাঁদের বর্তমান বয়সের কোনও একক সংখ্যা পাওয়া যায় না। আবার বাংলার পারিবারিক প্রতিমারূপে তাঁদের বয়স নিয়ে নির্দিষ্ট শাস্ত্রীয় নির্দেশও নেই। তাঁরা প্রতিমায় তরুণী। কিন্তু এই তারুণ্য নিত্য, অবিনশ্বর।
(৭)
হিন্দু পুরাণের কালচিন্তা সাধারণ মানুষের সময়বোধের তুলনায় অনেক বিস্তৃত। বিষ্ণুপুরাণ ও ভাগবতপুরাণের মতো গ্রন্থে যুগ, মহাযুগ, মন্বন্তর ও কল্পের মাধ্যমে মহাজাগতিক সময়ের ধারণা ব্যাখ্যা করা হয়েছে।
প্রচলিত পুরাণীয় গণনা অনুযায়ী—
সত্যযুগ: ১৭,২৮,০০০ বছর
ত্রেতাযুগ: ১২,৯৬,০০০ বছর
দ্বাপরযুগ: ৮,৬৪,০০০ বছর
কলিযুগ: ৪,৩২,০০০ বছর
এই চার যুগ মিলে একটি মহাযুগ, যার দৈর্ঘ্য ৪৩,২০,০০০ মানববর্ষ। এক হাজার মহাযুগে ব্রহ্মার এক দিবস বা কল্প—অর্থাৎ ৪৩২ কোটি বছর। সমদৈর্ঘ্যের একটি রাত্রিও রয়েছে।
এই বিপুল সময়ের ধারণা থেকে কি দেবী দুর্গার বয়স নির্ণয় করা সম্ভব? এখানেই রয়েছে মূল সমস্যা। পুরাণীয় কালগণনায় কোনও নির্দিষ্ট সৃষ্টি, মন্বন্তর বা ঘটনার সময়কাল বোঝানো যেতে পারে। কিন্তু যে দেবীকে সৃষ্টিরও পূর্ববর্তী আদ্যাশক্তি হিসেবে কল্পনা করা হয়েছে, তাঁকে সেই সৃষ্টির সময়সীমার মধ্যে আবদ্ধ করা যায় না। শাক্তদর্শনে মহাশক্তি কেবল একটি কল্পের অধিষ্ঠাত্রী নন; সৃষ্টি, স্থিতি ও প্রলয়ের চক্রের সঙ্গেও তাঁর সম্পর্ক। সুতরাং কোটি কোটি বছরের হিসাবও দেবীর বয়স নির্ধারণে যথেষ্ট নয়। এখানে একটি বৈজ্ঞানিক পার্থক্যও মনে রাখা প্রয়োজন। পুরাণীয় যুগ ও কল্পের সংখ্যা ধর্মীয় মহাজাগতিক কালধারণার অংশ। এগুলিকে আধুনিক জ্যোতির্বিজ্ঞান বা ইতিহাসের পরীক্ষিত সময়রেখার সঙ্গে অভিন্ন বলে ধরে নেওয়া যায় না। পুরাণের সময় এক ধরনের ধর্মীয় ও দার্শনিক ব্যাখ্যা; বিজ্ঞানের সময় পরিমাপ ও পর্যবেক্ষণনির্ভর।
(৮)
দেবীভাগবত পুরাণে আদ্যাশক্তির স্বরূপ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে তাঁকে সমগ্র সৃষ্টির মূল কারণ হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে। প্রথম স্কন্ধের তৃতীয় অধ্যায়ে মহাদেবীর দর্শনসংক্রান্ত বর্ণনায় বিষ্ণুর বক্তব্যে দেবীকে মহামায়া, মহাবিদ্যা, অবিনশ্বর ও নিত্যা বলে পরিচয় দেওয়া হয়েছে। সেখানে দেবীকে ব্রহ্মা, বিষ্ণু ও মহেশ্বরেরও মূল কারণ হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। এই ব্যাখ্যায় দেবী শুধু জগতের কোনও এক সদস্য নন। তিনি জগতের অস্তিত্বের ভিত্তি। যদি সময় নিজেই সৃষ্টিজগতের একটি অংশ হয়, তবে সেই সৃষ্টির আদিকারণকে সময়ের সাধারণ নিয়মে মাপা সম্ভব কি? শাক্তদর্শনের উত্তর—সম্ভব নয়।
আমরা বলি, একটি মানুষের বয়স ষাট বছর। অর্থাৎ তাঁর জন্মের পর পৃথিবী সূর্যকে ষাটবার প্রদক্ষিণ করেছে। বয়স এখানে একটি নির্দিষ্ট ঘটনার পর থেকে অতিবাহিত সময়ের পরিমাপ। কিন্তু যাঁর কোনও প্রথম জন্মমুহূর্ত নেই, তাঁর ক্ষেত্রে সেই পরিমাপ প্রয়োগ করা যায় না। এই অর্থে দেবী দুর্গার বয়স ‘অসংখ্য কোটি বছর’ বললেও সম্পূর্ণ অর্থ প্রকাশ পায় না। কারণ অসংখ্য কোটি বছরও একটি পরিমেয় সময়। অনন্তের ধারণা তার চেয়ে আলাদা। দেবী শুধু অতিপ্রাচীন নন, তিনি কালাতীত। এখানেই দেবীর বয়সের প্রশ্নটি একটি দার্শনিক প্রশ্নে পরিণত হয়।
(৯)
দুর্গাপুজোর সবচেয়ে বিস্ময়কর বৈশিষ্ট্য সম্ভবত এখানেই। প্রতি বছর মা আসেন। তাঁর মুখে সেই চিরপরিচিত প্রশান্তি, চোখে সেই মায়া, হাতে সেই অস্ত্র, পদতলে মহিষাসুর। পাশে লক্ষ্মী, সরস্বতী, কার্তিক ও গণেশ। এক বছর যায়। দশ বছর যায়। পঞ্চাশ বছর যায়। মানুষের বয়স বাড়ে। শিশুরা বড় হয়, বড়রা বৃদ্ধ হন, এক প্রজন্মের জায়গায় আসে অন্য প্রজন্ম। কিন্তু মা দুর্গার বয়স বাড়ে না।শৈশবে যে মানুষ মায়ের প্রতিমা দেখে বিস্মিত হয়েছিল, বার্ধক্যে এসে সে-ই আবার একই মাতৃমুখের সামনে দাঁড়ায়। মাঝখানে বদলে গেছে তার জীবন, সংসার, সমাজ, পৃথিবী। অথচ মায়ের মুখ যেন অপরিবর্তিত।
এ কি কেবল শিল্পীর নির্মাণ? নিশ্চয়ই প্রতিমা শিল্পের সৃষ্টি। কিন্তু সেই শিল্পের ভিতরে রয়েছে মানুষের চিরন্তনকে ধরে রাখার আকাঙ্ক্ষা। মানুষ জানে, তার নিজের জীবন ক্ষণস্থায়ী। তাই সে এমন এক মাতৃরূপ কল্পনা করেছে, যাঁর কাছে ফিরে আসা যায় বারবার, যাঁর বয়সের সঙ্গে নিজের বয়সের প্রতিযোগিতা নেই। মায়ের কাছে সন্তান চিরকাল সন্তানই থাকে। এই অনুভূতির মধ্যেই বাঙালির দুর্গাপুজো কেবল ধর্মীয় উৎসবের সীমা অতিক্রম করে পারিবারিক ও সাংস্কৃতিক উৎসবে পরিণত হয়েছে।
(শাস্ত্র ও পাঠসূত্র)
এই নিবন্ধের মূল পৌরাণিক ভিত্তি মার্কণ্ডেয় পুরাণের দেবীমাহাত্ম্য (বিশেষত প্রথম অধ্যায়, ৬৪–৬৬ শ্লোক), শিবপুরাণ-এর রুদ্রসংহিতা, দেবীভাগবত পুরাণ-এর প্রথম স্কন্ধ, এবং পুরাণীয় কালগণনার প্রচলিত ব্যাখ্যা। বাংলার সপরিবার দুর্গাপ্রতিমার ঐতিহ্য বোঝার ক্ষেত্রে আঞ্চলিক লোকসংস্কৃতি ও প্রতিমাতত্ত্বও বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে। পুরাণের বিভিন্ন পাঠ ও সম্প্রদায়ের মতপার্থক্য যেখানে রয়েছে, সেখানে একটিমাত্র ব্যাখ্যাকে সর্বজনীন বলে গ্রহণ করা হয়নি।



