।। প্রদীপ দত্তরায় ।।
(আইনজীবী, গৌহাটি হাইকোর্ট)
২১ অক্টোবর : মণ্ডপে অধিষ্ঠিত দেবী প্রতিমা। দেবীর রাজকীয় রূপের মধ্যেও অসুরদলনী মাতৃমূর্তির মুখাবয়বে ফুটে উঠেছে এক অপূর্ব মায়াময় লালিত্য। সেই মুখশ্রী দেখেই শ্রদ্ধা, ভালোবাসা ও ভক্তিতে একাত্ম হয়ে ওঠেন প্রতিটি বাঙালি। মায়ের মুখে চিরন্তন অভয়বাণী, শরণাগত আর্ত মানুষের পরিত্রাণের আশ্বাস। দেবীর কাছে উচ্চ-নীচ, আপন-পরের কোনও ভেদাভেদ নেই। সকলের আর্তি, দুঃখ, দুর্দশা ও সংকট মোচনের আশ্বাস নিয়েই তিনি নেমে এসেছেন ভক্তদের মাঝে। তাই মায়ের চরণে নিজেদের সব গোপন কষ্ট, অব্যক্ত বেদনা আর অনুচ্চারিত কান্না নিবেদন করেন বাঙালি। পরিত্রাণের আশায় নিজেদের সমর্পণ করেন জগজ্জননীর কাছে।

পুরোহিতের উদাত্ত মন্ত্রোচ্চারণ আর সন্ধ্যারতির অপূর্ব আবেশে দেবী হয়ে ওঠেন সকলের একান্ত আপনজন। মনে হয়, তিনি যেন ঘরেরই মেয়ে। তাই বাঙালি উমাকে ঘরের মেয়ের মতোই সাদরে বরণ করে নেয়। আর সেই আপনজনকে বিদায় দেওয়ার কথা ভাবতেই মন ভারাক্রান্ত হয়ে ওঠে। তাই বাঙালির আকুল কণ্ঠে ধ্বনিত হয় সেই চিরন্তন আকুতি—
‘যেও না নবমী নিশি লয়ে তারাদলে,
তুমি গেলে দয়াময়ী এ পরাণ যাবে।’
কিন্তু মানুষের আকুল প্রার্থনায় তো সময়ের গতি থেমে থাকে না। রাত পোহায়, নবমীর নিশি শেষে আসে দশমীর ভোর। আর সেই ভোরের আলোতেই প্রতিটি বাঙালির হৃদয়ে নেমে আসে বিচ্ছেদের বিষণ্ণ ছায়া। যেন আপনজনকে হারানোর এক গভীর শূন্যতা গ্রাস করে সবাইকে।
মণ্ডপ থেকে যখন প্রতিমা বিসর্জনের উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করে, তখন বিদায়ের সেই বিষাদময় সুর ছড়িয়ে পড়ে সকলের অন্তরে। চোখের সামনে ধীরে ধীরে দূরে সরে যান ঘরের মেয়ে উমা। হয়তো সেই বিচ্ছেদের যন্ত্রণা কিছুটা ভুলে থাকার জন্যই সিঁদুরখেলার মতো নানা আচার-অনুষ্ঠানে মেতে ওঠেন বাঙালিরা। নাচে-গানে বিসর্জনযাত্রাকে আনন্দময় করে তোলার চেষ্টা চলে। কিন্তু সত্যিই কি তাতে মায়ের বিদায়ের বেদনা উপশম হয়?
হৃদয়ের গভীরে তখনও বেজে চলে সেই করুণ প্রশ্ন—
‘মাকে ভাসায়ে জলে,
কি ধন লয়ে যাব ঘরে,
ঘরে গিয়ে মা বলিব কারে?’
এই প্রশ্ন চিরন্তন। এই প্রশ্নের উত্তরও যেন অধরা।
বিসর্জন শেষে যখন বাঙালি ফিরে আসে মণ্ডপে, তখন মাতৃমূর্তিহীন শূন্য মণ্ডপ আরও একবার প্রকট করে তোলে আপনজন হারানোর বেদনা। যে মণ্ডপ কয়েক দিন আগেও আলো, আনন্দ, উৎসাহ আর মানুষের কোলাহলে মুখর ছিল, সেখানে নেমে আসে এক অদ্ভুত নিস্তব্ধতা। তিন দিনের আনন্দঘন মুহূর্ত, আত্মীয়-স্বজন ও বন্ধুদের মিলনমেলা, উৎসবের উচ্ছ্বাস—সবকিছুর পর আবার সেই চেনা, ছকে বাঁধা জীবনে ফিরে যাওয়ার পালা। দৈনন্দিন জীবনের ব্যস্ততা ও অভ্যস্ততার কাছে ফিরে যাওয়ার ভাবনাও কিছুক্ষণের জন্য হলেও মনকে বিষণ্ণ করে তোলে। তবু মানুষ তো আশা নিয়েই বাঁচে। বিচ্ছেদের বেদনাকে সঙ্গী করেই সে নতুন করে স্বপ্ন দেখতে শেখে। তাই শূন্য মণ্ডপের দিকে তাকিয়ে, মায়ের স্মৃতিকে হৃদয়ে ধারণ করে বাঙালি নিজেকেই সান্ত্বনা দেয়— ‘আসছে বছর আবার হবে।’
এই একটি বাক্যের মধ্যেই লুকিয়ে থাকে অপেক্ষা, প্রত্যাশা আর পুনর্মিলনের অদম্য আকাঙ্ক্ষা। মায়ের বিদায় মানেই তো চিরবিদায় নয়। আবার একটি বছর অপেক্ষা, আবার নতুন করে আগমনের আনন্দে মাতোয়ারা হওয়ার প্রতিশ্রুতি।

পুরোহিতের বিসর্জনমন্ত্রেও তাই ধ্বনিত হয় ফিরে আসার সেই চিরন্তন প্রত্যাশা—
‘ওঁ গচ্ছ গচ্ছ পরং স্থানং,
স্বস্থানং পরমেশ্বরী,
সম্বৎসর ব্যতীতে তু
পুনরাগমনায় চ।’
অর্থাৎ, হে পরমেশ্বরী, তুমি তোমার পরম স্থানে ফিরে যাও। এক বছর অতিবাহিত হলে আবার ফিরে এসো আমাদের মাঝে।
এই ফিরে আসার অপেক্ষাতেই বেঁচে থাকে বাঙালির শারদোৎসব। বিসর্জনের বিষাদ পেরিয়ে তাই আবারও হৃদয়ে জেগে ওঠে আগমনী সুর। কারণ, বাঙালির কাছে দুর্গাপুজো শুধু কয়েক দিনের উৎসব নয়—এ এক আবেগ, এক আত্মিক বন্ধন, এক চিরন্তন ভালোবাসার নাম। আর সেই ভালোবাসার টানেই প্রতি বছর প্রতিটি বাঙালির হৃদয় অপেক্ষা করে থাকে উমার পুনরাগমনের।



