গাছের শুকনো ডালেই ফুটে ওঠে দেব-দেবীর জীবন্ত রূপ_______
দিলোয়ার বড়ভূইয়া, কাবুগঞ্জ।
বরাক তরঙ্গ, ১৩ মে : প্রকৃতির পরিত্যক্ত উপাদানও যে অনন্য শিল্পকর্মে রূপ নিতে পারে, তার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন কাছাড় জেলার ধলাইয়ের মথুরাপুর জিপির বিদ্যারতনপুর এলাকার প্রবীণ শিল্পী ভানু কান্ত রায়। শুকনো গাছের ডাল, ভাঙা কাঠ কিংবা কদম গাছের পরিত্যক্ত অংশ—যেগুলো সাধারণ মানুষের কাছে আবর্জনা বা জ্বালানি হিসেবেই পরিচিত, সেগুলোকেই নিজের সৃজনশীলতা ও নিপুণ কারুকার্যের মাধ্যমে দেব-দেবীর জীবন্ত মূর্তিতে রূপ দিচ্ছেন তিনি। প্রায় ৫৬ বছর ধরে শিল্পচর্চার সঙ্গে যুক্ত ভানু কান্ত রায় আজ ধলাই কিংবা কাছাড়ের গণ্ডি পেরিয়ে অসমের শিল্পমহলেও পরিচিত নাম। তাঁর হাতে তৈরি প্রতিটি শিল্পকর্মে ফুটে ওঠে সূক্ষ্ম নকশা, নিখুঁত গঠন এবং এক গভীর আধ্যাত্মিক আবহ, যা সহজেই দর্শকদের মুগ্ধ করে।
শিল্পী জানান, ছোটবেলা থেকেই শিল্পের প্রতি তাঁর গভীর অনুরাগ ছিল। প্রথমদিকে মাটির মূর্তি নির্মাণের মাধ্যমে শিল্পজীবনের সূচনা হলেও পরে তিনি গাছের শুকনো ডাল ও প্রাকৃতিক কাঠামো ব্যবহার করে অভিনব শিল্পকর্ম তৈরিতে মনোনিবেশ করেন। বিশেষ করে কদম গাছের ডালের স্বাভাবিক বাঁক ও গঠনকে কাজে লাগিয়ে অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে দেব-দেবীর অবয়ব ফুটিয়ে তোলেন তিনি।
ভানু কান্ত রায় বলেন, “প্রকৃতির মধ্যেই শিল্পের প্রকৃত সৌন্দর্য লুকিয়ে থাকে। আমি শুধু সেই সৌন্দর্যকে নতুনভাবে তুলে ধরার চেষ্টা করি।” তাঁর এই ব্যতিক্রমী শিল্পকর্মের চাহিদা এখন রাজ্যের সীমানা ছাড়িয়ে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে পড়েছে। মুম্বাই, দিল্লি, কলকাতাসহ একাধিক শহর থেকে নিয়মিত অর্ডার আসে তাঁর কাছে। বিভিন্ন মন্দির, ধর্মীয় অনুষ্ঠান ও ব্যক্তিগত সংগ্রহের জন্য তাঁর তৈরি মূর্তি বিশেষ জনপ্রিয়তা অর্জন করেছে।
শুধু দেশেই নয়, আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রেও পৌঁছে গেছে তাঁর শিল্পের খ্যাতি। তাঁর হাতে তৈরি একাধিক শিল্পকর্ম ইতিমধ্যেই আমেরিকায় স্থান পেয়েছে। বিদেশ থেকেও নিয়মিত অর্ডার পাচ্ছেন বলে জানান তিনি। সীমিত সুযোগ-সুবিধার মধ্যেও শিল্পসাধনাকেই জীবনের মূল লক্ষ্য হিসেবে ধরে রেখেছেন এই প্রবীণ শিল্পী।
স্থানীয় বাসিন্দাদের মতে, ভানু কান্ত রায় শুধু একজন শিল্পী নন, তিনি গোটা এলাকার গর্ব। তাঁর সৃষ্টিশীলতা নতুন প্রজন্মকেও শিল্পচর্চায় অনুপ্রাণিত করছে। অনেকের মতে, সরকারি সহায়তা ও উপযুক্ত স্বীকৃতি পেলে তাঁর মতো প্রতিভাবান শিল্পীরা আন্তর্জাতিক মঞ্চে অসম তথা দেশের নাম আরও উজ্জ্বল করতে সক্ষম হবেন।
প্রকৃতির পরিত্যক্ত উপাদানকে শিল্পের স্পর্শে নতুন জীবন দেওয়ার এই বিরল প্রতিভা সত্যিই ব্যতিক্রমী। ধলাইয়ের মাটিতে বসেই ভানু কান্ত রায় প্রমাণ করে চলেছেন—একজন প্রকৃত শিল্পীর হাতে সাধারণ জিনিসও হয়ে উঠতে পারে অসাধারণ শিল্পকর্ম।



