বরাক তরঙ্গ, ২০ মে : ভাষা শহিদদের স্মরণ শুধু আনুষ্ঠানিকতায় সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না, মাতৃভাষার অধিকার রক্ষায় আত্মসমালোচনা ও সচেতনতার প্রয়োজন রয়েছে বলে মন্তব্য করলেন প্রথিতযশা কবি-সাংবাদিক অতীন দাশ। তাঁর বক্তব্য, বিভিন্ন ক্ষেত্রে শহিদ স্মরণের নামে যা হচ্ছে, তার অনেকটাই “আত্মপ্রতারণা” ছাড়া আর কিছু নয়। উনিশে মে বরাক নাগরিক সংসদ-এর উদ্যোগে শিলচর প্রেস ক্লাবে “ভাষিক অধিকার : স্বকীয়তা ও আত্মপরিচয়ের সংকট” বিষয়ে আলোচনাসভায় তিনি এ কথা বলেন।
অনুষ্ঠানে বিভিন্ন ক্ষেত্রে দীর্ঘদিনের অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ “উনিশে-একুশে সম্মাননা পদক” প্রদান করা হয় কবি-সাংবাদিক স্মৃতি পাল নাথ, অধ্যাপক-লেখক নবেন্দু বণিক এবং সমাজকর্মী-সাংস্কৃতিক সংগঠক শরিফ উজ-জামান লস্কর-কে। উত্তরীয়, পুষ্পস্তবক, সনদপত্র, সম্মাননা স্মারক ও সুবর্ণ পদক দিয়ে তাঁদের সম্মানিত করা হয়।
আলোচনায় অতীন দাশ বলেন, ভাষা আন্দোলনের ৬৫ বছর পেরিয়ে গেলেও রক্তের বিনিময়ে অর্জিত ভাষিক অধিকার রক্ষায় বরাকবাসী কতটা সচেতন, তা নিয়ে যথেষ্ট প্রশ্ন রয়েছে। অন্য ভাষিক গোষ্ঠীর দিকে আঙুল তোলার আগে নিজেদের আত্মবিশ্লেষণের প্রয়োজনীয়তার কথাও তুলে ধরেন তিনি। তাঁর মতে, প্রতিনিয়ত মাতৃভাষাকে অবজ্ঞা করে বছরে একদিন শহিদদের নামে স্লোগান দিলেই দায়বদ্ধতা শেষ হয়ে যায় না। তিনি বলেন, “সব মিলিয়ে একটা হতাশাজনক চিত্র তৈরি হয়েছে। অনেকেই যেন পথভ্রষ্ট হয়ে পড়েছেন।”
সম্মাননা প্রাপক স্মৃতি পাল নাথ বলেন, রক্তরঞ্জিত উনিশের মূল বার্তা হল— কোনও আগ্রাসনের কাছে মাথা নত না করা। ভাষা শহিদদের স্মরণে তিনি স্বরচিত কবিতাও আবৃত্তি করেন।
শরিফ উজ-জামান লস্কর বলেন, ভাষা শহিদরাই তাঁর জীবনের প্রেরণা। কেন্দ্র সরকারের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে দায়িত্ব পালনকালে মাতৃভাষার অধিকার রক্ষায় তিনি সচেষ্ট ছিলেন বলেও উল্লেখ করেন। মাতৃভাষার প্রশ্নে কোনও আপস নয় বলেও দৃঢ় অবস্থান ব্যক্ত করেন তিনি। অধ্যাপক নবেন্দু বণিকের বক্তব্য, ভাষা আন্দোলনের গৌরবগাথা নতুন প্রজন্মের মধ্যে ছড়িয়ে দিতে হবে এবং দৈনন্দিন জীবনে মাতৃভাষার চর্চাকে আরও গুরুত্ব দিতে হবে।
সভায় শংকর দে বলেন, ভাষিক পরিচয়ের কারণে কোনও জনগোষ্ঠীকে হেয় প্রতিপন্ন বা অবদমিত করে রাখা মেনে নেওয়া যায় না। যে কোনও মূল্যে তার প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে।
অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য রাখেন কবি-শিক্ষিকা কস্তুরী হোম চৌধুরী, লেখিকা আরতী দাশ, অবসরপ্রাপ্ত ক্যাপ্টেন সুকৃতি ভট্টাচার্য, কবি-সমাজকর্মী শতদল আচার্য, আইনজীবী জ্যোতিপ্রকাশ ভট্টাচার্য, সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব কিরণ রাস এবং কবি-সাংবাদিক মৃদুলা ভট্টাচার্য প্রমুখ।
অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন রিতেন ভট্টাচার্য। তিনি বলেন, ভাষার জন্য যাঁরা আত্মবলিদান দিয়েছেন, তাঁদের চেতনা ও আদর্শকে মনন ও চিন্তায় জীবন্ত করে রাখতে হবে। শেষে ভাষা শহিদদের স্মরণে সম্মিলিত সঙ্গীত পরিবেশন করেন সুরমল্লার-এর শিল্পীরা।



