অটোচালকই তিন মিজো যুবতীর কাছে দূত, দেহব্যবসা চক্রের হাত থেকে রক্ষা, উদ্ধার ৮, গ্রেফতার ৬

Spread the news

বরাক তরঙ্গ, ১০ মে : অটোচালকই তিন যুবতীর কাছে দূত। জাতপাত, ভাষা, ধর্ম নয় এক মানবতার পরিচয় দিয়ে দেহব্যবসা চক্রের হাত থেকে তিন মিজো যুবতীকে রক্ষা করলেন উত্তরাখণ্ডের উধম সিং নগর জেলার রুদ্রপুরের অটোচালক।

সংবাদ সূত্রে জানা যায়, উত্তরাখণ্ডের উধম সিং নগর জেলার রুদ্রপুরে কথিত এক দেহব্যবসা চক্রের হাত থেকে মিজোরামের তিন তরুণী সাহসিকতার সঙ্গে পালিয়ে আসতে সক্ষম হন। এক স্থানীয় অটোরিকশা চালকের সহায়তায় তাঁদের উদ্ধার সম্ভব হয়। পরে মিজোরাম ও উত্তরাখণ্ড পুলিশের যৌথ অভিযানে আরও পাঁচ তরুণীকে উদ্ধার করা হয় এবং ছয়জন অভিযুক্তকে গ্রেফতার করা হয়েছে।

পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, উদ্ধার হওয়া তরুণীদের বয়স ২০ থেকে ২২ বছরের মধ্যে। ফেসবুকে প্রকাশিত “আকর্ষণীয় চাকরির” বিজ্ঞাপন দেখে তাঁরা প্রলুব্ধ হন। মাসিক ২০ হাজার টাকা বেতনের প্রতিশ্রুতি দিয়ে তাঁদের মিজোরাম থেকে নিয়ে যাওয়া হয়। কিন্তু রুদ্রপুরে পৌঁছানোর পর তাঁদের একটি স্পায় আটকে রেখে জোরপূর্বক শোষণ ও নির্যাতন চালানো হয় বলে অভিযোগ।

অভিযোগ অনুযায়ী, এক মিজো মহিলা এবং তাঁর উত্তরপ্রদেশের সঙ্গী ওই স্পা পরিচালনা করতেন। কয়েক মাস ধরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের মাধ্যমে তরুণীদের টার্গেট করা হয়। তাঁদের আইজল থেকে সড়কপথে গুয়াহাটি, সেখান থেকে ট্রেনে দিল্লি এবং পরে ট্যাক্সিতে রুদ্রপুরে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে পৌঁছে চাকরির বাইরে “অতিরিক্ত কাজ” করতে বাধ্য করা হয়। প্রতিশ্রুত বেতনের বদলে তাঁদের মাত্র ৫০০ টাকা দেওয়া হত। পাশাপাশি হুমকি, মাদক খাইয়ে অচেতন রাখা এবং একটি ঘরে আটকে রাখার অভিযোগও উঠেছে। দারিদ্র্যের কারণে কাজের সন্ধানে বাড়ি ছেড়েছিলেন ওই তরুণীরা।

এপ্রিলের শেষ দিকে তিন তরুণী আর নির্যাতন সহ্য করতে না পেরে গোপনে এক অটোরিকশা চালকের সঙ্গে যোগাযোগ করেন, যিনি নিয়মিত তাঁদের বিভিন্ন স্থানে নিয়ে যেতেন। পুলিশ জানিয়েছে, ওই চালকই ছিলেন একমাত্র ব্যক্তি যাঁর উপর তাঁরা ভরসা করতে পেরেছিলেন। তিনি দ্রুত স্পায় পৌঁছে ঘরের তালা ভেঙে তিনজনকে উদ্ধার করেন এবং সরাসরি রুদ্রপুর রেলস্টেশনে পৌঁছে দেন। শুধু তাই নয়, ভাষাগত সমস্যার কথা বিবেচনা করে তিনি তাঁদের ট্রেনের তথ্য দেন এবং মিজোরামে ফেরার জন্য কিছু টাকাও দেন।

উদ্ধার হওয়া এক তরুণী ১ মে আইজলে পৌঁছে অল উইমেন পুলিশ স্টেশনে অভিযোগ দায়ের করেন। এরপরই শুরু হয় যৌথ তদন্ত। আইজলের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (অপরাধ) জোরামথারা জানান, একটি বিশেষ তদন্তকারী দল (SIT) গঠন করা হয় এবং মহিলা পরিদর্শক মারিয়ার নেতৃত্বে একটি দল উত্তরাখণ্ডে পাঠানো হয়।

মঙ্গলবার উত্তরাখণ্ডের মানবপাচার বিরোধী ইউনিটের সঙ্গে যৌথভাবে ওই স্পায় অভিযান চালানো হয়। অভিযানে আরও পাঁচজন মিজো তরুণীকে উদ্ধার করা হয়। ফলে মোট উদ্ধার হওয়া তরুণীর সংখ্যা দাঁড়ায় আটে।

উত্তরাখণ্ডের ইউএস নগরের এসএসপি অজয় গণপতি জানিয়েছেন, অভিযানে মোট ছয়জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। ধৃতদের মধ্যে রয়েছেন স্পা পরিচালনাকারী মিজো মহিলা ও তাঁর সঙ্গী, দৈনন্দিন কার্যক্রম পরিচালনাকারী আরও চারজন এবং অভিযুক্ত মহিলার বোন।

পুলিশের দাবি, এই চক্রটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করে উত্তর-পূর্ব ভারতের কর্মসংস্থানের খোঁজে থাকা তরুণীদের টার্গেট করত এবং দারিদ্র্য ও পারিবারিক বিশ্বাসের সুযোগ নিয়ে তাঁদের ফাঁদে ফেলত।

মিজোরাম পুলিশের পরিদর্শক মারিয়া জানান, তদন্ত এখনও চলছে এবং আরও তথ্য সংগ্রহের জন্য দলটি উত্তরাখণ্ডেই অবস্থান করবে। অতিরিক্ত পুলিশ সুপার জোরামথারা বলেন, পালাতে না পারে সেজন্য তরুণীদের মাদক খাইয়ে ভয় দেখানো হত। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভুয়ো চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে উত্তর-পূর্ব ভারতের মহিলাদের মানবপাচারের বিষয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *