
মোহাম্মদ জনি, শ্রীভূমি।
বরাক তরঙ্গ, ১ নভেম্বর : বড়সড় দুর্ঘটনার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে অসম-আগরতলা জাতীয় সড়কের তিনখালের লঙাই সেতুকে ঘিরে। পাথারকান্দির তিনখালে লঙাই নদীর উপর নির্মিত গুরুত্বপূর্ণ আরসিসি সেতুটির মাঝের দুটি জয়েন্টের একাধিক অংশ নিচের দিকে বসে যাওয়ায় আতঙ্ক ছড়িয়েছে স্থানীয়দের মধ্যে। সেতুর সামনে ব্যারিকেড বসানো হলেও তা উপেক্ষা করেই অবাধে চলাচল করছে পাথরবোঝাই ট্রাকসহ ভারী যানবাহন। ফলে যে কোনও মুহূর্তে বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন এলাকাবাসী।
বরাক উপত্যকা ও ত্রিপুরার মধ্যে সড়ক যোগাযোগের অন্যতম প্রধান মাধ্যম ৮ নম্বর জাতীয় সড়ক। প্রতিদিন এই সড়ক দিয়ে অসংখ্য যাত্রীবাহী বাস, ছোট-বড় গাড়ি এবং পণ্যবাহী ট্রাক চলাচল করে। অথচ এই গুরুত্বপূর্ণ সড়কের তিনখাল এলাকায় লঙাই নদীর উপর থাকা সেতুটির বেহাল দশা ক্রমশ উদ্বেগ বাড়াচ্ছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, সেতুর মাঝখানের দুটি জয়েন্টের বেশ কয়েকটি অংশ ইতিমধ্যে নিচের দিকে বসে গেছে। সেতুর এই পরিস্থিতিতে স্বাভাবিকভাবেই আতঙ্কিত হয়ে পড়েছেন নিত্যযাত্রীরা। বিশেষ করে পাথরবোঝাই ট্রাকসহ ভারী যানবাহনের নিয়মিত চলাচলে সেতুর উপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি হচ্ছে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। পরিস্থিতির গুরুত্ব বিবেচনা করেই সেতুর সামনে ব্যারিকেড স্থাপন করা হয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে। কিন্তু বাস্তবে সেই ব্যারিকেডের পাশ দিয়েই চলছে ভারি যানবাহন।

স্থানীয়দের অভিযোগ, অতিরিক্ত ওজন বহনকারী ট্রাকগুলির চলাচল বন্ধে কোনও কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না। সেতু যদি বিপজ্জনক অবস্থায় থাকে, তাহলে ভারী যানবাহন চলাচল কীভাবে অব্যাহত রয়েছে, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। তাঁদের বক্তব্য, শুধু ব্যারিকেড বসিয়ে দায়িত্ব শেষ করলে চলবে না। মানুষের জীবন ও সম্পত্তির নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে প্রশাসনকে।
সেতুটির উপর দিয়ে প্রতিদিন স্কুল-কলেজের পড়ুয়া, কর্মজীবী মানুষ, ব্যবসায়ী, যাত্রীবাহী বাস এবং পণ্যবাহী যানবাহন চলাচল করে। ফলে সেতুর নিরাপত্তা নিয়ে কোনওরকম অবহেলা বড় বিপর্যয়ের কারণ হতে পারে। ইতিমধ্যে স্থানীয় মহলে অনিপুর ডেইলি সেতুর দুর্ঘটনার প্রসঙ্গও উঠে এসেছে। তাঁদের আশঙ্কা, সময় থাকতে ভারী যানবাহন ও অতিরিক্ত ওজনবাহী লরির চলাচল নিয়ন্ত্রণ করা না হলে তিনখালেও অনুরূপ দুর্ঘটনার আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
উল্লেখ্য, বিগত প্রায় দুই বছর ধরে বিভিন্ন সময়ে মেরামতির মাধ্যমে কোনওরকমে সচল রাখা হয়েছে সেতুটি। অভিযোগ, সেতুর উপরিভাগের রড বেরিয়ে আসার পর নির্মাণকারী সংস্থার পক্ষ থেকে পুনরায় ঢালাই করে মেরামতির কাজ করা হয়েছিল। কিন্তু বারবার সংস্কারের পরও সেতুর কাঠামোগত নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ কাটেনি। সাময়িক মেরামতির পরিবর্তে কেন এখনও স্থায়ী সমাধানের ব্যবস্থা করা হয়নি, সেই প্রশ্নও তুলছেন এলাকাবাসী।

সেতুটি শুধু শ্রীভূমি জেলার যোগাযোগের ক্ষেত্রেই নয়, অসম ও ত্রিপুরার মধ্যে আন্তঃরাজ্য সড়ক যোগাযোগের ক্ষেত্রেও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কোনও কারণে সেতুটি ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে যান চলাচল বন্ধ হয়ে গেলে দুই রাজ্যের মধ্যে পণ্য পরিবহণ, যাত্রী চলাচল, ব্যবসা-বাণিজ্য এবং জরুরি পরিষেবা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হতে পারে।
এই পরিস্থিতিতে অবিলম্বে পূর্ত বিভাগ, জাতীয় সড়ক কর্তৃপক্ষ এবং সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের উচ্চপদস্থ আধিকারিকদের সেতুটি পরিদর্শনের দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা। অভিজ্ঞ সেতু বিশেষজ্ঞ ও প্রকৌশলীদের দিয়ে পূর্ণাঙ্গ কাঠামোগত পরীক্ষা, সেতুর প্রকৃত বহনক্ষমতা নির্ধারণ এবং প্রয়োজন অনুযায়ী ভারী যানবাহন চলাচলে নিষেধাজ্ঞা জারির দাবি উঠেছে। পাশাপাশি সেতুটির স্থায়ী সংস্কার কিংবা প্রয়োজন হলে পুনর্নির্মাণের জন্য দ্রুত পদক্ষেপ গ্রহণের আহ্বান জানানো হয়েছে।
এখন এলাকাবাসীর প্রশ্ন, বড় কোনও দুর্ঘটনা ঘটার আগেই কি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করবে? নাকি অনিপুরের মতো কোনও বিপর্যয়ের পরই প্রশাসনের টনক নড়বে? তাঁদের স্পষ্ট দাবি, দুর্ঘটনার পর তদন্ত নয়, দুর্ঘটনার আগেই চাই প্রশাসনের জরুরি হস্তক্ষেপ। ব্যারিকেডের আড়ালে বিপদের ঝুঁকি রেখে নয়, দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের মাধ্যমে তিনখালের লঙাই সেতুর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে।



