
সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি, শান্তি ও পারস্পরিক বিশ্বাস অটুট রাখার আহ্বান জেলা কমিটির
মোহাম্মদ জনি, শ্রীভূমি।
বরাক তরঙ্গ, ২৯ অক্টোবর : শ্রীভূমির সাম্প্রতিক বিসর্জনকাণ্ডকে কেন্দ্র করে সামাজিক ও সাংস্কৃতিক বিভাজন সৃষ্টির অপচেষ্টার বিরুদ্ধে সরব হলো অসম ব্রাহ্মণ সমাজের শ্রীভূমি জেলা কমিটি। কয়েকজন যুবকের মধ্যে সংঘটিত অনভিপ্রেত সংঘর্ষের ঘটনাকে অসমীয়া সংস্কৃতি তথা বিহু অনুষ্ঠানের উপর বাঙালিদের আক্রমণ হিসেবে চিত্রিত করার অপচেষ্টার তীব্র নিন্দা জানিয়েছে সংগঠনটি। একই সঙ্গে এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে কোনও ধরনের সাম্প্রদায়িক উসকানি বা বিভ্রান্তিকর প্রচারে পা না দিয়ে জেলার সর্বস্তরের মানুষকে শান্তি, সম্প্রীতি ও ভ্রাতৃত্বের পরিবেশ বজায় রাখার আহ্বান জানানো হয়েছে।গত ২৩ অক্টোবর দুর্গাপ্রতিমা বিসর্জনকে কেন্দ্র করে শ্রীভূমি শহরে দুই দল যুবকের মধ্যে সংঘটিত সংঘর্ষের ঘটনাকে ঘিরে বিভিন্ন মহলে নানা আলোচনা ও প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়েছে।
এই পরিস্থিতিতে অসম ব্রাহ্মণ সমাজের শ্রীভূমি জেলা কমিটির সম্পাদক গীতেশ চক্রবর্তীর স্বাক্ষরিত এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে সংগঠনের অবস্থান স্পষ্ট করা হয়েছে। বিজ্ঞপ্তিতে দাবি করা হয়েছে, ঘটনাটি মূলত কয়েকজন যুবকের ব্যক্তিগত পর্যায়ের সংঘর্ষ, যেখানে উভয় পক্ষের কয়েকজন আহত হন। অথচ এই বিচ্ছিন্ন ঘটনাকে অসমীয়া সংস্কৃতি ও বিহু অনুষ্ঠানের বিরুদ্ধে বাঙালি সমাজের আক্রমণ হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনক।সংগঠনের বক্তব্য, কোনও ঘটনার প্রকৃত প্রেক্ষাপট ও বাস্তবতা যাচাই না করে তাকে ভাষা, জাতি কিংবা সংস্কৃতির সংঘাত হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা সমাজের পক্ষে বিপজ্জনক। এ ধরনের প্রচার শুধু দুই জনগোষ্ঠীর মধ্যে ভুল বোঝাবুঝি বাড়ায় না, বরং দীর্ঘদিনের পারস্পরিক বিশ্বাস ও সম্প্রীতির বন্ধনেও ফাটল ধরাতে পারে। তাই রাজনৈতিক কিংবা সামাজিক স্বার্থে কোনও বিচ্ছিন্ন ঘটনাকে সামগ্রিক জনগোষ্ঠীর সঙ্গে যুক্ত করে দেখানোর প্রবণতা থেকে সকলকে বিরত থাকার আহ্বান জানিয়েছে কমিটি।

প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, শ্রীভূমি তথা সমগ্র অসমের মাটিতে বাঙালি ও অসমিয়া জনগোষ্ঠীর মধ্যে সম্পর্ক দীর্ঘদিনের। পারস্পরিক শ্রদ্ধা, ভালোবাসা, সহযোগিতা এবং সাংস্কৃতিক আদান-প্রদানের মধ্য দিয়ে দুই জনগোষ্ঠী যুগ যুগ ধরে একসঙ্গে বসবাস করে আসছে। অসমিয়া কৃষ্টি-সংস্কৃতি, ঐতিহ্য ও সামাজিক মূল্যবোধের প্রতি বাঙালি সমাজের শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা কোনওভাবেই অস্বীকার করার অবকাশ নেই। এর উদাহরণ তুলে ধরে সংগঠনটি জানিয়েছে, অসমীয়া ঐতিহ্যের প্রতীক মেখেলা-চাদরের প্রতি বাঙালি সমাজের ভালোবাসা, সুধাকণ্ঠ ড. ভূপেন হাজারিকার কালজয়ী সংগীতের প্রতি মানুষের গভীর অনুরাগ এবং প্রয়াত জনপ্রিয় শিল্পী জুবিন গর্গের মৃত্যুতে বরাক উপত্যকার বাঙালি সমাজের শোক ও শ্রদ্ধার বহিঃপ্রকাশ দুই জনগোষ্ঠীর সাংস্কৃতিক আত্মিকতারই পরিচয় বহন করে। নিজস্ব ভাষা, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যকে ভালোবাসার পাশাপাশি অসমিয়া সংস্কৃতিকেও বাঙালি সমাজ আপন করে নিয়েছে। এটাই অসমের বহুত্ববাদী সামাজিক জীবনের অন্যতম সৌন্দর্য বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
বিজ্ঞপ্তিতে আরও বলা হয়েছে, কয়েকজন যুবকের মধ্যে সংঘটিত একটি সংঘর্ষকে বিহু নৃত্য কিংবা অসমিয়া সংস্কৃতির উপর আক্রমণ হিসেবে প্রচার করা বাস্তবতাবিবর্জিত এবং অত্যন্ত নিন্দনীয়। কোনও ব্যক্তির অপরাধ বা অনভিপ্রেত আচরণের দায়ভার কখনও একটি সম্পূর্ণ ভাষিক কিংবা সাংস্কৃতিক জনগোষ্ঠীর উপর চাপিয়ে দেওয়া যায় না। এ ধরনের প্রচার থেকে উভয় জনগোষ্ঠীর মানুষের মধ্যে অযথা উত্তেজনা ও অবিশ্বাসের পরিবেশ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।অসম ব্রাহ্মণ সমাজের শ্রীভূমি জেলা কমিটি প্রশাসনের কাছে ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত সত্য উদ্ঘাটনের দাবি জানিয়েছে। পাশাপাশি জেলার সর্বস্তরের জনগণ, সামাজিক সংগঠন, বুদ্ধিজীবী ও শুভবুদ্ধিসম্পন্ন নাগরিকদের প্রতি সংযম ও দায়িত্বশীলতার পরিচয় দেওয়ার আবেদন জানানো হয়েছে।

সংগঠনের অভিমত, অসমের মাটিতে ভাষা ও সংস্কৃতির বৈচিত্র্যই এখানকার সামাজিক ঐক্যের অন্যতম শক্তি। বাঙালি ও অসমীয়া জনগোষ্ঠীর মধ্যে দীর্ঘদিনের সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক কোনও বিচ্ছিন্ন ঘটনার কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হতে দেওয়া উচিত নয়। বরং পারস্পরিক শ্রদ্ধা, সহনশীলতা ও ভ্রাতৃত্বের বন্ধন আরও সুদৃঢ় করার সময় এসেছে।সবশেষে, অপপ্রচার, গুজব ও উসকানিমূলক বক্তব্য থেকে দূরে থেকে অসমের ঐতিহ্যবাহী সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ও শান্তির পরিবেশ অক্ষুণ্ণ রাখতে সকলের সম্মিলিত সহযোগিতা কামনা করেছে অসম ব্রাহ্মণ সমাজের শ্রীভূমি জেলা কমিটি।



