বিহু নৃত্যশিল্পীদের ওপর হামলার নিন্দা, বরাক-ব্রহ্মপুত্রের সম্প্রীতি রক্ষার আহ্বান সচেতন নাগরিক সমাজের

Spread the news

মোহাম্মদ জনি, শ্রীভূমি।
বরাক তরঙ্গ, ২৭ অক্টোবর : দুর্গাপ্রতিমা বিসর্জন অনুষ্ঠানে যোগ দিতে আসা বিহু নৃত্যশিল্পীদের ওপর হামলার ঘটনায় তীব্র নিন্দা ও ধিক্কার জানিয়েছেন বরাক উপত্যকার সচেতন নাগরিক সমাজ। একই সঙ্গে এই বিচ্ছিন্ন ঘটনাকে কেন্দ্র করে অপপ্রচার চালিয়ে বরাক ও ব্রহ্মপুত্র উপত্যকার দীর্ঘদিনের সামাজিক সম্প্রীতি নষ্ট করার অপচেষ্টা থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানিয়েছেন তাঁরা।

সম্প্রতি শ্রীভূমি শহরের হিন্দুস্তান ক্লাবের আমন্ত্রণে দুর্গাপ্রতিমা বিসর্জন অনুষ্ঠানে অংশ নিতে এসেছিল বদরপুরের নিকটবর্তী একটি গ্রামের বিহু নৃত্যশিল্পীদের দল। অভিযোগ, অনুষ্ঠানে যোগ দিতে আসা শিল্পীদের ওপর কতিপয় দুষ্কৃতী অতর্কিতে হামলা চালায়। এই অনভিপ্রেত ঘটনার প্রতিবাদে শ্রীভূমির বিশিষ্ট নাগরিকরা এক যৌথ বিবৃতিতে ঘটনার তীব্র নিন্দা জানান।

বিবৃতিতে তাঁরা বলেন, এই ঘটনা অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনক এবং সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন। এর সঙ্গে বরাক উপত্যকার সাধারণ শান্তিপ্রিয় মানুষের মনোভাবের কোনও সম্পর্ক নেই। বরাকের ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি বরাবরই পারস্পরিক শ্রদ্ধা, সহাবস্থান ও সমন্বয়ের আদর্শে সমৃদ্ধ।

নাগরিকদের বক্তব্য, বিহু সংস্কৃতির প্রতি কোনও বিদ্বেষ থাকলে হিন্দুস্তান ক্লাবের পক্ষ থেকে বিহু নৃত্যশিল্পীদের আমন্ত্রণ জানানো হতো না। বরং শ্রীভূমির মানুষ অত্যন্ত আনন্দ ও উৎসাহের সঙ্গে বিহু নৃত্য উপভোগ করেছিলেন। কিন্তু পরবর্তী সময়ে যেভাবে শিল্পীদের ওপর হামলার ঘটনা ঘটেছে, তা সম্পূর্ণ অনভিপ্রেত এবং বরাক উপত্যকার উদার ও সম্প্রীতির ঐতিহ্যকে কলঙ্কিত করেছে।

বিবৃতিতে আরও অভিযোগ করা হয়, এই বিচ্ছিন্ন ঘটনাকে কেন্দ্র করে কিছু সংবাদমাধ্যম এবং উগ্র প্রাদেশিকতাবাদী সংগঠন উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে অপপ্রচার চালাচ্ছে। এর মাধ্যমে বরাক ও ব্রহ্মপুত্র উপত্যকার মানুষের মধ্যে দীর্ঘদিনের সামাজিক সৌহার্দ্য ও সম্প্রীতি নষ্ট করার চেষ্টা করা হচ্ছে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেন তাঁরা।

বরাক উপত্যকার সঙ্গে অসমের বৃহত্তর সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের নিবিড় সম্পর্কের কথা উল্লেখ করে নাগরিক সমাজ জানায়, সদ্যপ্রয়াত প্রখ্যাত শিল্পী জুবিন গার্গের সংগীতজীবনের হাতেখড়ি হয়েছিল করিমগঞ্জে। এই অঞ্চলের মানুষের কাছ থেকে পাওয়া ভালোবাসা ও সম্মানের কথা তিনি বিভিন্ন সময়ে উল্লেখ করেছেন। একইভাবে সুধাকণ্ঠ ড. ভূপেন হাজারিকাও বরাক উপত্যকায় অত্যন্ত জনপ্রিয় ও শ্রদ্ধেয়। জ্যোতিপ্রসাদ আগরওয়ালা এবং শহিদ কনকলতার জন্মশতবার্ষিকীও শ্রীভূমি জেলা-সহ গোটা বরাক উপত্যকায় যথাযোগ্য মর্যাদায় পালিত হয়েছে।

তাঁদের মতে, কয়েকজন সমাজবিরোধী ও দুষ্কৃতীর আচরণের জন্য করিমগঞ্জের সাধারণ মানুষের মনোভাবকে বিচার করা কোনওভাবেই সমীচীন নয়। বরং ঘটনার নিরপেক্ষ মূল্যায়ন করে প্রকৃত দোষীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করা জরুরি।

এই ঘটনার পূর্ণাঙ্গ, নিরপেক্ষ ও পুঙ্খানুপুঙ্খ তদন্তের জন্য প্রশাসনের কাছে জোরালো দাবি জানিয়েছেন বিবৃতিদাতারা। পাশাপাশি, হামলার সঙ্গে জড়িত মূল অভিযুক্তদের চিহ্নিত করে দ্রুত গ্রেফতার এবং দৃষ্টান্তমূলক শাস্তিরও দাবি তুলেছেন তাঁরা।
বিবৃতির শেষে কোনও ধরনের উস্কানিমূলক বক্তব্য বা অপপ্রচারে প্রভাবিত না হয়ে বরাক ও ব্রহ্মপুত্র—উভয় উপত্যকার শান্তি, সম্প্রীতি ও ভ্রাতৃত্বের বন্ধন অটুট রাখার জন্য অসমের সর্বস্তরের মানুষের প্রতি আবেদন জানানো হয়।

বিবৃতিদাতারা হলেন: প্রবীণ সমাজকর্মী সতু রায়, অবসরপ্রাপ্ত অধ্যক্ষা মন্দিরা নন্দী, অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক সুনীত রঞ্জন দত্ত, অবসরপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ রাধিকা রঞ্জন চক্রবর্তী, বিশিষ্ট নাগরিক সুবীর রায় চৌধুরী, সমাজকর্মী চন্দন চক্রবর্তী, অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক গৌতম চৌধুরী, প্রবীণ আইনজীবী আব্দুর রশিদ চৌধুরী, আইনজীবী সুব্রত কুমার পাল, জ্যোতিষ পুরকায়স্থ ও অরুণাংশু ভট্টাচার্য, সমাজকর্মী তুষার দাস, অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক নির্মল কুমার সরকার, অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপিকা মনোলীনা নন্দী, অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক সুবীর বরণ রায়, অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষিকা সুদীপ্তা দে চৌধুরী, বিশিষ্ট নাগরিক বদরুল হক চৌধুরী, নাট্যকর্মী পৃথ্বীজিৎ দেব, অবসরপ্রাপ্ত নাট্যকর্মী মনোজ দেব, নাট্যকর্মী অমিতাভ চৌধুরী, আইনজীবী নন্দন কুমার নাথ, বিশিষ্ট নাগরিক বিশ্বতোষ পাল, সমাজকর্মী সামসুল বারী চৌধুরী এবং বিশিষ্ট সংগীতশিল্পী অনসূয়া মজুমদার।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *