আলোর উৎসবে অন্ধকারে যারা, তাদেরও কি পুজো হয়?

Spread the news

-: আমার চোখে দুর্গাপূজা :-

।। উত্তমকুমার সী ।।
(নিউজ এডিটর, দৈনিক সাময়িক প্রসঙ্গ)

১৯ অক্টোবর : দুর্গাপূজা মানেই বাঙালির আনন্দ, উচ্ছ্বাস আর মিলনোৎসব। নতুন পোশাক, আলোকসজ্জা, প্যান্ডেলে প্যান্ডেলে ঘোরা, বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা— সব মিলিয়ে উৎসবের রং ছড়িয়ে পড়ে চারদিকে। কিন্তু এই আনন্দের আড়ালেও থেকে যায় অন্য এক পৃথিবী, যেখানে পুজো আসে ঠিকই, অথচ আনন্দের আলো পৌঁছয় না সবার জীবনে।

ফুটপাতের এক কোণে বসে থাকা ক্ষুধার্ত শিশুটি জানে না, পুজোর নতুন জামা কাকে বলে। গৃহহীন বৃদ্ধটির কাছে উৎসবের সবচেয়ে বড় চিন্তা, রাতে মাথা গোঁজার ঠাঁই মিলবে তো? ভিক্ষা করে দিন কাটানো মানুষটির কাছে আলোকসজ্জার চেয়ে জরুরি একবেলার খাবার। শহর যখন রেস্তোরাঁ আর মণ্ডপের ভিড়ে মুখর, তখনও কারও কাছে জীবন মানে শুধুই বেঁচে থাকার লড়াই। অন্যের হাতে যখন নতুন পোশাক, তখন কারও চোখে জমে থাকে নিজের সন্তানের ইচ্ছা পূরণ করতে না-পারার অসহায়তা। উৎসবের ভিড়ে আমরা আনন্দ দেখি, কিন্তু সেই আনন্দের বাইরে পড়ে থাকা মানুষগুলিকে কতটা দেখি?
আবার এমন অনেক মানুষ আছেন, যাঁদের নিজের ইচ্ছায় নয়, কর্তব্যের টানে পুজোর দিনগুলিও কাটে কর্মব্যস্ততায়। ট্রাফিক পুলিশ রাস্তায় দাঁড়িয়ে যানজট সামলান, চিকিৎসক ও নার্স হাসপাতালের শয্যায় অসুস্থ মানুষের সেবা করেন, দমকলকর্মী ও বিদ্যুৎকর্মীরা প্রস্তুত থাকেন বিপদের মোকাবিলায়। পরিচ্ছন্নতাকর্মীরা ভোরের আলো ফোটার আগেই নেমে পড়েন রাস্তা পরিষ্কার করতে। অন্যরা যখন পরিবারের সঙ্গে আনন্দে মেতে ওঠেন, তখন এই মানুষগুলির অনেকেই ভুলে থাকেন নিজের উৎসব, পিছিয়ে দেন পরিবারের সঙ্গে কাটানোর মুহূর্ত। অথচ তাঁদের নিরলস পরিশ্রমেই আমাদের উৎসব নিরাপদ, পরিচ্ছন্ন ও সুন্দর হয়ে ওঠে।

উৎসবের খবর মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে সাংবাদিকদেরও ছুটতে হয় সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত। কোথাও প্রতিমা দর্শন, কোথাও মানুষের ভিড়, কোথাও দুর্ঘটনা কিংবা প্রশাসনিক প্রস্তুতি— সব খবরের পিছনে থাকে সময়ের সঙ্গে পাল্লা দেওয়ার চাপ। পরিবারের সঙ্গে অষ্টমীর অঞ্জলি কিংবা নবমীর সন্ধ্যায় একটু সময় কাটানোর পরিকল্পনাও ভেস্তে যায় একটি জরুরি খবরের কারণে। ফটোগ্রাফাররা ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করেন একটি নিখুঁত মুহূর্তের জন্য— প্রতিমার চোখ, ধুনুচি নাচ, ঢাকির ছন্দ কিংবা বিসর্জনের আবেগ। মানুষ তাঁদের তোলা ছবি দেখে উৎসবের সৌন্দর্য উপভোগ করেন, কিন্তু ছবির পিছনে থাকা ক্লান্ত মানুষটির কথা কতজন ভাবেন? অন্যের আনন্দকে যাঁরা সবার সামনে তুলে ধরেন, তাঁদের নিজেদের আনন্দও অনেক সময় ক্যামেরার ফ্রেমের বাইরেই থেকে যায়।

একই ছবি ঢাকি, প্রতিমাশিল্পী, মণ্ডপসজ্জার কারিগর, আলোকশিল্পী ও অসংখ্য শ্রমজীবী মানুষের। তাঁদের ঘাম, শ্রম আর দীর্ঘ কর্মঘণ্টায় তৈরি হয় আমাদের উৎসবের রূপ। ঢাকের তালে আমরা আনন্দে মেতে উঠি, অথচ সেই ঢাকির মনে হয়তো তখন ঘুরছে দূরে ফেলে আসা পরিবারটির কথা। উপার্জনের আশায় যাঁরা বাড়ি ছেড়ে আসেন, তাঁদের কাছে পুজো আনন্দের পাশাপাশি সংসার চালানোর লড়াইও। উৎসব শেষ হলে আবার ফিরে যেতে হয় অনিশ্চিত জীবনের পথে।

তবে সব কষ্টের কারণ অভাব কিংবা কাজের চাপ নয়। কারও কাছে এবারের পুজো প্রিয়জনকে হারানোর পর প্রথম উৎসব, কেউ হাসপাতালের বিছানায় অসুস্থ স্বজনের পাশে, কেউ দূর শহরে কাজের কারণে পরিবারের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন। চারদিকে যখন হাসি আর উচ্ছ্বাস, তখন কারও একাকিত্ব আরও গভীর হয়ে ওঠে। যে মানুষটি গত বছর প্রিয়জনের হাত ধরে ঠাকুর দেখতে বেরিয়েছিলেন, এ বছর হয়তো তাঁর পাশে সেই মানুষটি নেই। তাই কারও মুখে হাসি না দেখেই তাঁর জীবনের গল্প বিচার করা যায় না। অনেক সময় একটি আন্তরিক কথা, একটু মন দিয়ে শোনা কিংবা নীরবে পাশে দাঁড়ানোই হয়ে ওঠে সবচেয়ে বড় সান্ত্বনা।

দুর্গাপূজা শুধু প্রতিমা দর্শন, কেনাকাটা কিংবা আলোকসজ্জার উৎসব নয়, এটি শক্তি, মমতা ও শুভের জয়ের বার্তা। সেই আরাধনা তখনই অর্থবহ হয়ে ওঠে, যখন আমরা নিজেদের আনন্দের পাশাপাশি অন্যের কষ্টও অনুভব করি। সামর্থ্য অনুযায়ী অভাবী মানুষের হাতে খাবার তুলে দেওয়া, কোনও শিশুর মুখে হাসি ফোটানো, অসহায় পরিবারের পাশে দাঁড়ানো কিংবা উৎসবের পরিশ্রমী মানুষগুলির শ্রম ও অধিকারকে সম্মান জানানো— এমন ছোট ছোট উদ্যোগেই উৎসব আরও মানবিক হয়ে উঠতে পারে। সাহায্য যেন লোকদেখানো দয়া না হয়, কারও অসহায়তা যেন প্রচারের উপকরণ না হয়ে ওঠে। মানুষের পাশে দাঁড়ানোর সময় তাঁর আত্মসম্মানটুকু রক্ষা করাই প্রকৃত মানবিকতা।

আসলে, পুজোর আলো কতটা উজ্জ্বল, তার চেয়েও বড় প্রশ্ন— সেই আলো কত দূর পৌঁছল? যে উৎসবে আমরা নিজেদের আনন্দে ভাসি, অথচ পাশের মানুষটির ক্ষুধা, ক্লান্তি কিংবা নিঃসঙ্গতা দেখতে পাই না, সেই উৎসব কি সত্যিই পূর্ণতা পায়?

মা দুর্গার কাছে প্রার্থনা, আলো শুধু মণ্ডপে নয়, পৌঁছাক মানুষের জীবনেও। হাসি ফিরুক সেই শিশুর মুখে, যার নতুন জামা কেনার সামর্থ্য নেই। স্বস্তি আসুক সেই শ্রমিকের জীবনে, যিনি অন্যের আনন্দের জন্য নিজের উৎসব বিসর্জন দেন। আর একটু শান্তি মিলুক সেই মানুষটির মনে, যিনি ভিড়ের মাঝেও একা। কারণ, দুর্গাপূজার সবচেয়ে বড় সার্থকতা সবচেয়ে সুন্দর মণ্ডপে নয়, সবচেয়ে উজ্জ্বল আলোকসজ্জাতেও নয়, বরং অন্যের অন্ধকারে একটু আলো হয়ে দাঁড়ানোর মধ্যে। এ তো আমার অভিব্যক্তি, আপনার মতামত জানান কমেন্টে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *