পুজো এলেই ফিরে দেখি শৈশব-কৈশোরের দিনগুলি

Spread the news

-: আমার চোখে দুর্গাপূজা :-


।। অনিন্দ্য ভট্টাচার্য ।।
(সাংবাদিক, বদরপুর)
১৮ অক্টোবর : পুজো এলেই মনটা নস্টালজিয়ায় আচ্ছন্ন হয়ে পড়ে। ফিরে যেতে ইচ্ছে করে শৈশব-কৈশোরের সেই দিনগুলিতে, যখন দুর্গাপুজো মানেই ছিল শিউলির সুবাস, কাশবনের দোলা আর একরাশ অনাবিল আনন্দ। আমি যে প্রজন্মের মানুষ, সেই প্রজন্মের কাছে দুর্গাপুজো কেবল একটি ধর্মীয় উৎসব ছিল না; ছিল আবেগ, ভালোবাসা, মিলন আর অপেক্ষার এক অনন্য অধ্যায়।
আমাদের বাড়ি ছিল শিলচরের বিবেকানন্দ রোডে। পড়তাম বিশ্বেশ্বর পাঠশালায়। পাড়ার প্যান্ডেলে যেদিন কারিগর এসে বাঁশ বাঁধতেন, প্রতিমা নির্মাণের কাজ শুরু হতো, সেদিন থেকেই যেন আমাদের পুজো শুরু হয়ে যেত। পাঠশালা থেকে ফিরে কোনওরকমে দুটো ভাত মুখে গুঁজেই একছুটে পৌঁছে যেতাম প্রতিমা তৈরির জায়গায়। সেখানে বন্ধুদের সঙ্গে দল বেঁধে দাঁড়িয়ে হা করে দেখতাম, কী নিপুণ দক্ষতায় শিল্পীর হাতের ছোঁয়ায় ধীরে ধীরে মৃন্ময়ী প্রতিমা প্রাণ পেতে শুরু করছে। রাস্তার আলো জ্বলে ওঠা পর্যন্ত সেখান থেকে নড়ার নাম থাকত না। ততদিনে শিউলি গাছেও ফুল আসতে শুরু করেছে। ভোরবেলা শিউলি কুড়োনোর ধুম পড়ে যেত। তার সঙ্গে পদ্মফুলের আয়োজন তো ছিলই। মহালয়ার ভোরে রেডিওতে বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের উদাত্ত কণ্ঠে চণ্ডীপাঠ শুনে ঘুম ভাঙত। তখন প্রায় প্রতিটি বাড়িতেই রেডিও ছিল। মহালয়ার সকালে ছোট-বড় সবাই রাস্তায় বেরিয়ে পড়তাম। আমাদের মতো ছোটদের কাছে সেদিন থেকেই পুজোর আনন্দের সূচনা। স্কুলেও শুরু হয়ে যেত পুজোর ছুটি। আর আমাদের পায় কে! সকাল, দুপুর, বিকেল—নিয়ম করে প্রতিমা তৈরির জায়গায় হাজির হতাম।

ততদিনে প্রতিমায় রঙের প্রলেপ পড়তে শুরু করেছে। কোন পাড়ার সিংহ সবচেয়ে বড়, কার অসুরের পেশি বেশি মজবুত—এসব নিয়ে বন্ধুদের সঙ্গে চলত গুরুগম্ভীর আলোচনা। আমাদের কাছে সেসবও ছিল এক বিরাট প্রতিযোগিতার বিষয়।

নতুন জামাকাপড় আর জুতো আসার দিনটি ছিল আনন্দের আরেক নাম। নতুন পোশাকের গন্ধ বারবার শুঁকতাম, সুযোগ পেলেই খুলে দেখতাম। সেই আনন্দের সঙ্গে আজকের দিনের আনন্দের তুলনা চলে না। তখন অল্পতেই মন ভরে যেত, ছোট ছোট প্রাপ্তিই হয়ে উঠত জীবনের বড় সম্পদ।

আমাদের বাড়িতে ঘট বসিয়ে দুর্গাপুজো হতো। ফলে সপ্তমী, অষ্টমী ও নবমীর সকালে বাড়ির বড়দের নানা ফরমায়েশ মেটাতে হতো আমাদের। পঞ্চপল্লব, ফুল-ফল-সহ পুজোর নানা উপকরণ জোগাড় করার দায়িত্বও অনেকটা আমাদের ছোটদের কাঁধেই থাকত। বাঁধা পুরোহিত ষষ্ঠীর দিনই বাড়িতে চলে আসতেন। দশমী পর্যন্ত থাকতেন আমাদের সঙ্গেই। ষষ্ঠীর সন্ধ্যায় বাড়ির উঠোনে বোধনের মধ্য দিয়ে শুরু হতো মাতৃআরাধনা।

আমাদের ছিল যৌথ পরিবার। ঠাকুমা, মা, কাকিমা—সবাই পুজোর কটা দিন অসম্ভব ব্যস্ত থাকতেন। বাবা অরুণাচল প্রদেশ থেকে এবং ছোট কাকা শিলং থেকে পুজোর ছুটিতে বাড়ি ফিরতেন। বাড়িতে পুজো হওয়ার কারণে বড়দের সারাদিনই কাটত নানা কাজে। মা-কাকিমাদের পুজোর মণ্ডপে যাওয়ার সুযোগ হতো খুব কম। একমাত্র নবমীর সন্ধ্যায় তাঁদের পাড়ার ঠাকুর দেখতে বেরোতে দেখেছি। তার আগে যেন তাঁদের ফুরসতই মিলত না।

আমরা অবশ্য বাড়িতে অঞ্জলি দিয়েই ছুটতাম প্যান্ডেলে। সেখানে কিছুক্ষণ কাটিয়ে বন্ধুদের সঙ্গে পাশের মিশন রোডের পুজো দেখে বাড়ি ফিরতাম। তখন আজকের মতো পুজো হপিংয়ের এত চল ছিল না। পুজোর আনন্দ ছিল অনেক বেশি ঘরোয়া, আন্তরিক আর আপনজনকেন্দ্রিক।

বিবেকানন্দ রোড ও মিশন রোডে পুজোর তিন দিন জলসা, নাটকসহ নানা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হতো। তবে আমাদের কাছে সবচেয়ে বড় আকর্ষণ ছিল দশমীর পর থেকে শুরু হওয়া যাত্রাপালা। দুই পাড়া মিলিয়ে প্রায় ছয়-সাত দিন ধরে চলত এই আনন্দযজ্ঞ।

যাত্রাপালাকে কেন্দ্র করে বসত ঘুঘনি, পকোড়া আর ছোলাভাজার অসংখ্য দোকান। বড়দের কাছে দশ-বিশ পয়সা চেয়ে নিয়ে সেসব খাওয়ার আনন্দই ছিল আলাদা। তারপর মগ্ন হয়ে যাত্রাপালা দেখা। ছোটদের জন্য বসার জায়গা জুটত না বললেই চলে। তাই সারা রাত দাঁড়িয়েই যাত্রা দেখতাম। তবু ক্লান্তি ছিল না, বিরক্তি ছিল না। ছিল শুধু অফুরন্ত আনন্দ আর পরদিন বন্ধুদের সঙ্গে সেই অভিজ্ঞতা নিয়ে আলোচনার অপেক্ষা।

সময়ের সঙ্গে সঙ্গে অনেক কিছুই বদলে গেছে। পুজোর আয়োজন বেড়েছে, জাঁকজমক বেড়েছে, এসেছে থিমের পুজো, ডিজে আর চোখধাঁধানো আলোর রোশনাই। কিন্তু আমাদের শৈশবের পুজোয় এসবের কোনও বালাই ছিল না। ছিল না এত বাহুল্য, এত প্রতিযোগিতা। অথচ প্রাণের কোনও অভাব ছিল না। বরং পুজো ছিল আক্ষরিক অর্থেই এক সামাজিক উৎসব, যেখানে মানুষের সঙ্গে মানুষের যোগাযোগ নিবিড় হতো, পুরোনো পরিচয় নতুন করে উজ্জ্বল হয়ে উঠত।

পুজোর কটা দিনে কত মানুষের সঙ্গে দেখা হতো, কত গল্প জমত, কত সম্পর্কের বন্ধন আরও দৃঢ় হতো! অষ্টমীর অঞ্জলির পর খিচুড়ি-ল্যাবড়ার ভোগ খাওয়ার সেই স্বাদ আজও ভুলতে পারিনি। মনে হয়, সেই ভোগের স্বাদে মিশে থাকত পুজোর পবিত্রতা, পারিবারিক উষ্ণতা আর একসঙ্গে থাকার আনন্দ। পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে দীর্ঘ আড্ডা, পুরোনো বন্ধুদের সঙ্গে দেখা হওয়া, হাসি-ঠাট্টা—সব মিলিয়ে দিনগুলো হয়ে উঠত আরও মধুর, আরও স্মরণীয়।

আজ কর্মসূত্রে শিলচর থেকে কিছুটা দূরে রেলশহর বদরপুরে থাকি। এখানেও দুর্গাপুজো হয়, উৎসবের আনন্দে মেতে ওঠেন মানুষ। তবু কয়েক বছর ধরে পুজোর তিন দিনের যেকোনও একদিন আমি শহরের বাইরে কোনও একটি গ্রামে চলে যাই। সেখানকার সাদামাটা, জাঁকজমকহীন পুজোয় সামিল হই। সেই পুজোর সরলতা, মানুষের আন্তরিকতা আর উৎসবের স্বাভাবিক আবহের মধ্যে খুঁজে বেড়াই আমার ফেলে আসা শৈশব ও কৈশোরকে।

আসলে সময় বদলায়, বদলে যায় উৎসবের ধরনও। কিন্তু মনের গভীরে জমে থাকা স্মৃতিগুলো কখনও পুরোনো হয় না। শিউলির গন্ধ, কাশবনের দোলা, প্রতিমা তৈরির সেই ব্যাকুল অপেক্ষা, নতুন জামার গন্ধ, বন্ধুদের সঙ্গে প্যান্ডেলে ঘুরে বেড়ানো কিংবা সারা রাত দাঁড়িয়ে যাত্রাপালা দেখা—সবই আজও আমার মনের মণিকোঠায় অমলিন।
তাই পুজো এলেই আমি শুধু বর্তমানের উৎসবে সামিল হই না; ফিরে যাই সেই চেনা সময়ে, সেই চেনা মানুষগুলোর কাছে। আর গ্রামবাংলার কোনও এক সাধারণ পুজোমণ্ডপে দাঁড়িয়ে নীরবে খুঁজে ফিরি আমার হারিয়ে যাওয়া দিনগুলোকে। কারণ আমার কাছে দুর্গাপুজো আজও শুধু দেবী আরাধনা নয়, আমার শৈশব-কৈশোরের কাছে ফিরে যাওয়ার এক অমোঘ উপলক্ষ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *