রিলসের যুগে হারিয়ে যাচ্ছে পুজোয় প্রাচীন যাত্রাপালা

Spread the news

।। এসএম জাহির আব্বাস ।।
(সাংবাদিক)
৯ অক্টোবর : একসময় দুর্গাপুজোর রাত মানেই ছিল যাত্রাপালার উন্মাদনা। মণ্ডপে মায়ের আরতি শেষ হতেই গ্রামের মাঠে জ্বলে উঠত আলো। দূর থেকে ভেসে আসত মাইকের ঘোষণা—শুরু হচ্ছে আকর্ষণীয় যাত্রাপালা। সেই ঘোষণায় মুহূর্তের মধ্যেই বদলে যেত গোটা গ্রামের পরিবেশ। শিশু থেকে বৃদ্ধ, আট থেকে আশি—সব বয়সের মানুষ ছুটে আসতেন যাত্রামঞ্চের দিকে। কেউ চাদর পেতে বসতেন, কেউ সন্তানদের হাত ধরে রাতভর উপভোগ করতেন অভিনয়, গান আর সংলাপ। কিন্তু সময়ের সঙ্গে বদলে গিয়েছে বিনোদনের ধরন। স্মার্টফোনের ছোট্ট পর্দায় কয়েক সেকেন্ডের রিলসের দাপটে ক্রমশ হারিয়ে যাচ্ছে বাংলার ঐতিহ্যবাহী লোকনাট্য যাত্রাপালা।

শ্রীভূমির প্রান্তিক শহর থেকে অল্প দূরেই দোহালিয়া পাহাড়। তার পাশেই অবস্থিত ৫ নম্বর দোহালিয়ার ঐতিহ্যবাহী দুর্গাবাড়ি। চলতি বছর ৭৬তম বর্ষে পদার্পণ করেছে এই প্রাচীন দুর্গাপুজো। একসময় এই পুজোর অন্যতম প্রধান আকর্ষণ ছিল যাত্রাপালা। পুজোর কয়েক সপ্তাহ আগে থেকেই শুরু হয়ে যেত মহড়া। মহালয়ার আগের দিন থেকে দুর্গাবাড়ির মণ্ডপ যেন পরিণত হতো এক সাংস্কৃতিক কর্মশালায়।

সন্ধ্যা নামলেই হাজির হতেন এলাকার শিল্পীরা। কেউ কৃষক, কেউ শিক্ষক, কেউ দোকানদার, আবার কেউ অন্য পেশার সঙ্গে যুক্ত। দিনের কাজ সেরে রাতভর চলত সংলাপের মহড়া। কারও হাতে থাকত নাটকের পাণ্ডুলিপি, কেউ সংলাপ মুখস্থ করতেন, কেউ ব্যস্ত থাকতেন মঞ্চসজ্জা নিয়ে। তখন সর্বত্র বিদ্যুতের আলো পৌঁছায়নি। মোমবাতি, হারিকেন কিংবা কেরোসিনের আলোয় চলত মহড়া। আধুনিক সাউন্ড সিস্টেম ছিল না, ছিল না ডিজিটাল প্রচারের ব্যবস্থা। তবু শিল্পের প্রতি ভালোবাসা আর মানুষের উৎসাহে সেই সীমাবদ্ধতা কখনও বাধা হয়ে দাঁড়ায়নি।

দোহালিয়ার যাত্রার বিশেষত্ব ছিল স্থানীয় প্রতিভার বিকাশ। কলকাতা কিংবা শিলচর থেকে শিল্পী এনে মঞ্চ সাজানোর পাশাপাশি এলাকার সাধারণ মানুষের মধ্যেও লুকিয়ে থাকা অভিনয়প্রতিভাকে তুলে ধরার সুযোগ তৈরি হতো। কৃষক মঞ্চে অভিনয় করতেন রাজার ভূমিকায়, শিক্ষক হয়ে উঠতেন পৌরাণিক চরিত্র, দোকানদার অভিনয় করতেন খলনায়কের ভূমিকায়। দর্শকেরাও তাঁদের পরিচিত মানুষদের নতুন রূপে দেখে আনন্দ পেতেন। এভাবেই যাত্রাপালা হয়ে উঠেছিল গোটা এলাকার সম্মিলিত সাংস্কৃতিক উৎসব।

পাথারকান্দির শিল্প ও সংস্কৃতিমনা বিশিষ্ট ব্যক্তি সিদ্ধার্থ শেখর পাল চৌধুরী আজও বয়ে বেড়াচ্ছেন সেই সোনালি দিনের স্মৃতি। যাত্রাশিল্পের ক্রমশ হারিয়ে যাওয়া নিয়ে তাঁর কণ্ঠে স্পষ্ট আক্ষেপ। সংবাদমাধ্যমের সঙ্গে আলাপচারিতায় তিনি জানান, ষাট ও সত্তরের দশকেও পাথারকান্দিতে ‘তরুণ শিল্পী সংঘ’ নামে একটি ভালো অপেশাদার যাত্রাদল ছিল। স্থানীয় প্রতিভাবান শিল্পীদের নিয়ে গড়ে ওঠা এই দলের বিভিন্ন যাত্রাপালার নির্দেশনার দায়িত্বে ছিলেন প্রয়াত অভিনেতা লক্ষণ মিশ্র।

তাঁর স্মৃতিচারণে উঠে আসে দোহালিয়া দুর্গাবাড়ির যাত্রাকে ঘিরে সেই সময়ের উত্তেজনার কথা। মহালয়ার আগের দিন থেকেই মণ্ডপে শুরু হয়ে যেত মহড়া। সন্ধ্যার পর শিল্পীরা একে একে হাজির হতেন। রাত যত গভীর হতো, ততই বাড়ত ব্যস্ততা। তখন যাত্রা ছিল নিছক বিনোদন নয়, বরং এলাকার মানুষের মিলনমেলা এবং সাংস্কৃতিক পরিচয়ের অন্যতম অংশ।

সেই সময় বিভিন্ন পুজো কমিটির মধ্যেও ভালো যাত্রাপালা আয়োজনের প্রতিযোগিতা চলত। কোন কমিটি ভালো যাত্রাদল আনবে, কোথায় আকর্ষণীয় পালা মঞ্চস্থ হবে—তা নিয়ে মানুষের মধ্যে আগ্রহ ছিল প্রবল। পেশাদার যাত্রাদলের পাশাপাশি স্থানীয় শিল্পীদের নিয়ে গড়ে ওঠা দলগুলিও সমান জনপ্রিয়তা অর্জন করত।

দোহালিয়ার যাত্রার বিশেষত্ব ছিল স্থানীয় প্রতিভার বিকাশ। কলকাতা কিংবা শিলচর থেকে শিল্পী এনে মঞ্চ সাজানোর পাশাপাশি এলাকার সাধারণ মানুষের মধ্যেও লুকিয়ে থাকা অভিনয়প্রতিভাকে তুলে ধরার সুযোগ তৈরি হতো। কৃষক মঞ্চে অভিনয় করতেন রাজার ভূমিকায়, শিক্ষক হয়ে উঠতেন পৌরাণিক চরিত্র, দোকানদার অভিনয় করতেন খলনায়কের ভূমিকায়। দর্শকেরাও তাঁদের পরিচিত মানুষদের নতুন রূপে দেখে আনন্দ পেতেন। এভাবেই যাত্রাপালা হয়ে উঠেছিল গোটা এলাকার সম্মিলিত সাংস্কৃতিক উৎসব।

যাত্রার বিষয়বস্তুও ছিল বৈচিত্র্যে ভরা। কখনও রামায়ণ-মহাভারতের পৌরাণিক কাহিনি, কখনও ইতিহাস, আবার কখনও সমাজের নানা অসংগতি ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ উঠে আসত মঞ্চে। হাস্যরসের দৃশ্যে দর্শকেরা হেসে উঠতেন, করুণ মুহূর্তে অনেকের চোখ ভিজে যেত। সংলাপ ও অভিনয়ের মধ্য দিয়ে মানুষের সামনে তুলে ধরা হতো কুসংস্কার, সামাজিক অবিচার এবং জীবনসংগ্রামের নানা দিক। সাধারণ মানুষের কাছে যাত্রা ছিল বিনোদনের পাশাপাশি শিক্ষা ও সচেতনতারও একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম।

কিন্তু আজ সেই চেনা ছবিতে এসেছে বড়সড় পরিবর্তন। যে মাঠে একসময় রাতভর দর্শকের ভিড় জমত, সেখানে পুজোর রাতে এখন অনেক ক্ষেত্রেই শোনা যায় ডিজে বক্সের তীব্র শব্দ। দর্শকের হাতে মোবাইল ফোন। রিলস, শর্টস এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের দ্রুত বিনোদনের সঙ্গে পাল্লা দিতে গিয়ে তিন-চার ঘণ্টার একটি যাত্রাপালা ক্রমশ পিছিয়ে পড়ছে। সিদ্ধার্থ শেখর পাল চৌধুরীর মতে, এই সংকটের জন্য শুধু মুঠোফোনকে দায়ী করলে চলবে না। বদলে গিয়েছে পুজো কমিটিগুলোর মানসিকতাও। বর্তমানে পুজো মানেই বড় বাজেটের থিম, ঝলমলে আলোকসজ্জা, ডিজে এবং আধুনিক আয়োজন। সেই জাঁকজমকের মধ্যে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের তালিকায় যাত্রা ও থিয়েটারের জায়গা ক্রমশ সংকুচিত হচ্ছে। এমনকি বিজয়া দশমীর পর আয়োজিত বিজয়া সম্মেলনেও অনেক ক্ষেত্রে যাত্রা ও থিয়েটারের শিল্পী-কলাকুশলীদের আগের মতো আমন্ত্রণ জানানো হয় না বলে তাঁর আক্ষেপ। এর ফলে নতুন প্রজন্মের সঙ্গে এই শিল্পের যোগাযোগও দুর্বল হয়ে পড়ছে।

অন্যদিকে, পুজো কমিটির একাংশের যুক্তি, বর্তমানে যাত্রা বা থিয়েটারের অনুষ্ঠানে আগের মতো দর্শক পাওয়া যায় না। দীর্ঘ সময় ধরে বসে নাটক দেখার আগ্রহ কমেছে। অনেকেই এখন মোবাইল ফোন এবং ডিজিটাল বিনোদনে বেশি অভ্যস্ত। দর্শকের এই পরিবর্তিত রুচির কারণে যাত্রাপালা আয়োজন করাও পুজো কমিটিগুলোর কাছে কঠিন হয়ে উঠছে।

এই দুই বাস্তবতার মাঝখানেই যেন আটকে পড়েছে বাংলার ঐতিহ্যবাহী এই শিল্প। একসময় পাথারকান্দিতে এমন বহু মানুষ ছিলেন, যাঁরা পেশাদার শিল্পী না হয়েও ভালোবাসা ও নেশার টানে যাত্রায় অভিনয় করতেন। তাঁদের কাছে যাত্রা অর্থ উপার্জনের মাধ্যম ছিল না; বরং ছিল আত্মপ্রকাশের জায়গা, মানুষের ভালোবাসা পাওয়ার সুযোগ। সময়ের নিয়মে সেই শিল্পীদের অনেকেই আজ আর বেঁচে নেই। কিন্তু প্রবীণদের স্মৃতিতে আজও রয়ে গিয়েছে তাঁদের কণ্ঠের সংলাপ, মঞ্চের অভিনয় আর দর্শকের করতালি।

যাত্রাপালা কেবল কয়েক ঘণ্টার অভিনয় নয়; এটি মানুষের সঙ্গে মানুষের সংযোগ, স্থানীয় সংস্কৃতির প্রকাশ এবং প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে বয়ে চলা ঐতিহ্যের এক জীবন্ত দলিল।

দোহালিয়া দুর্গাবাড়ি আজও রয়েছে, প্রতি বছর নিয়ম মেনে হচ্ছে দুর্গাপুজোও। আলোয় সেজে উঠছে মণ্ডপ, ভিড় করছেন দর্শনার্থীরা। কিন্তু একসময় যে মঞ্চ মানুষের হাসি-কান্না, আবেগ ও উচ্ছ্বাসে মুখর হয়ে থাকত, সেই মঞ্চ আজ যেন অতীতের নীরব সাক্ষী। ঐতিহ্যের কাঠামো রয়ে গেলেও হারিয়ে যাচ্ছে তার প্রাণের স্পন্দন।
তবে সংস্কৃতিপ্রেমীদের মতে, যাত্রাপালার ভবিষ্যৎ এখনও পুরোপুরি শেষ হয়ে যায়নি। সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে এই শিল্পকে নতুনভাবে উপস্থাপন করা সম্ভব। বড় আয়োজনের পরিবর্তে স্থানীয় শিল্পীদের নিয়ে এক বা দুই ঘণ্টার সংক্ষিপ্ত পালা মঞ্চস্থ করা যেতে পারে। আধুনিক আলোকসজ্জা ও শব্দব্যবস্থার সঙ্গে যাত্রার ঐতিহ্যকে যুক্ত করা, তরুণদের অভিনয়ে উৎসাহিত করা এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যাত্রাপালার প্রচার বাড়ানোর মতো উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে। এতে একদিকে যেমন পুরনো দর্শকদের আগ্রহ ফিরতে পারে, অন্যদিকে নতুন প্রজন্মও এই শিল্পের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার সুযোগ পাবে।

কারণ, ডিজিটাল মাধ্যমে মুহূর্তের মধ্যে হাজারো বিনোদন পাওয়া গেলেও মাঠে বসে শত শত মানুষের সঙ্গে একসঙ্গে হাসা, কাঁদা, উত্তেজিত হওয়া এবং অভিনয় শেষে শিল্পীদের করতালিতে ভাসিয়ে দেওয়ার অভিজ্ঞতা সম্পূর্ণ আলাদা। যাত্রাপালা কেবল কয়েক ঘণ্টার অভিনয় নয়; এটি মানুষের সঙ্গে মানুষের সংযোগ, স্থানীয় সংস্কৃতির প্রকাশ এবং প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে বয়ে চলা ঐতিহ্যের এক জীবন্ত দলিল।

আবার এসেছে দুর্গাপুজো। শারদীয় আকাশে ভাসছে সাদা মেঘ, কাশফুল দুলছে বাতাসে, শিউলির গন্ধে ভরে উঠছে চারপাশ। দোহালিয়া দুর্গাবাড়িতেও চলছে পুজোর প্রস্তুতি। আলোয় সেজে উঠবে মণ্ডপ, বাজবে গান, জমবে মানুষের ভিড়। কিন্তু সেই পুরনো প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে—দোহালিয়ার ঐতিহ্যবাহী যাত্রামঞ্চ কি আবার কখনও জ্বলে উঠবে? হারিকেনের আলো পেরিয়ে যে মঞ্চ একসময় মানুষের হৃদয় আলোকিত করেছিল, সেখানে কি আবার শোনা যাবে শিল্পীদের কণ্ঠে প্রাণবন্ত সংলাপ? মোবাইলের ছোট্ট পর্দা থেকে চোখ তুলে নতুন প্রজন্ম কি ফিরবে যাত্রা ও থিয়েটারের বড় মঞ্চে?
নাকি একদিন দোহালিয়ার যাত্রামঞ্চও শুধুই প্রবীণদের স্মৃতিচারণের বিষয় হয়ে থাকবে?

সময়ই দেবে এই প্রশ্নের উত্তর। তবে তার আগেই প্রয়োজন ঐতিহ্য রক্ষার আন্তরিক উদ্যোগ। রিলসের কয়েক সেকেন্ডের বিনোদনের ভিড়ে যেন হারিয়ে না যায় দীর্ঘদিনের সাংস্কৃতিক সাধনা, স্থানীয় শিল্পীদের অবদান এবং বাংলার লোকনাট্যের গৌরবময় ইতিহাস। কারণ, একটি যাত্রামঞ্চের নীরব হয়ে যাওয়া মানে শুধু একটি বিনোদনমাধ্যমের হারিয়ে যাওয়া নয়—তার সঙ্গে হারিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে একটি জনপদের স্মৃতি, আবেগ ও সাংস্কৃতিক পরিচয়েরও।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *