মোহাম্মদ জনি, শ্রীভূমি।
বরাক তরঙ্গ, ৩০ সেপ্টেম্বর : চান্দখিরার রহস্যময় মৃত্যুকাণ্ডের তদন্তে নতুন মোড়। ধৃত সঙ্গিনী রাসনা বেগমকে সঙ্গে নিয়ে ঘটনাস্থলে ক্রাইম সিন রিকনস্ট্রাকশন করল পাথারকান্দি থানার পুলিশ। বুধবার স্থানীয় ম্যাজিস্ট্রেটের উপস্থিতিতে চান্দখিরা বস্তির সেই ভাড়াবাড়িতে গিয়ে ঘটনার রাতের সম্ভাব্য গতিবিধি ও ঘটনাক্রম পুনর্নির্মাণ করা হয়।
পাথারকান্দির দেওলাখাল এলাকার কস্তুরবা গান্ধী বালিকা বিদ্যালয়ের পাশে চান্দখিরা বস্তির একটি ভাড়াবাড়ি থেকে গত সোমবার ভোরে রক্তাক্ত অবস্থায় আয়ুর্বেদিক ওষুধ বিক্রেতা আব্দুল কাদির লস্করের দেহ উদ্ধারের পর থেকেই এলাকায় চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়। প্রথম থেকেই ঘটনাটি আত্মহত্যা নাকি হত্যাকাণ্ড, তা নিয়ে তৈরি হয় নানা প্রশ্ন।
নিহত আব্দুল কাদিরের বাড়ি কাছাড় জেলার শিলচরের মধুরবন্দ এলাকায়। পেশায় তিনি কবিরাজি ওষুধ বিক্রি করতেন। প্রায় দু’মাস আগে ট্রেনযাত্রার সময় উত্তর ত্রিপুরার ধর্মনগরের পশ্চিম সাঁকাইবাড়ির বাসিন্দা রাসনা বেগমের সঙ্গে তাঁর পরিচয় হয় বলে পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে। পরবর্তীতে তাঁদের মধ্যে ঘনিষ্ঠতা তৈরি হয় এবং তাঁরা দেওলাখালে একটি ঘর ভাড়া নিয়ে বসবাস করছিলেন। আইনিভাবে বিয়ে না হলেও স্থানীয়দের কাছে তাঁরা স্বামী-স্ত্রীর মতোই বসবাস করতেন বলে জানা গেছে।
ঘটনার দিন ভোররাতে রাসনা বেগম ভাড়াবাড়িতে তালা লাগিয়ে নিজের বাড়ির উদ্দেশে রওনা হন বলে অভিযোগ। কিন্তু বাড়ির বাইরের মূল ফটকেও তালা থাকায় তিনি সেখান থেকে বের হতে পারেননি। তাঁর আচরণে সন্দেহ হয় স্থানীয়দের। কাদিরের বিষয়ে জানতে চাইলে রাসনা জানান, কাদির বিশেষ কাজে রাতেই বাড়ি চলে গিয়েছেন। তবে তাঁর বক্তব্যে অসঙ্গতি লক্ষ্য করেন প্রতিবেশীরা।

সন্দেহ হওয়ায় কয়েকজন জানালা দিয়ে ঘরের ভিতরে তাকালে বিছানায় কাপড়ে ঢাকা অবস্থায় কাদিরের রক্তাক্ত দেহ দেখতে পান। এরপর বাড়ির মালিক নাজিম উদ্দিনকে খবর দেওয়া হয় এবং পুলিশকে জানানো হয়।
খবর পেয়ে পাথারকান্দির সহকারী কমিশনার সীমান্ত বিশ্বাস ও তদন্তকারী দল ঘটনাস্থলে পৌঁছে তদন্ত শুরু করে। ঘটনাস্থল থেকে একটি রক্তমাখা ছুরি ও দুটি লাঠি উদ্ধার করে পুলিশ। পরে মৃতদেহ ময়নাতদন্তের জন্য জেলা সদর হাসপাতালে পাঠানো হয়।
ঘটনার পর রাসনা বেগমকে আটক করে জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করে পুলিশ। জিজ্ঞাসাবাদে রাসনা দাবি করেন, রবিবার রাতে কাদির তাঁকে মারধর করেছিলেন এবং পরে কাদির নিজেই ছুরি দিয়ে আত্মহত্যা করেন। একইসঙ্গে তাঁকে ব্ল্যাকমেল করার উদ্দেশ্যে কাদির কিছু আপত্তিকর ভিডিও মোবাইলে ধারণ করে রেখেছিলেন বলেও অভিযোগ করেন তিনি।

তবে রাসনার এই বক্তব্যের সঙ্গে ঘটনাস্থলের পরিস্থিতি ও উদ্ধার হওয়া সামগ্রীর সামঞ্জস্য রয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখছে পুলিশ। কাদিরের আরও তিনজন স্ত্রী রয়েছে বলেও তদন্তে উঠে এসেছে বলে জানা গেছে। ফলে তাঁর পারিবারিক ও ব্যক্তিগত সম্পর্কের বিষয়গুলিও তদন্তের আওতায় এনেছেন তদন্তকারীরা।
বুধবারের ক্রাইম সিন রিকনস্ট্রাকশনে রাসনা বেগমের বক্তব্য অনুযায়ী ঘটনার রাতের সম্ভাব্য ঘটনাক্রম যাচাই করা হয়। কে কোথায় ছিলেন, কীভাবে ঘটনার সূত্রপাত এবং মৃত্যুর আগে ঠিক কী ঘটেছিল—এসব বিষয় ঘটনাস্থলের বাস্তব পরিস্থিতির সঙ্গে মিলিয়ে দেখা হয়।
পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, ময়নাতদন্ত ও ফরেনসিক রিপোর্ট তদন্তের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেবে। উদ্ধার হওয়া অস্ত্রসদৃশ সামগ্রী, ঘটনাস্থলের বিভিন্ন তথ্য এবং সংশ্লিষ্টদের বক্তব্যও বিশ্লেষণ করা হচ্ছে।
প্রাথমিকভাবে ব্যক্তিগত বা পারিবারিক কলহের সম্ভাবনা খতিয়ে দেখা হলেও, ময়নাতদন্তের পূর্ণাঙ্গ রিপোর্ট না পাওয়া পর্যন্ত মৃত্যুর কারণ সম্পর্কে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছতে চাইছে না পুলিশ। আব্দুল কাদিরের মৃত্যু আত্মহত্যা, নাকি এর নেপথ্যে অন্য কোনও ঘটনা রয়েছে—এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই তদন্ত এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে পাথারকান্দি থানার পুলিশ।



