মোহাম্মদ জনি, শ্রীভূমি।
বরাক তরঙ্গ, ১২ সেপ্টেম্বর : স্বপ্ন ছিল নিজের উদ্ভাবনী শক্তির মাধ্যমে বরাক উপত্যকার নাম সারা দেশে ছড়িয়ে দেওয়ার। হাতের কাছে থাকা সাধারণ যন্ত্রপাতি ও বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম ব্যবহার করে নতুন কিছু তৈরি করাই ছিল তাঁর নেশা। কখনও অ্যান্টি-থেফট ডিভাইস, কখনও নিজের পরিকল্পনায় ইলেকট্রিক সাইকেল—এভাবেই উদ্ভাবনের জগতে নিজের পরিচিতি গড়ে তুলছিলেন রামকৃষ্ণনগরের আনিপুর এলাকার মেধাবী যুবক সম্রাট নাথ। স্বপ্ন ছিল বড় বিজ্ঞানী ও সফল উদ্যোক্তা হওয়ার। কিন্তু নির্মম নিয়তি মাত্র ৩০ বছর বয়সেই থামিয়ে দিল তাঁর সেই স্বপ্নের উড়ান। দুরারোগ্য ক্যান্সারের সঙ্গে দীর্ঘ লড়াইয়ের পর শুক্রবার রাতে শিলচরের একটি ক্যান্সার হাসপাতালে শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন সম্রাট নাথ। তাঁর অকাল প্রয়াণে রামকৃষ্ণনগর, আনিপুরসহ গোটা এলাকায় নেমে এসেছে গভীর শোকের ছায়া।
রামকৃষ্ণনগর সমজেলার আনিপুর এলাকার সংস্কৃতবস্তির বাসিন্দা সম্রাট ছোটবেলা থেকেই ছিলেন মেধাবী, কৌতূহলী ও উদ্ভাবনী চিন্তার অধিকারী। প্রচলিত পড়াশোনার পাশাপাশি যন্ত্রপাতি, বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম ও নতুন প্রযুক্তি নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতেই বেশি আগ্রহী ছিলেন তিনি। সীমিত উপকরণ ব্যবহার করে কীভাবে নতুন কিছু তৈরি করা যায়, সেই চিন্তায় সবসময় ব্যস্ত থাকতেন। তাঁর উদ্ভাবনী চিন্তার অন্যতম দৃষ্টান্ত ছিল বিভিন্ন ধরনের অ্যান্টি-থেফট ডিভাইস তৈরির উদ্যোগ। পাশাপাশি পরিবেশবান্ধব যাতায়াত ব্যবস্থার কথা মাথায় রেখে নিজের পরিকল্পনায় তৈরি করেছিলেন একটি ইলেকট্রিক সাইকেল। সেটিকে আরও উন্নত করে বাণিজ্যিকভাবে বাজারজাত করার স্বপ্নও ছিল তাঁর। শুধু ব্যবসায়িক সাফল্য নয়, নিজের উদ্ভাবনের মাধ্যমে বরাক উপত্যকার নাম জাতীয় স্তরে তুলে ধরাই ছিল তাঁর অন্যতম লক্ষ্য।
মাত্র ২৪-২৫ বছর বয়সেই সাহসী উদ্যোগ নিয়ে শিলচরে শুরু করেছিলেন নিজের ইলেকট্রিক সাইকেলের স্টোর। তরুণ বয়সেই নিজের পায়ে দাঁড়ানোর পাশাপাশি উদ্ভাবিত প্রযুক্তির পেটেন্ট নেওয়া এবং তা দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে দেওয়ার পরিকল্পনা করেছিলেন তিনি। ভবিষ্যতে আরও উন্নত প্রযুক্তিনির্ভর যানবাহন ও নানা ধরনের উদ্ভাবনী যন্ত্র তৈরির স্বপ্নও দেখতেন সম্রাট।

তাঁর জীবন ছিল কঠোর পরিশ্রম ও সংগ্রামে ভরা। পরিবারের কাছ থেকে দূরে শিলচরে থেকে নিজেই রান্নাবান্না করতেন। পাশাপাশি ব্যবসা সামলানোর সঙ্গে কলেজের পড়াশোনাও চালিয়ে যাচ্ছিলেন। জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে নিজের পায়ে দাঁড়ানোর অদম্য চেষ্টা ছিল তাঁর। আত্মবিশ্বাস, কঠোর পরিশ্রম এবং নতুন কিছু করার ইচ্ছাই তাঁকে অন্যদের থেকে আলাদা করে তুলেছিল। কিন্তু চলতি বছরের শুরুতেই তাঁর জীবনে নেমে আসে অন্ধকার। জানা যায়, দুরারোগ্য ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়েছেন সম্রাট। মুহূর্তের মধ্যে বদলে যায় তাঁর এবং পরিবারের জীবন। নতুন উদ্ভাবন ও ভবিষ্যতের পরিকল্পনা নিয়ে ব্যস্ত থাকা এই যুবককে শুরু করতে হয় কঠিন অসুস্থতার বিরুদ্ধে লড়াই।
উন্নত চিকিৎসার আশায় তাঁকে বেঙ্গালুরুতে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে দীর্ঘদিন চিকিৎসাধীন থাকার পর গত মে মাসে তাঁর বোনমেরু প্রতিস্থাপন করা হয়। চিকিৎসার পর কিছুটা সুস্থ হয়ে বাড়িও ফিরেছিলেন তিনি। এতে পরিবার ও পরিজনদের মধ্যে নতুন করে আশার সঞ্চার হয়েছিল।
অসুস্থতার মধ্যেও নিজের স্বপ্ন থেকে সরে আসেননি সম্রাট। সুস্থ হয়ে ফের ব্যবসা ও উদ্ভাবনের কাজে ফিরবেন—এমন আশাই পোষণ করছিলেন তিনি। ইলেকট্রিক সাইকেলের কাজ এগিয়ে নেওয়ার পাশাপাশি নতুন প্রযুক্তি নিয়ে কাজ করার পরিকল্পনাও ছিল তাঁর।
কিন্তু সেই আশা দীর্ঘস্থায়ী হলো না। কয়েক মাসের মধ্যেই ফের অসুস্থ হয়ে পড়েন সম্রাট। গত কয়েকদিন ধরে শিলচরের একটি ক্যান্সার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন তিনি। অবশেষে শুক্রবার রাত সাড়ে ১২টা নাগাদ সেখানেই তাঁর মৃত্যু হয়। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল মাত্র ৩০ বছর।
সম্রাটের অকাল প্রয়াণে পরিবারে নেমে এসেছে শোকের ছায়া। তিনি রেখে গেছেন মা-বাবা, ভাই-বোনসহ অসংখ্য আত্মীয়স্বজন ও গুণমুগ্ধকে। তাঁর মৃত্যুসংবাদ ছড়িয়ে পড়তেই আনিপুর, রামকৃষ্ণনগর ও আশপাশের এলাকায় শোকের আবহ তৈরি হয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও বহু মানুষ তাঁর অকাল প্রয়াণে শোক প্রকাশ করেন এবং তাঁর অসমাপ্ত স্বপ্নের কথা স্মরণ করেন।
পরিচিতজনদের মতে, সম্রাট নাথ শুধু একজন তরুণ উদ্যোক্তা ছিলেন না; তিনি ছিলেন নতুন প্রজন্মের এক স্বপ্নবাজ যুবক। সীমিত সামর্থ্যের মধ্যেও নিজের মেধা, পরিশ্রম ও আত্মবিশ্বাসকে সম্বল করে বড় কিছু করার চেষ্টা চালিয়ে গিয়েছেন তিনি। আরও কিছুটা সময় ও সুযোগ পেলে তাঁর উদ্ভাবনী প্রতিভা আরও বিকশিত হতে পারত বলে মনে করেন তাঁর পরিচিতরা।
কিন্তু সেই সুযোগ আর পেলেন না সম্রাট। মাত্র ৩০ বছর বয়সেই থেমে গেল এক সম্ভাবনাময় জীবনের পথচলা। অসমাপ্ত রয়ে গেল নতুন নতুন আবিষ্কারের স্বপ্ন, নিজের প্রযুক্তিকে দেশের দরবারে পৌঁছে দেওয়ার পরিকল্পনা। আনিপুরের সেই স্বপ্নবাজ যুবক আজ আর নেই, কিন্তু তাঁর উদ্ভাবনী চিন্তা, কঠোর পরিশ্রম ও অদম্য ইচ্ছাশক্তি দীর্ঘদিন মানুষের মনে স্মরণীয় হয়ে থাকবে। অকালেই নিভে গেল এক উজ্জ্বল প্রতিভার আলো। অসমাপ্ত স্বপ্ন বুকে নিয়েই চিরবিদায় নিলেন রামকৃষ্ণনগরের এই উদীয়মান প্রতিভা। তাঁর অকাল প্রয়াণে আজ শোকস্তব্ধ পরিবার, পরিচিতজন এবং গোটা এলাকা।



