বিতাড়িত দুই ‘বিদেশি’ নারীর পরিবারকে ২ লক্ষ ক্ষতিপূরণের নির্দেশ হাইকোর্টের

Spread the news

বরাক তরঙ্গ, ১০ সেপ্টেম্বর : গৌহাটি হাইকোর্ট অসম সরকারকে একটি গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশ দিয়েছে। ফরেনার্স ট্রাইব্যুনাল (FT) কর্তৃক বিদেশি হিসেবে ঘোষিত দুই নারীকে তাঁদের পরিবারকে না জানিয়ে এবং আইনি সহায়তা নেওয়ার সুযোগ না দিয়ে বাংলাদেশে ফেরত পাঠানোর অভিযোগ ওঠার পর আদালত এই রায় দেয়। দুই নারীর পরিবারকে অন্তর্বর্তীকালীন ক্ষতিপূরণ হিসেবে ২ লক্ষ টাকা করে দেওয়ার জন্য রাজ্য সরকারকে নির্দেশ দিয়েছে হাইকোর্ট।
গত ৩ সেপ্টেম্বর বিচারপতি কল্যাণ রায় সুরানা এবং বিচারপতি সুস্মিতা ফুকন খাউণ্ডের সমন্বয়ে গঠিত একটি ডিভিশন বেঞ্চ দু’টি পৃথক আবেদনের শুনানি গ্রহণ করে। শুনানিতে বিদেশ মন্ত্রককে (MEA) মমতাজ বেগম এবং জাহানারা বেগমকে বাংলাদেশ থেকে ফেরত আনার জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে নির্দেশ দেওয়া হয়।

উল্লেখ্য, এই দুই নারীকে নগাঁও জেলার জুরিয়া ফরেনার্স ট্রাইব্যুনাল অবৈধ বিদেশি হিসেবে ঘোষণা করেছিল।
​মমতাজ বেগমের পক্ষে তাঁর স্বামী মুজাম্মিল হক এবং জাহানারা বেগমের পক্ষে তাঁর পুত্র মুজাহিদুল ইসলাম হাইকোর্টে পৃথক রিট পিটিশন দাখিল করেছিলেন।

সুপ্রিম কোর্টের পূর্ববর্তী রায়ের কথা উল্লেখ করে হাইকোর্ট জানায় যে, সংবিধানের ২১ নম্বর অনুচ্ছেদ কেবল ভারতীয় নাগরিকদের জন্যই নয়, বিদেশি নাগরিকদের জন্যও জীবন ও ব্যক্তিগত স্বাধীনতার অধিকার নিশ্চিত করে। আদালতের মতে, ফরেনার্স ট্রাইব্যুনালের সিদ্ধান্তকে চ্যালেঞ্জ করে হাইকোর্টে রিট আবেদন করার মৌলিক সুযোগ থেকেও এই দুই নারীকে বঞ্চিত করা হয়েছে।

ডিভিশন বেঞ্চ মন্তব্য করে যে, ডিটেনশন ক্যাম্পে থাকা এই দুই নারীকে কোনও নোটিশ দেওয়া হয়নি। এমনকি আবেদনকারী বা তাঁদের পরিবারের কোনও প্রাপ্তবয়স্ক সদস্যকেও এ বিষয়ে অবহিত না করেই ভারত থেকে বের করে দেওয়া হয়েছে।

এই অনিয়মের কারণে আদালত অসম সরকারকে নির্দেশ দিয়েছে যে, আদেশের কপি পাওয়ার ৬০ দিনের মধ্যে উভয় আবেদনকারী পরিবারকে অন্তর্বর্তীকালীন ক্ষতিপূরণ হিসেবে ২ লক্ষ টাকা করে প্রদান করতে হবে।

আদালত বিদেশ মন্ত্রককে (MEA) এই মামলায় অন্তর্ভুক্ত করেছে, যাতে বাংলাদেশে থাকা এই দুই নারীর সন্ধান বের করে তাঁদের ভারতে ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা করা যায় এবং তাঁরা যেন হাইকোর্টে নিজেদের মামলা পুনরায় লড়ার আইনি সুযোগ পান।

জুরিয়া ফরেনার্স ট্রাইব্যুনাল ২০১৯ সালের ৬ জুন মমতাজ বেগমকে বিদেশি ঘোষণা করে। (উক্ত ট্রাইব্যুনালসমূহ সন্দেহভাজন ব্যক্তিদের নাগরিকত্ব নির্ধারণ করে থাকে)। মমতাজ বেগম এই রায়ের বিরুদ্ধে হাইকোর্টে যান। ২০ এপ্রিল হাইকোর্ট ট্রাইব্যুনালের রায় বাতিল করে মামলাটি পুনর্বিবেচনার জন্য ফেরত পাঠায়, কারণ ট্রাইব্যুনাল সমস্ত প্রমাণ সঠিকভাবে বিবেচনা করেনি। ৩০ মে তাঁকে ট্রাইব্যুনালে হাজির হওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়।

মুজাম্মিল হকের অভিযোগ অনুযায়ী, মমতাজ বেগম ৩০ মে আইনজীবীর সঙ্গে ট্রাইব্যুনালে হাইকোর্টের নির্দেশ পেশ করেন। কিন্তু আইনজীবী বেরিয়ে যাওয়ার পরপরই জুরিয়া থানার পুলিশ তাঁকে আটক করে। প্রথমে জুরিয়া থানা, পরে নগাঁও সদর থানা হয়ে ৩১ মে তাঁকে গোয়ালপাড়ার মাতিয়া ট্রানজিট ক্যাম্পে পাঠানো হয়। সেখান থেকে শ্রীভূমি জেলার এরালিগুলের ডিটেনশন ক্যাম্পে স্থানান্তর করা হয়।

আদালতের ৩ সেপ্টেম্বরের নির্দেশের পর বিএসএফ (BSF) একটি হলফনামায় জানায় যে, মমতাজ বেগমকে ১৩ জুন তাদের জিম্মায় দেওয়া হয় এবং ১৪ জুন তাঁকে বাংলাদেশে পাঠানো হয়।

২০১৬ সালের একটি মামলার ভিত্তিতে ২০১৯ সালের ৭ জুন জুরিয়া ফরেনার্স ট্রাইব্যুনাল জাহানারা বেগমকে বিদেশি ঘোষণা করে। জাহানারা বেগম হাইকোর্টে আবেদন করলে আদালত ট্রাইব্যুনালের আদেশ বাতিল করে মামলাটি পুনর্বিবেচনার নির্দেশ দেয়। কারণ ট্রাইব্যুনাল চারজন সাক্ষীর মধ্যে তিনজনের সাক্ষ্য আলোচনা করেনি।

তাঁর ছেলে মুজাহিদুল ইসলামের অভিযোগ অনুযায়ী, ২৯ মে জাহানারা ট্রাইব্যুনালে হাজির হয়ে স্থগিতাদেশ চেয়েছিলেন, কিন্তু তা নাকচ করা হয়। ট্রাইব্যুনালের সদস্য সীমান্ত পুলিশকে ডেকে তাঁকে জিম্মায় দেন।

জাহানারাকে জুরিয়া থানা থেকে নগাঁও, ৩০ মে মাতিয়া ডিটেনশন ক্যাম্প এবং ৩ জুন এরালিগুল হোল্ডিং সেন্টারে পাঠানো হয়। অভিযোগ অনুযায়ী, ১৩ জুন তাঁকে বিএসএফের জিম্মায় দেওয়া হয় এবং ১৩-১৪ জুনের রাতে সীমান্ত দিয়ে বাংলাদেশে পাঠিয়ে দেওয়া হয়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *