।। আশুতোষ দাস ।।
১৮ আগস্ট : শ্রাবণ এলেই বরাক উপত্যকার আকাশ-বাতাসে যেন অন্য এক সুর ভেসে আসে। বর্ষার জল, কাদামাটি, নদী-নালা, ধানখেত আর স্যাঁতসেঁতে গ্রামবাংলার জীবনের সঙ্গে মিশে থাকে দেবী মনসার আরাধনা। কোথাও ঘট বসে, কোথাও সিজগাছের তলায় পূজার আয়োজন, কোথাও মনসার প্রতিমা; আবার কোথাও সন্ধ্যা নামলেই শোনা যায় পদ্মপুরাণের পয়ার, মনসামঙ্গলের কাহিনি এবং ওঝার কণ্ঠে সেই বহু পুরোনো গান।
মনসামঙ্গল, পদ্মপুরাণ ও এক বিস্মৃত লোকনাট্যের সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার
বরাক উপত্যকার ঘরে ঘরে আজও মনসাপূজার যে ঐতিহ্য দেখা যায়, তার শিকড় কেবল একটি ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানে সীমাবদ্ধ নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে নদীমাতৃক জীবনের ভয়, সাপের ভয়, বন্যা ও বর্ষার অনিশ্চয়তা, কৃষিজীবনের প্রত্যাশা, সন্তান-সংসারের মঙ্গলকামনা এবং লোকসমাজের দীর্ঘ সাংস্কৃতিক স্মৃতি। এই কারণেই মনসা এখানে শুধু দেবী নন—তিনি লোকজীবনের এক গভীর প্রতীক।
সাম্প্রতিক গবেষণায়ও দেখা যায়, সুরমা–বরাক অঞ্চলে শ্রাবণ মাসজুড়ে পদ্মপুরাণ বা মনসামঙ্গল পাঠ এবং মনসাপূজার প্রচলন রয়েছে; পাশাপাশি নৌকাপূজা ও ওঝানৃত্যের মতো বৃহত্তর লোক-অনুষ্ঠানও এই ঐতিহ্যের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
শ্রীহট্ট: ওঝাগীতের এক প্রাচীন ভূগোল
বরাক উপত্যকার লোকসংস্কৃতিকে বুঝতে গেলে শ্রীহট্ট বা সিলেটের সাংস্কৃতিক পরিসরকে বাদ দেওয়া যায় না। বর্তমান রাজনৈতিক সীমারেখা এই সাংস্কৃতিক ধারাকে বিভক্ত করেছে, কিন্তু লোকসংস্কৃতির স্মৃতি সীমান্ত মানে না। সুরমা ও বরাক—দুই নদী-অববাহিকার মানুষের জীবনযাত্রা, কৃষি, নদীনির্ভরতা, আচার এবং লোকবিশ্বাসের মধ্যে বহু যুগের আদানপ্রদান রয়েছে।
শ্রীহট্ট অঞ্চলে মনসামঙ্গল বা পদ্মপুরাণের গান দীর্ঘকাল ধরে পারিবারিক ও সামষ্টিক ধর্মীয় অনুষ্ঠানের অংশ। শ্রাবণ মাসে অনেক জায়গায় কাহিনিটি ধারাবাহিকভাবে গাওয়া হয়। গবেষণায় এমনও উল্লেখ পাওয়া যায় যে শ্রীহট্ট অঞ্চলে প্রচলিত পদ্মপুরাণের পাঠ-পরম্পরায় ‘বাইশ কবির পদ্মপুরাণ’-এর বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে এবং নারায়ণদেবের রচনাও এই বৃহত্তর পূর্বাঞ্চলীয় ধারার সঙ্গে যুক্ত। এই গান কেবল পাঠ নয়। গান, কথকতা, অভিনয়, নৃত্য, বাদ্য এবং শ্রোতাদের অংশগ্রহণ—সব মিলিয়ে এটি হয়ে উঠেছিল একটি পূর্ণাঙ্গ লোকনাট্যরূপ।
আর এখানেই ‘ওঝা’র আবির্ভাব। ওঝা কে?
‘ওঝা’ শব্দটির অর্থ একমাত্রিক নয়। লোকসমাজে ওঝা কখনও চিকিৎসক, কখনও সাপুড়ে, কখনও মন্ত্রজ্ঞ, আবার মনসা-উপাসনার পরিসরে তিনি গায়ক, কথক, নৃত্যশিল্পী ও পালার পরিচালক। বরাকের ওঝানৃত্য সম্পর্কে গবেষণায় ওঝাকে একাধারে সূত্রধর, গায়ক, নৃত্যশিল্পী এবং পরিচালক হিসেবে দেখা হয়েছে।
অর্থাৎ ওঝা শুধু গান করেন না; তিনি কাহিনিকে এগিয়ে নিয়ে যান। চাঁদ সদাগর, মনসা, বেহুলা, লখিন্দর, নেতাই, সনকা—কাহিনির নানা চরিত্র ও পর্ব তাঁর গানের ভিতর দিয়ে জীবন্ত হয়ে ওঠে। কখনও তাঁর কণ্ঠে বিষাদ, কখনও ব্যঙ্গ, কখনও ভক্তি, কখনও নাটকীয় উত্তেজনা।
এই কারণেই ওঝাগীতকে শুধু ‘ধর্মীয় গান’ বললে তার শিল্পসত্তা সম্পূর্ণ ধরা পড়ে না। এটি একই সঙ্গে গীতিকাব্য, আখ্যানকাব্য, লোকনাট্য ও নৃত্যনাট্যের উপাদান বহন করে।
মনসা কেন লোকজীবনের দেবী?
মনসার পূজার সঙ্গে সাপের সম্পর্ক সুস্পষ্ট। কিন্তু সাপ এখানে কেবল একটি প্রাণী নয়; নদী-নালা, জলাভূমি, কৃষিজমি এবং বর্ষাকালের প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের যে অনিশ্চিত সহাবস্থান, সাপ তারই একটি প্রতীক।
নদীমাতৃক সমাজে মানুষের জীবনে যেমন নদী জীবন দেয়, তেমনি নদী বিপদও ডেকে আনে। বর্ষা যেমন ধানের আশা নিয়ে আসে, তেমনি বন্যা ও রোগের আশঙ্কাও নিয়ে আসে। মনসার আরাধনার মধ্যে তাই প্রকৃতিকে ভয় করা এবং প্রকৃতির সঙ্গে সহাবস্থানের এক লোকদর্শন কাজ করে।
গবেষণায় মনসা-উপাসনাকে সাপের ভয় থেকে সুরক্ষা, সমৃদ্ধি ও উর্বরতার আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে।
মনসা সেই অর্থে লোকসমাজের এক ‘সীমান্তবর্তী দেবী’—পুরাণের দেবলোক এবং সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনের মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকা এক শক্তি।
চাঁদ সদাগর ও মনসা : ক্ষমতার সংঘাত থেকে লোকমানবের কাহিনি
মনসামঙ্গলের সবচেয়ে শক্তিশালী নাটকীয়তা নিহিত রয়েছে চাঁদ সদাগর ও মনসার সংঘাতে।
চাঁদ সদাগর মনসাকে দেবী হিসেবে স্বীকার করতে চান না। মনসা চান তাঁর পূজা প্রতিষ্ঠিত হোক। এই সংঘাত ধীরে ধীরে চাঁদের পরিবার, বাণিজ্য, পুত্র লখিন্দর এবং বেহুলার জীবনের সঙ্গে জড়িয়ে যায়। কিন্তু লোকগীতির শক্তি এখানেই—এটি পুরাণকে কেবল দেবদেবীর গল্প করে রাখে না; তাকে মানুষের সংসারের গল্পে পরিণত করে।
চাঁদ হয়ে ওঠেন এক জেদি মানুষ, মনসা হয়ে ওঠেন অপমানিত শক্তির প্রতীক, লখিন্দর হয়ে ওঠেন অকালবিধ্বস্ত যুবক এবং বেহুলা হয়ে ওঠেন অসম্ভব সংগ্রামের নারী।
বিশেষত বেহুলার চরিত্র ওঝাগীতকে গভীর মানবিকতা দিয়েছে। স্বামীকে ফিরে পাওয়ার আকাঙ্ক্ষায় তাঁর যাত্রা কেবল পৌরাণিক ঘটনা নয়; তা হয়ে উঠেছে বাঙালি লোকসমাজের নারীজীবনের দুঃখ, আশা, ধৈর্য ও সংগ্রামের এক প্রতীকী কাহিনি।
শ্রীহট্টের ওঝাগীতে বেহুলার কান্না
মনসামঙ্গলের বিভিন্ন পরিবেশনায় বেহুলার বিলাপ একটি বিশেষ আবেগময় অংশ। সিলেট অঞ্চলের সংরক্ষিত কিছু রেকর্ডিং নিয়েও গবেষণা হয়েছে, যেখানে মনসামঙ্গলের আখ্যান ওঝার কণ্ঠে পরিবেশিত হয়েছে এবং শ্রোতাদের স্বতঃস্ফূর্ত শব্দ, কথোপকথন ও পরিবেশের শব্দও সেই লোকপরিবেশনের অংশ হয়ে উঠেছে।
এখানে গান যেন মঞ্চের জন্য তৈরি কোনো বিচ্ছিন্ন শিল্প নয়। শ্রোতারা তারই অংশ।
ওঝা গান করছেন—
শ্রোতা শুনছেন—
কেউ আবেগে সাড়া দিচ্ছেন—
কেউ চরিত্রের সঙ্গে একাত্ম হচ্ছেন—
আর সেই মুহূর্তে পুরাণ ও বাস্তবের দূরত্ব কমে আসছে।
এই অংশগ্রহণমূলক চরিত্রই লোকগানের প্রাণ।
ওঝাগীতের সঙ্গে ওঝানৃত্য
বরাক উপত্যকায় ওঝাগীতের সঙ্গে ওঝানৃত্যের সম্পর্ক অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ। এখানে গান শুধু কণ্ঠে থাকে না; শরীরও সেই গানের ভাষা হয়ে ওঠে।
ওঝার পোশাক, হাতের ভঙ্গি, পদক্ষেপ, মুখভঙ্গি এবং নৃত্যভঙ্গি—সব মিলিয়ে কাহিনি দৃশ্যমান হয়ে ওঠে। ওঝা কখনও চরিত্রের আবেগ প্রকাশ করেন, কখনও কাহিনির সূত্র ধরেন, কখনও দর্শকের সঙ্গে যোগাযোগ করেন।
শ্রীহট্ট থেকে কাছাড়, কাছাড় থেকে বরাক—এই সাংস্কৃতিক প্রবাহে গান, পালা, আচার, দেবদেবী ও লোকবিশ্বাস এক অঞ্চল থেকে অন্য অঞ্চলে প্রবাহিত হয়েছে। গবেষণায়ও বর্তমান কাছাড় ও বরাককে বৃহত্তর শ্রীহট্ট-সাংস্কৃতিক ধারার সঙ্গে সম্পর্কিত বলে দেখানো হয়েছে। এমনকি নারায়ণদেবের পদ্মপুরাণের প্রভাব অসমের অন্যান্য অঞ্চলেও বিস্তৃত হওয়ার উল্লেখ পাওয়া যায়।
সুতরাং বরাকের মনসাপূজা কোনো বিচ্ছিন্ন আঞ্চলিক ঘটনা নয়; এটি পূর্ববঙ্গীয় লোকসংস্কৃতির এক দীর্ঘ ঐতিহাসিক স্রোতের উত্তরাধিকার।
বরাকের নৌকাপূজার ক্ষেত্রেও ওঝানৃত্য একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। গবেষণায় দেখা যায়, দীর্ঘস্থায়ী এই লোকোৎসবে পদ্মপুরাণ পাঠ, গান ও নৃত্যের সঙ্গে বেহুলা-লখিন্দর এবং মনসামঙ্গলের বিভিন্ন চরিত্রের উপস্থিতি একটি বৃহৎ লোকনাট্যরূপ তৈরি করে।
গুরমা ও ওঝা : লোকপরিবেশনের বিস্মৃত অধ্যায়
শ্রীহট্ট-বরাক অঞ্চলের মনসা-সংস্কৃতির আলোচনায় ‘গুরমা’ বা ‘গুরুমি’দের কথাও বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। তাঁদের পরিবেশনায় মনসামঙ্গলের গান ও নৃত্য এক স্বতন্ত্র নাট্যরূপ পেয়েছিল। বরাক অঞ্চলের লোকস্মৃতিতে এই ধারার নানা চিহ্ন এখনও পাওয়া যায়। এটি ছিল এক অভিনব পারফরম্যান্স-সংস্কৃতি, যেখানে পোশাক, নৃত্য, অভিনয়, গান এবং চরিত্রাভিনয় একসঙ্গে মিশে যেত। এই ঐতিহ্যের ক্ষয় আজ লোকসংস্কৃতির গবেষকদের কাছে উদ্বেগের বিষয়।
কারণ একটি লোকশিল্প হারিয়ে গেলে শুধু কয়েকটি গান হারায় না—হারিয়ে যায় একটি অঞ্চলের স্মৃতি, ভাষার স্বর, পোশাকের রীতি, নৃত্যের ভঙ্গি, বাদ্যযন্ত্রের ব্যবহার এবং মানুষের সমষ্টিগত অনুভূতির এক বিশাল ভাণ্ডার।
ঘরে ঘরে মনসাপূজা: বৃহৎ লোকঐতিহ্যের ক্ষুদ্রতম মঞ্চ
আজ বরাক উপত্যকার বহু ঘরে যখন মনসাপূজা হচ্ছে, তখন হয়তো কোথাও আর আগের মতো দীর্ঘ ওঝাগান শোনা যায় না। কোথাও পূজা সীমিত হয়ে এসেছে ঘট, ফুল, ফল, প্রসাদ ও আনুষ্ঠানিকতার মধ্যে। কিন্তু যে ঘরে মনসার সামনে প্রদীপ জ্বলে, সেই ঘরটিও আসলে বৃহত্তর লোকঐতিহ্যের একটি ক্ষুদ্র মঞ্চ।
একসময় যে গান উঠত—
চাঁদ সদাগরের অহংকার,
মনসার অভিমান,
লখিন্দরের মৃত্যু,
বেহুলার যাত্রা,
নেতাইয়ের সহায়তা—
সেই সমস্ত কাহিনি মানুষের মুখে মুখে বেঁচে থেকেছে।
আজকের প্রজন্মের কাছে হয়তো তার সবটুকু পরিচিত নয়। কিন্তু উৎসবের আবহ, পূজার আচার এবং লোকবিশ্বাসের ভিতরে সেই স্মৃতি এখনও অদৃশ্যভাবে কাজ করে।
নদী, নারী ও সাপ: মনসাগানের তিন প্রতীক
মনসাগানের গভীরে তাকালে তিনটি প্রতীক বারবার ফিরে আসে—নদী, নারী এবং সাপ।
নদী এখানে জীবনের অনিশ্চয়তা।
সাপ প্রকৃতির অদৃশ্য বিপদ ও শক্তি।
আর নারী—বিশেষত বেহুলা—মানুষের অদম্য প্রত্যয়ের প্রতীক।
বেহুলার নৌযাত্রা তাই শুধু পৌরাণিক যাত্রা নয়; এটি নদীমাতৃক পূর্ববাংলা ও বরাকের মানুষের জীবনযাত্রারও এক প্রতীকী রূপ। জল, নৌকা, স্রোত, অন্ধকার রাত এবং অজানা গন্তব্য—এসবই এই ভূগোলের মানুষের চেনা অভিজ্ঞতা।
এই কারণেই শ্রীহট্টের মনসামঙ্গল বরাকের মানুষের কাছেও এত আপন।
সীমান্ত পেরিয়ে এক সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার
রাষ্ট্রের সীমান্ত বদলেছে। জেলা বদলেছে। প্রশাসনিক মানচিত্র বদলেছে। কিন্তু লোকস্মৃতির মানচিত্র এত সহজে বদলায় না।
শ্রীহট্ট থেকে কাছাড়, কাছাড় থেকে বরাক—এই সাংস্কৃতিক প্রবাহে গান, পালা, আচার, দেবদেবী ও লোকবিশ্বাস এক অঞ্চল থেকে অন্য অঞ্চলে প্রবাহিত হয়েছে। গবেষণায়ও বর্তমান কাছাড় ও বরাককে বৃহত্তর শ্রীহট্ট-সাংস্কৃতিক ধারার সঙ্গে সম্পর্কিত বলে দেখানো হয়েছে। এমনকি নারায়ণদেবের পদ্মপুরাণের প্রভাব অসমের অন্যান্য অঞ্চলেও বিস্তৃত হওয়ার উল্লেখ পাওয়া যায়।
সুতরাং বরাকের মনসাপূজা কোনো বিচ্ছিন্ন আঞ্চলিক ঘটনা নয়; এটি পূর্ববঙ্গীয় লোকসংস্কৃতির এক দীর্ঘ ঐতিহাসিক স্রোতের উত্তরাধিকার।

আজকের সংকট
আধুনিকতার অভিঘাতে ওঝাগীত ও ওঝানৃত্যের ঐতিহ্য সংকুচিত হচ্ছে। দীর্ঘ আখ্যান শোনার সময় কমেছে, পেশাদার ওঝা-শিল্পীর সংখ্যা কমেছে, মৌখিক পরম্পরার ধারকরা বৃদ্ধ হচ্ছেন এবং নতুন প্রজন্মের সঙ্গে এই শিল্পের যোগাযোগ ক্রমশ দুর্বল হচ্ছে।
অন্যদিকে মনসাপূজা অনেক জায়গায় আরও জাঁকজমকপূর্ণ হলেও আচার ও লোকশিল্পের মধ্যকার পুরোনো সম্পর্কটি সবসময় বজায় থাকছে না।
এই জায়গাতেই একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উঠে আসে—
আমরা কি মনসাপূজাকে শুধু পূজা হিসেবে রাখব, নাকি তার সঙ্গে যুক্ত পদ্মপুরাণ, ওঝাগীত, ওঝানৃত্য, লোকবাদ্য, লোকভাষা ও লোকনাট্যের ঐতিহ্যকেও সংরক্ষণ করব?
এই প্রশ্নের উত্তর ভবিষ্যৎ প্রজন্মের সাংস্কৃতিক স্মৃতির সঙ্গে জড়িয়ে আছে।
সংরক্ষণের প্রয়োজন
বরাক উপত্যকার প্রতিটি অঞ্চলে এখনও যাঁরা মনসাগান, পদ্মপুরাণ বা ওঝাগীত জানেন, তাঁদের গান রেকর্ড করা প্রয়োজন। প্রবীণ শিল্পীদের সাক্ষাৎকার নেওয়া প্রয়োজন। গানের পুঁথি, পদ, সুর, বাদ্যযন্ত্র, পোশাক ও নৃত্যভঙ্গির নথি তৈরি করা দরকার।
বিশেষত স্থানীয় উপভাষায় গাওয়া গানগুলি লিখিত আকারে সংরক্ষণ করা অত্যন্ত জরুরি। কারণ একটি গান হারিয়ে গেলে তার সঙ্গে হারিয়ে যেতে পারে বহু প্রজন্মের ভাষা ও জীবনযাপনের স্মৃতি।
বরাক উপত্যকার স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় ও সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানগুলি যদি এই লোকঐতিহ্য নিয়ে কর্মশালা, নথিবদ্ধকরণ, লোকগান উৎসব এবং গবেষণার উদ্যোগ নেয়, তবে ওঝাগীত নতুন প্রজন্মের কাছে নতুনভাবে ফিরে আসতে পারে।
আজ শ্রাবণের দিনে বরাক উপত্যকার ঘরে ঘরে যখন মা মনসার পূজা হচ্ছে, তখন সেই প্রদীপের আলোয় আমরা শুধু একজন দেবীর আরাধনা দেখব না; দেখতে হবে একটি দীর্ঘ লোকসভ্যতার প্রতিচ্ছবি। সেই সভ্যতার মধ্যে আছে নদী ও নৌকা, কৃষক ও জেলে, সাপ ও বর্ষা, ভয় ও বিশ্বাস, নারী ও পুরুষ, গান ও নৃত্য, পুঁথি ও মৌখিক স্মৃতি।
আর আছে ওঝার কণ্ঠ। সেই কণ্ঠে চাঁদ সদাগরের অহংকার, মনসার অভিমান, লখিন্দরের নিয়তি এবং বেহুলার অদম্য যাত্রা আজও ফিরে আসে।
শ্রীহট্টের মাটিতে যে ওঝাগীত একদিন মানুষের ঘর থেকে ঘরে, উঠোন থেকে উঠোনে, পূজামণ্ডপ থেকে নদীর ঘাটে ছড়িয়ে পড়েছিল, তারই বহু পুরোনো প্রতিধ্বনি আজও বরাক উপত্যকার লোকজীবনে শোনা যায়।
তাই মনসাপূজার এই ঋতুতে আমাদের মনে রাখা দরকার—
মনসার পূজা শুধু দেবীর পূজা নয়;
এ আমাদের নদীর স্মৃতি,
আমাদের লোকভাষার স্মৃতি,
আমাদের নারীর অশ্রু ও সাহসের স্মৃতি,
এবং আমাদের পূর্বপুরুষের গান।
ওঝার কণ্ঠ থেমে গেলে সেই স্মৃতির একটি দরজা বন্ধ হয়ে যাবে।
তাই প্রয়োজন পূজার পাশাপাশি গানকে বাঁচানো, ওঝাকে বাঁচানো, পুঁথিকে বাঁচানো এবং লোকস্মৃতিকে বাঁচানো।
কারণ লোকসংস্কৃতি কোনো জাদুঘরে বন্দি মৃত বস্তু নয়—
মানুষের কণ্ঠে বেঁচে থাকা ইতিহাসের নামই লোকসংস্কৃতি।



