প্রকৃত ইতিহাসের আলোকে স্বাধীনতার মূল্যায়ন জরুরি: অতীন দাশ

Spread the news

বরাক তরঙ্গ, ১৪ আগস্ট : ভারতের স্বাধীনতার ৮০ বছর পূর্ণ হতে চললেও দেশভাগের ক্ষত আজও পুরোপুরি শুকিয়ে যায়নি। ইতিহাসের সেই রক্তাক্ত অধ্যায়ের পুনর্মূল্যায়ন এবং প্রকৃত তথ্য ও সত্য উদঘাটনের প্রয়োজন রয়েছে বলে মন্তব্য করলেন বিশিষ্ট কবি, সাংবাদিক ও চিন্তাবিদ অতীন দাশ। শুক্রবার বরাক নাগরিক সংসদের উদ্যোগে শিলচর প্রেস ক্লাবে আয়োজিত এক আলোচনা সভায় তিনি এ কথা বলেন।

‘ইতিহাসের রক্তাক্ত অধ্যায়: দেশভাগ কি অপরিহার্য ছিল?’ শীর্ষক আলোচনায় অতীন দাশ বলেন, দেশভাগ কোনও অবস্থাতেই কাম্য ছিল না। তাঁর মতে, নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু সেই সময় দেশে উপস্থিত থাকলে এভাবে খণ্ডিত স্বাধীনতা ভারতবাসীর ওপর চাপিয়ে দেওয়া সম্ভব হতো না।

দেশভাগের জন্য শুধুমাত্র মহম্মদ আলি জিন্নাহকে দায়ী করে অন্যদের দায় এড়ানোর চেষ্টা ইতিহাসের নিরপেক্ষ বিশ্লেষণে গ্রহণযোগ্য নয় বলেও মন্তব্য করেন তিনি। তাঁর বক্তব্য, তড়িঘড়ি ক্ষমতা হস্তান্তর এবং রাজনৈতিক কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার সিদ্ধান্তের ফলে কোটি কোটি মানুষের জীবনে বিপর্যয় নেমে এসেছিল।
অতীন দাশ আরও বলেন, রাজনৈতিক জীবনের শুরুতে জিন্নাহ ছিলেন প্রগতিশীল এবং হিন্দু-মুসলিম বিভাজনের রাজনীতির বিরোধী। পরবর্তী সময়ে রাজনৈতিক পরিস্থিতি ও কংগ্রেসের একাংশের ভূমিকার কারণে তাঁর অবস্থানে পরিবর্তন আসে। দেশভাগের বিরোধিতায় মহাত্মা গান্ধীর অবস্থানও শেষ পর্যন্ত কতটা কার্যকর ছিল, তা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন তিনি।
তিনি বলেন, ধর্মীয় বিভাজন ও সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষ দিয়ে কোনও রাষ্ট্রকে সুস্থভাবে পরিচালনা করা সম্ভব নয়। বিভিন্ন ধর্মাবলম্বী মানুষের মধ্যে সম্প্রীতির পরিবেশ গড়ে তোলাই আগামী প্রজন্মের প্রতি দায়িত্ব।

আলোচনায় লেখক দীপঙ্কর ঘোষ বলেন, দেশভাগে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত জাতিগুলির অন্যতম বাঙালি। স্বাধীনতা সংগ্রামে গুরুত্বপূর্ণ ত্যাগ স্বীকার করেও দেশভাগের ফলে বাঙালি জাতিসত্তা দুর্বল ও বিভক্ত হয়েছে। লক্ষ লক্ষ ছিন্নমূল মানুষ দীর্ঘদিন ধরে অমানবিক পরিস্থিতির মধ্যে জীবন কাটাতে বাধ্য হয়েছেন।

শিক্ষাবিদ অশোককুমার দেব দেশভাগের সময়ের বাস্তুচ্যুতি ও নির্যাতনের বীভৎস স্মৃতি তুলে ধরে বলেন, পূর্বপুরুষের গড়ে তোলা ঘরবাড়ি ছেড়ে আসা বাঙালিদের বহু প্রজন্ম পরেও সেই ক্ষতের বোঝা বহন করতে হচ্ছে। তাই ইতিহাসের এই অধ্যায়ের পুনর্মূল্যায়ন জরুরি।
বরাক নাগরিক সংসদের প্রধান সম্পাদক শংকর দে বলেন, খণ্ডিত স্বাধীনতার ফলে মানুষের আশা-আকাঙ্ক্ষা গভীরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। এর প্রভাব আজও উপমহাদেশের সামাজিক ও রাজনৈতিক জীবনে রয়েছে। লেখক সুবীর রাজ হালদার বলেন, বিকৃত ইতিহাস অনেক সময় প্রকৃত সত্যকে আড়াল করেছে। সঠিক ইতিহাসচর্চার মাধ্যমেই অতীতের ভুল ও বিভাজনের অন্ধকার থেকে বেরিয়ে আসতে হবে।

কবি-সাংবাদিক স্মৃতি পাল নাথ বলেন, নতুন প্রজন্মের মধ্যে দেশভাগের স্মৃতি আগের মতো প্রবল না হলেও ভারতের স্বাধীনতার ইতিহাসের সঙ্গে এই অধ্যায় অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত।

অনুষ্ঠানে নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুকে নিয়ে কিছু মহলের কথিত আপত্তিকর ও মনগড়া মন্তব্যের তীব্র নিন্দা জানানো হয়। এ ঘটনায় রাজ্যসভা সাংসদ নগেন্দ্র রায়ের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণেরও দাবি জানানো হয়েছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *