মোহাম্মদ জনি, শ্রীভূমি।
বরাক তরঙ্গ, ১৩ আগস্ট : ইতিহাসের স্মৃতিবিজড়িত মালেগড় টিলায় যেন ফের জেগে উঠল স্বাধীনতা সংগ্রামের সেই গৌরবময় অধ্যায়। হাতে হাতে জাতীয় পতাকা, কণ্ঠে ‘বন্দে মাতরম’ ও ‘ভারত মাতা কি জয়’ ধ্বনি—দেশপ্রেমের আবেগে বৃহস্পতিবার মুখর হয়ে উঠল লাতু থেকে ঐতিহাসিক মালেগড় পর্যন্ত বিস্তীর্ণ এলাকা। বন্দে মাতরম সঙ্গীতের ১৫০ বছর পূর্তি এবং আসন্ন ৮০তম স্বাধীনতা দিবসকে সামনে রেখে বিজেপির লক্ষীবাজার-গান্ধাই মণ্ডলের উদ্যোগে আয়োজিত হয় বর্ণাঢ্য তেরঙ্গা যাত্রা।
লাতু বাসস্ট্যান্ডে জাতীয় পতাকা উত্তোলনের মধ্য দিয়ে শুরু হয় দিনের এই বিশেষ কর্মসূচি। এরপর জাতীয় পতাকা হাতে নিয়ে শোভাযাত্রায় পা মেলান বিজেপির কর্মকর্তা-কর্মী, স্থানীয় নেতৃত্ব, বিভিন্ন আত্মসহায়ক গোষ্ঠীর সদস্যসহ বহু মানুষ। তেরঙ্গার রঙে সেজে ওঠে শোভাযাত্রার সামনের সারি। দেশপ্রেমের আবেগে অংশগ্রহণকারীদের কণ্ঠে বারবার ধ্বনিত হতে থাকে ‘বন্দে মাতরম’, ‘ভারত মাতা কি জয়’-সহ বিভিন্ন দেশাত্মবোধক স্লোগান।
লাতুর বিভিন্ন এলাকা পরিক্রমা করে তেরঙ্গা যাত্রা ধীরে ধীরে এগিয়ে যায় ঐতিহাসিক মালেগড় টিলার দিকে। শোভাযাত্রার পথজুড়ে তৈরি হয় এক উৎসবমুখর পরিবেশ। জাতীয় পতাকা হাতে শিশু-কিশোর থেকে শুরু করে যুবক-যুবতী, দলীয় কর্মী-সমর্থক ও সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণে গোটা এলাকা যেন পরিণত হয় দেশপ্রেমের এক মিলনমেলায়।
তবে এই তেরঙ্গা যাত্রার তাৎপর্য শুধু একটি শোভাযাত্রার মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না। ইতিহাসের সঙ্গে বর্তমান প্রজন্মের যোগসূত্র আরও দৃঢ় করাই যেন ছিল এই কর্মসূচির অন্যতম বার্তা। সিপাহী বিদ্রোহের ঐতিহাসিক স্মৃতিবিজড়িত মালেগড় টিলায় পৌঁছানোর পর জাতীয় পতাকা উত্তোলন করা হয়। এরপর ১৮৫৭ সালের সিপাহী বিদ্রোহের সঙ্গে জড়িত ২৬ জন বীর শহীদের স্মৃতির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন করেন উপস্থিত নেতৃবৃন্দ ও অংশগ্রহণকারীরা।
মালেগড়ের ঐতিহাসিক মাটিতে দাঁড়িয়ে শহীদদের আত্মত্যাগ স্মরণ করতে গিয়ে বক্তারা বলেন, দেশের স্বাধীনতা কোনো সহজলভ্য অর্জন নয়। দীর্ঘ সংগ্রাম, অসংখ্য মানুষের আত্মত্যাগ এবং বীর শহীদদের রক্তের বিনিময়েই অর্জিত হয়েছে স্বাধীনতা। তাই স্বাধীনতার ইতিহাসকে শুধু বইয়ের পাতায় সীমাবদ্ধ না রেখে নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়া প্রয়োজন। দেশের ইতিহাস, ঐতিহ্য, জাতীয় ঐক্য ও দেশপ্রেমের চেতনাকে আরও শক্তিশালী করাই এ ধরনের কর্মসূচির মূল উদ্দেশ্য বলে তাঁরা উল্লেখ করেন।
১৮৫৭ সালের বিদ্রোহের স্মৃতিবাহী মালেগড় টিলায় শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদনের মুহূর্তটি ছিল বিশেষভাবে আবেগঘন। জাতীয় পতাকার নিচে দাঁড়িয়ে উপস্থিতরা স্বাধীনতার জন্য জীবন উৎসর্গকারী বীরদের স্মরণ করেন। তাঁদের আত্মত্যাগের কথা স্মরণ করে দেশ ও জাতির প্রতি দায়িত্বশীল হওয়ার পাশাপাশি জাতীয় ঐক্য ও সম্প্রীতির আদর্শকে আরও শক্তিশালী করার আহ্বান জানানো হয়।
এদিন লাতু থেকে মালেগড় পর্যন্ত তেরঙ্গা যাত্রার পুরো পথজুড়ে দেখা যায় দেশপ্রেমের উচ্ছ্বাস। রাস্তার দুই পাশে জাতীয় পতাকার আবহ, শোভাযাত্রায় অংশগ্রহণকারীদের স্বতঃস্ফূর্ত উপস্থিতি এবং দেশাত্মবোধক স্লোগানে মুখরিত হয়ে ওঠে পরিবেশ। অনেকের হাতেই ছিল ছোট-বড় জাতীয় পতাকা। তেরঙ্গার রঙে রাঙা শোভাযাত্রার দৃশ্য মুহূর্তেই আকর্ষণের কেন্দ্র হয়ে ওঠে।
বিশেষ করে মালেগড় টিলায় পৌঁছে শহীদদের স্মৃতির সামনে শ্রদ্ধা নিবেদনের দৃশ্য ছিল অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। ইতিহাসের সাক্ষী এই মাটিতে দাঁড়িয়ে বর্তমান প্রজন্মের কাছে স্বাধীনতা সংগ্রামের চেতনা পৌঁছে দেওয়ার বার্তা দেওয়া হয়। একইসঙ্গে দেশের সার্বভৌমত্ব, জাতীয় ঐক্য এবং অখণ্ডতার প্রতি অটুট থাকার অঙ্গীকারও প্রতিফলিত হয় এদিনের কর্মসূচিতে।

তেরঙ্গা যাত্রায় উপস্থিত ছিলেন নিলামবাজার জেলা পরিষদ সদস্য অভিজিৎ রায়, লক্ষীবাজার-গান্ধাই মণ্ডল সভাপতি নিরুপম দেব, প্রাক্তন মণ্ডল সভাপতি মনোজ দেব, লাতু-সজপুর জিপি সভানেত্রী স্নিগ্ধা দাস, মণ্ডল সহ-সভাপতি গোবিন্দ দাস, সম্পাদক মনজিৎ দেবসহ দলের অন্যান্য কর্মকর্তা-কর্মী এবং বিভিন্ন আত্মসহায়ক গোষ্ঠীর সদস্যরা।
বন্দে মাতরম সঙ্গীতের ১৫০ বছর পূর্তি এবং দেশের ৮০তম স্বাধীনতা দিবসের প্রাক্কালে লাতু থেকে মালেগড়ের এই তেরঙ্গা যাত্রা যেন একইসঙ্গে ইতিহাস স্মরণ, শহিদদের প্রতি শ্রদ্ধা এবং দেশপ্রেমের নতুন বার্তা বহন করল। স্বাধীনতার অমর ইতিহাসের সাক্ষী মালেগড়ের মাটিতে উড়ল জাতীয় পতাকা, আর তার সঙ্গে প্রতিধ্বনিত হলো এক দৃঢ় অঙ্গীকার—বীর শহীদদের আত্মত্যাগকে হৃদয়ে ধারণ করে দেশপ্রেম, জাতীয় ঐক্য, সম্প্রীতি ও দায়িত্ববোধের চেতনাকে আরও শক্তিশালী করে এগিয়ে চলার।



