শুধু বাঁধ নির্মাণ নয়, চাই স্যাটেলাইট প্রযুক্তি : সুপারিশ আসাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সমীক্ষায়
বরাক তরঙ্গ, ১১ আগস্ট : অসমে জুলাইয়ের ভয়াবহ বন্যার মূল কারণ ব্রহ্মপুত্রের জল উপচে পড়া নয়। প্রতিবেশী নাগাল্যান্ড ও অরুণাচল প্রদেশের পাহাড়ি এলাকায় অস্বাভাবিক বৃষ্টিপাতের ফলেই দক্ষিণ তীরের নদীগুলিতে আচমকা জলস্ফীতির কারণে বন্যার সৃষ্টি হয়। আসাম বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকদের এক সমীক্ষা প্রতিবেদনে এই গুরুত্বপূর্ণ তথ্য উঠে এসেছে। মঙ্গলবারই ‘অসমের বন্যা-২০২৬ : পূর্ণাঙ্গ পরিস্থিতি মূল্যায়ন ও সহনশীল পুনরুদ্ধারের পথনির্দেশ’ শীর্ষক প্রতিবেদনটি প্রকাশ করা হয়েছে।
এই প্রতিবেদন যৌথ ভাবে তৈরি করেছেন আসাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক অরুণজ্যোতি নাথ, অদিতি নাথ, অর্ণব পাল ও অনিমেষ হাজরিকা। সঙ্গে ছিলেন কলম্বোর ইন্টারন্যাশনাল ওয়াটার ম্যানেজমেন্ট ইনস্টিটিউটের সুরজিৎ ঘোষ, রাঁচির বিড়লা ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজির স্নেহা কৌর ও অনুভা চৌধুরী এবং কলকাতার আদামাস বিশ্ববিদ্যালয়ের ঊষসী সরকার। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সাম্প্রতিক দশকগুলিতে উচ্চ অসমে আঘাত হানা অন্যতম ভয়াবহ এই বন্যায় শতাধিক প্রাণহানি, প্রায় ২.১২ লক্ষ মানুষের বাস্তুচ্যুতি এবং প্রায় ২১ হাজার হেক্টর কৃষিজমি প্লাবিত হয়েছে।
প্রতিবেদনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ হল, বন্যার সময় অসমে সামগ্রিকভাবে বৃষ্টির ঘাটতি ছিল। ১ জুন থেকে ২৯ জুলাই পর্যন্ত রাজ্যে স্বাভাবিক ৮৩৯.৬ মিলিমিটারের বিপরীতে বৃষ্টিপাত হয় ৫৯৪.৪ মিলিমিটার—ঘাটতি প্রায় ২৯ শতাংশ। অথচ ১৯ জুলাই নাগাল্যান্ডে স্বাভাবিকের তুলনায় ১৮১ শতাংশ বেশি বৃষ্টিপাত হয়। মোককচুং জেলায় এই অতিবৃষ্টির পরিমাণ ছিল স্বাভাবিকের তুলনায় ৪৯৩ শতাংশ বেশি। এই বিপুল জল পাহাড়ি ঢাল বেয়ে ডিকহৌ, দিশাং, জাঁজি ও ধনশিরির মতো দক্ষিণ তীরের উপনদীগুলিতে দ্রুত নেমে আসে। নদীগুলি বিপদসীমা অতিক্রম করে এবং বিভিন্ন জায়গায় পুরনো বাঁধ ভেঙে যায়। এমনকি ব্রহ্মপুত্রের মূল প্রবাহ সর্বোচ্চ জলস্তরে পৌঁছনোর আগেই উপনদীগুলিতে ভয়াবহ পরিস্থিতি তৈরি হয়। নাগাল্যান্ডের ডয়াং জলাধার থেকে জল ছাড়ার ঘটনাও ধনশিরি অববাহিকায় বন্যা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে।
গবেষকদের মতে, এই দুর্যোগ শুধুমাত্র অতিরিক্ত বৃষ্টির কারণে নয়। চরম বৃষ্টিপাতের পাশাপাশি মাটির অতিরিক্ত জল শোষণ ক্ষমতা হ্রাস, নাগাল্যান্ডের মোন জেলায় ধস, ধারণ ক্ষমতা পূর্ণ হওয়ায় জলাধার থেকে জল নি:সরণ, নদীতে পলি জমে তলদেশ ভরাট হওয়া, দুর্বল ও জরাজীর্ণ বাঁধ এবং জলাভূমি বিলুপ্ত হওয়ার মতো একাধিক কারণ একসঙ্গে মিলে এই ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। তাই আগামীতে বন্যা মোকাবিলায় উপগ্রহচিত্র ও ভৌগোলিক তথ্যের সাহায্যে অঞ্চলভিত্তিক আগাম সতর্কীকরণ ব্যবস্থা গড়ে তোলার সুপারিশ করা হয়েছে। শুধু নদীর জল কতটা বাড়বে তা নয়, বন্যায় কোন এলাকা ও কত মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারেন—আগাম সেই তথ্য জানানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
এছাড়া অসমের পাঁচটি ভৌগোলিক অঞ্চলের জন্য পৃথক বন্যা ব্যবস্থাপনা কৌশল, নদীভাঙনকে সরকারি ভাবে দুর্যোগ হিসেবে স্বীকৃতি, চরাঞ্চলের মানুষের জন্য ক্ষতিপূরণ ও ত্রাণ, জলাভূমি পুনরুদ্ধার, বাঁধের আধুনিকীকরণ এবং প্রতি বর্ষার পর উপগ্রহচিত্রের সাহায্যে ক্ষয়ক্ষতি মূল্যায়নের সুপারিশ করা হয়েছে।প্রতিবেদনটির সুপারিশগুলি রাষ্ট্রসংঘের ‘সেন্দাই ফ্রেমওয়ার্ক’ ও প্রধানমন্ত্রীর দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাসের ১০ দফা কর্মসূচির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।



