শিলচরে ভারতীয় শিক্ষণ মণ্ডলের উদ্যোগে ব্যাস পূজা ও গুরুপূর্ণিমা উদযাপন

Spread the news

বরাক তরঙ্গ, ৮ আগস্ট : ভারতীয় শিক্ষণ মণ্ডল, কাছাড় জেলা সমিতির উদ্যোগে শনিবার সন্ধ্যায় শিলচরের ডি.এন.এন.কে. বালিকা উচ্চতর মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে যথাযোগ্য মর্যাদা ও ভাবগম্ভীর পরিবেশে ব্যাস পূজা ও গুরুপূর্ণিমা উৎসব পালিত হয়।

প্রদীপ প্রজ্বালন এবং ভারতমাতা ও মহর্ষি ব্যাসদেবের পূজার মধ্য দিয়ে অনুষ্ঠানের সূচনা হয়। পরে বৈদিক মন্ত্রোচ্চারণ ও শ্লোকপাঠের মাধ্যমে মূল অনুষ্ঠান শুরু হয়।

অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য রাখেন ভারতীয় শিক্ষণ মণ্ডল, কাছাড় জেলা সমিতির সভাপতি ড. অভিজিৎ সাহা। তিনি ভারতীয় শিক্ষণ মণ্ডলের উদ্দেশ্য ও কর্মকাণ্ডের বিভিন্ন দিক তুলে ধরে বলেন, ভারতীয় জ্ঞান-পরম্পরা, মূল্যবোধ, সংস্কৃতি ও শিক্ষাচিন্তাকে সমাজের সর্বস্তরে পৌঁছে দেওয়া সংগঠনের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য। শিক্ষার মাধ্যমে একটি উন্নত সমাজ ও শক্তিশালী জাতি গড়ে তোলার উপরও তিনি গুরুত্ব আরোপ করেন।

গুরুপূর্ণিমার তাৎপর্য ব্যাখ্যা করতে গিয়ে ড. সাহা ভারতীয় ঐতিহ্যে গুরু-শিষ্য পরম্পরার গুরুত্ব তুলে ধরেন। তিনি বলেন, শিক্ষকের দায়িত্ব শুধু পাঠ্যপুস্তকের জ্ঞান প্রদানের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। ছাত্রছাত্রীদের নৈতিক, মানবিক ও দেশাত্মবোধের মূল্যবোধে সমৃদ্ধ করা এবং সমাজকে সঠিক দিশা দেখানোও শিক্ষকের গুরুত্বপূর্ণ কর্তব্য।

মহর্ষি ব্যাসদেবকে ভারতীয় জ্ঞান-পরম্পরার অন্যতম শ্রেষ্ঠ পুরুষ ও আদি গুরু হিসেবে উল্লেখ করে তাঁর অসামান্য অবদানের কথাও তুলে ধরেন ড. সাহা। পাশাপাশি জাতীয় শিক্ষানীতি (NEP) 2020-এর গুরুত্ব ব্যাখ্যা করে তিনি বলেন, এই শিক্ষানীতি যথাযথভাবে বাস্তবায়িত হলে দেশের শিক্ষাব্যবস্থা আরও শক্তিশালী ও সমৃদ্ধ হয়ে উঠবে।

অনুষ্ঠানের মুখ্য অতিথি ও প্রধান বক্তা হিসেবে বক্তব্য রাখেন গুরুচরণ বিশ্ববিদ্যালয়ের সংস্কৃত বিভাগের অধ্যাপক কেশব লুইতেল। তিনি ভারতীয় সভ্যতায় গুরু-শিষ্য পরম্পরার ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক গুরুত্ব বিস্তারিতভাবে তুলে ধরেন।

অধ্যাপক লুইতেল বলেন, গুরু শুধু শিষ্যকে জ্ঞান প্রদান করেন না, তাঁকে জীবনের সঠিক পথের সন্ধান দেন এবং উন্নতির পথে এগিয়ে যেতে দিশা দেখান। তাঁর মতে, মানুষের জীবনে পিতা-মাতাই প্রথম গুরু। তাঁরা সন্তানকে লালন-পালনের পাশাপাশি জীবনের প্রাথমিক শিক্ষা ও মূল্যবোধ প্রদান করেন। পরবর্তীতে শিক্ষক বা গুরু সেই শিক্ষাকে আরও পরিশীলিত করে শিষ্যকে জীবনের উচ্চতর লক্ষ্যে পৌঁছানোর পথ দেখান।

তিনি বলেন, যে ব্যক্তির কাছ থেকে আমরা জ্ঞান ও জীবনের কোনো না কোনো শিক্ষা লাভ করি, তিনিই আমাদের গুরু। গুরু-শিষ্য সম্পর্ক কোনো নির্দিষ্ট সম্প্রদায়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, বরং ভারতীয় সমাজ ও সংস্কৃতির বিভিন্ন পরম্পরায় এর গভীর উপস্থিতি রয়েছে।

জ্ঞানকে নিজের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে পরবর্তী প্রজন্মের মধ্যে ছড়িয়ে দেওয়াই গুরুর মহত্ত্বের পরিচয় বলে উল্লেখ করেন অধ্যাপক লুইতেল। তাঁর মতে, এই জ্ঞান হস্তান্তরের ধারাই সমাজ ও সভ্যতাকে প্রজন্মের পর প্রজন্ম এগিয়ে নিয়ে যায়।

মহর্ষি ব্যাসদেবের অবদান প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ব্যাসদেব বেদকে সংকলন ও বিভাজন করে চার বেদের রূপ দেন। পাশাপাশি পুরাণসাহিত্য ও মহাভারতের সঙ্গে তাঁর অবদান ভারতীয় জ্ঞান ও সংস্কৃতির ইতিহাসে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাঁর অবদানের ফলে ভারতীয় জ্ঞান-পরম্পরা সুসংবদ্ধ হয়ে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে প্রবাহিত হয়েছে।

অধ্যাপক লুইতেল প্রাচীন ভারতীয় শিক্ষাব্যবস্থার গৌরবময় ঐতিহ্যের কথাও তুলে ধরেন। তিনি বলেন, প্রাচীন ভারতে শিক্ষা কেবল পুঁথিগত জ্ঞান অর্জনের মাধ্যম ছিল না। চরিত্র, নৈতিকতা, কর্তব্যবোধ, সংস্কৃতি ও জীবনদর্শন গড়ে তোলাও ছিল শিক্ষার অন্যতম উদ্দেশ্য।

তাঁর বক্তব্যে উঠে আসে, পাশ্চাত্য শিক্ষাব্যবস্থার প্রভাবের ফলে ভারতীয় নিজস্ব শিক্ষাচিন্তা, মূল্যবোধ ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য অনেকটাই আড়ালে চলে গেছে। এই পরিস্থিতিতে ছাত্রসমাজকে ভারতীয় শিক্ষা-পরম্পরা, সংস্কৃতি, ইতিহাস ও মূল্যবোধের সঙ্গে পরিচিত করে তোলা শিক্ষকসমাজের অন্যতম প্রধান দায়িত্ব।

তিনি বলেন, আধুনিক শিক্ষার পাশাপাশি ছাত্রছাত্রীদের নিজেদের শিকড় ও ঐতিহ্য সম্পর্কে সচেতন করে তুলতে হবে। এর মাধ্যমেই আত্মবিশ্বাসী, নৈতিক ও দায়িত্বশীল প্রজন্ম গড়ে তোলা সম্ভব।

শিক্ষার প্রকৃত উদ্দেশ্য সম্পর্কে বলতে গিয়ে অধ্যাপক লুইতেল বলেন, শিক্ষা অর্জনের পর সেই জ্ঞান সমাজ ও দেশের কল্যাণে কাজে লাগানোই শিক্ষার প্রকৃত সার্থকতা। তিনি বর্তমান প্রজন্মের ছাত্রছাত্রীদের জ্ঞানার্জনের পাশাপাশি নিজেদের সামাজিক ও জাতীয় কর্তব্য সম্পর্কে সচেতন হওয়ার আহ্বান জানান।

গুরু-শিষ্য পরম্পরাকে নবপ্রজন্মের মধ্যে পুনরুজ্জীবিত করার উপরও তিনি বিশেষ গুরুত্ব দেন। ভারতীয় প্রাচীন শিক্ষা-ব্যবস্থার মূল্যবোধ ও গুরুর প্রতি শ্রদ্ধার ঐতিহ্যকে নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়ার আহ্বান জানান তিনি। তাঁর মতে, ভারতীয় জ্ঞান, শিক্ষা, সংস্কৃতি ও মূল্যবোধের সঙ্গে আধুনিক শিক্ষার সমন্বয় ঘটিয়েই একটি উন্নত ও আদর্শ সমাজ নির্মাণ সম্ভব।

অনুষ্ঠানের সার্বিক সঞ্চালনা করেন ভারতীয় শিক্ষণ মণ্ডল, কাছাড় জেলা সমিতির সম্পাদক ড. বিশ্ববিজয় ভট্টাচার্য। তিনি অনুষ্ঠানের বিভিন্ন পর্ব সুচারুভাবে পরিচালনা করেন এবং শেষে ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেন। তাঁর ধন্যবাদ জ্ঞাপনের মাধ্যমে অনুষ্ঠানটির সমাপ্তি ঘটে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *