জাতীয় বাজারে নতুন সম্ভাবনার দুয়ার খুলছে কাছাড়ের আনারস

Spread the news

এপেডার বায়ার-সেলার মিটে কৃষক-ক্রেতার সরাসরি সংযোগ, রপ্তানি ও মূল্য সংযোজনের ওপর জোর

বরাক তরঙ্গ, ২ জুলাই : বরাক উপত্যকার অন্যতম জনপ্রিয় কৃষিপণ্য কাছাড়ের আনারসকে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক বাজারে আরও বিস্তৃতভাবে পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্যে গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ নিল অ্যাগ্রিকালচারাল অ্যান্ড প্রসেসড ফুড প্রোডাক্টস এক্সপোর্ট ডেভেলপমেন্ট অথরিটি (এপেডা)। বৃহস্পতিবার শিলচরে অনুষ্ঠিত ‘পোস্ট হারভেস্ট ম্যানেজমেন্ট প্রোগ্রাম অ্যান্ড বায়ার-সেলার মিট অন কাছাড় পাইনঅ্যাপল, অসম’-এ কৃষক, রপ্তানিকারক, ক্রেতা, কৃষি উদ্যোক্তা ও সরকারি আধিকারিকদের অংশগ্রহণে কাছাড়ের আনারসের বিপণন, মূল্য সংযোজন ও রপ্তানি সম্ভাবনা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়।
ভারতের বাণিজ্য ও শিল্প মন্ত্রকের অধীনস্থ এপেডার উদ্যোগে এবং অসম সরকারের কাছাড় জেলা প্রশাসনের সহযোগিতায় আয়োজিত এই কর্মসূচির উদ্বোধন করেন খাদ্য, গণবণ্টন ও উপভোক্তা বিষয়ক, গৃহনির্মাণ ও নগর বিষয়ক এবং সমবায় দপ্তরের মন্ত্রী কৌশিক রায়।
উদ্বোধনী ভাষণে মন্ত্রী বলেন, বরাক উপত্যকার অর্থনীতির অন্যতম ভিত্তি কৃষি, আর সেই কৃষির গর্ব কাছাড়ের প্রাকৃতিকভাবে উৎপাদিত আনারস। এর স্বাদ, গুণমান ও স্বকীয়তার জন্য ইতিমধ্যেই এই আনারস বিশেষ পরিচিতি অর্জন করেছে। এখন এই কৃষিপণ্যকে বৃহত্তর দেশীয় ও আন্তর্জাতিক বাজারে পৌঁছে দেওয়ার উপযুক্ত সময় এসেছে।

তিনি বলেন, ফসল কাটার পর বৈজ্ঞানিক ব্যবস্থাপনা, আধুনিক সংরক্ষণ প্রযুক্তি, মূল্য সংযোজন এবং উৎপাদকদের সঙ্গে বাজারের সরাসরি সংযোগ গড়ে তুলতে পারলে কৃষকদের আয় উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে। পাশাপাশি ফসল-পরবর্তী ক্ষয়ক্ষতিও অনেকাংশে কমানো সম্ভব হবে। কৃষকদের উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্য মূল্য নিশ্চিত করতে সরকার ও সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলি সমন্বিতভাবে কাজ করছে বলেও তিনি জানান।

অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন কাছাড়ের জেলা আয়ুক্ত রাহুলকুমার গুপ্ত, অতিরিক্ত জেলা আয়ুক্ত রক্তিম বরুয়া ও ধ্রুবজ্যোতি পাঠক, লক্ষীপুরের সিডিসি পীযূষ রাজ, জেলা কৃষি আধিকারিক ডাঃ রাহুল চক্রবর্তী, নাবার্ডের উপ-মহাপ্রবন্ধক ইভান টি. মুংসং, সমাজকর্মী সঞ্জয় ঠাকুর, এপেডার বিজনেস ডেভেলপমেন্ট ম্যানেজার ডাঃ সাজু অধিকারী, অসম গৌরব মন্থন মার, লক্ষীপুর পৌরসভার প্রতিনিধি মিনাল কান্তি দাস-সহ বিভিন্ন এফপিও, কৃষক প্রতিনিধি, রপ্তানিকারক, প্রসেসর এবং দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আগত ক্রেতারা।

বক্তারা বলেন, উর্বর জমি, অনুকূল আবহাওয়া ও প্রাকৃতিক চাষপদ্ধতির কারণে কাছাড় কৃষিক্ষেত্রে সম্ভাবনাময় জেলা হিসেবে পরিচিত। এখানকার আনারস ইতিমধ্যেই স্বাদ ও গুণমানের জন্য বাজারে আলাদা পরিচিতি তৈরি করেছে। উন্নত পোস্ট-হারভেস্ট ব্যবস্থাপনা, বৈজ্ঞানিক প্রক্রিয়াকরণ, সংগঠিত বিপণন এবং মূল্য সংযোজনভিত্তিক শিল্প গড়ে উঠলে কৃষকদের আয়ের নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হবে এবং গ্রামীণ অর্থনীতিও আরও শক্তিশালী হবে।

কর্মসূচির অন্যতম আকর্ষণ ছিল কৃষক ও প্রাতিষ্ঠানিক ক্রেতাদের মধ্যে সরাসরি মতবিনিময়। কাছাড়ের কৃষকেরা তাঁদের উৎপাদিত তাজা আনারসের পাশাপাশি বিভিন্ন মসলা ও কৃষিজ পণ্য প্রদর্শন করেন। বিভিন্ন রাজ্য থেকে আগত ক্রেতারা পণ্যের গুণমান পরিদর্শনের পাশাপাশি সংগ্রহ, বিপণন ও দীর্ঘমেয়াদি ব্যবসায়িক সম্ভাবনা নিয়ে কৃষকদের সঙ্গে আলোচনা করেন। অংশগ্রহণকারীদের মতে, এ ধরনের সরাসরি যোগাযোগ মধ্যস্বত্বভোগীর ওপর নির্ভরতা কমিয়ে কৃষকদের ন্যায্য মূল্য নিশ্চিত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।

কারিগরি অধিবেশনে এপেডার উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় আঞ্চলিক কার্যালয়ের বিজনেস ডেভেলপমেন্ট ম্যানেজার ডাঃ সাজু অধিকারী পোস্ট-হারভেস্ট ব্যবস্থাপনা, গ্রেডিং, প্যাকেজিং, সংরক্ষণ ও বাজারজাতকরণ নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেন। এছাড়া হরিয়ানার সোনিপতে অবস্থিত ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব ফুড টেকনোলজি, এন্টারপ্রেনারশিপ অ্যান্ড ম্যানেজমেন্ট (নিফটেম)-এর অধ্যাপক ডাঃ সুনীল পারেখ ‘পোস্ট হারভেস্ট ম্যানেজমেন্ট অ্যান্ড ভ্যালু অ্যাডিশন অব পাইনঅ্যাপল’ বিষয়ক বিশেষ বক্তৃতায় আনারসের সংরক্ষণকাল বৃদ্ধি, ক্ষয়ক্ষতি কমানো, মূল্য সংযোজিত পণ্য উৎপাদন এবং আন্তর্জাতিক মান বজায় রাখার বিভিন্ন দিক তুলে ধরেন।
কৃষি বিশেষজ্ঞদের মতে, উৎপাদন বৃদ্ধির পাশাপাশি এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ বাজার সম্প্রসারণ ও উন্নত বিপণন ব্যবস্থা গড়ে তোলা। সেই দৃষ্টিকোণ থেকে এ ধরনের বায়ার-সেলার মিট কৃষকদের সামনে নতুন ব্যবসায়িক সম্ভাবনার দ্বার খুলে দেবে। উৎপাদক, ক্রেতা ও সরকারি সংস্থার সমন্বিত উদ্যোগের মাধ্যমে কাছাড়ের আনারস ভবিষ্যতে শুধু অসম নয়, জাতীয় ও আন্তর্জাতিক বাজারেও আরও শক্ত অবস্থান তৈরি করবে বলেই আশাবাদ ব্যক্ত করা হয়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *