।। বিধায়ক দাশ পুরকায়স্থ ।।
২৫ জুন : খাদ্য নিয়ে বিতর্ক ভারতীয় সমাজে নতুন নয়। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলিতে এই বিতর্কের প্রকৃতি বদলেছে। একসময় আলোচনা হতো কে কী খায়, কোন অঞ্চলের মানুষ কী ধরনের খাদ্যে অভ্যস্ত, অথবা কোন খাদ্য কোন উৎসবের সঙ্গে জড়িত। এখন ক্রমশ সেই আলোচনার জায়গা দখল করছে অন্য প্রশ্ন—কোন খাদ্য “সঠিক”, কোন খাদ্য “ভুল”, কোন খাদ্য “গ্রহণযোগ্য”, কোন খাদ্য “অগ্রহণযোগ্য”। এর পাশাপাশি উঠে এসেছে আরেকটি বহুল প্রচারিত দাবি—ভারতের বিপুল সংখ্যক মানুষ নাকি প্রোটিনের ঘাটতিতে ভুগছেন। ফলে খাদ্য নিয়ে জনপরিসরের বিতর্ক ক্রমশ পুষ্টিবিজ্ঞান, সংস্কৃতি, রাজনীতি, অর্থনীতি এবং ব্যক্তিস্বাধীনতার এক জটিল সংযোগস্থলে এসে দাঁড়িয়েছে।
প্রথমেই একটি বিষয় পরিষ্কার করা প্রয়োজন। ভারতে “৭৩ শতাংশ মানুষ প্রোটিন ঘাটতিতে ভোগেন”—এই বহুল উদ্ধৃত দাবিটি কোনো জাতীয় স্বাস্থ্য সমীক্ষার সিদ্ধান্ত নয়। এটি মূলত একটি বেসরকারি সমীক্ষার ফলাফল, যেখানে মানুষের খাদ্যাভ্যাস সম্পর্কে ধারণা নেওয়া হয়েছিল। ভারতের সরকারি পুষ্টি-তথ্য অন্য একটি বাস্তবতার দিকে ইঙ্গিত করে। সেখানে প্রধান সমস্যা হিসেবে উঠে আসে অপুষ্টি, খাদ্যের বৈচিত্র্যের অভাব, রক্তাল্পতা, শিশুদের বৃদ্ধি-সংক্রান্ত সমস্যা এবং অর্থনৈতিক বৈষম্যের কারণে সুষম খাদ্য না পাওয়া। অর্থাৎ ভারতের সমস্যা কেবল প্রোটিন নয়; বরং সামগ্রিক পুষ্টি।
এই বাস্তবতা বোঝা জরুরি, কারণ খাদ্যকে যদি আমরা কেবল একটি পুষ্টি উপাদানের মধ্যে সীমাবদ্ধ করি, তাহলে মানুষকে বুঝতে ব্যর্থ হব। মানুষ কখনও কেবল প্রোটিন, কার্বোহাইড্রেট বা ভিটামিনের হিসাব কষে খাদ্য নির্বাচন করে না। খাদ্যের সঙ্গে জড়িয়ে থাকে স্মৃতি, পরিবার, সংস্কৃতি, জলবায়ু, ভূগোল এবং পরিচয়।
একজন বাঙালি মাছ খান না শুধুমাত্র প্রাণিজ প্রোটিনের জন্য। মাছ তাঁর কাছে নদীর স্মৃতি, পারিবারিক ঐতিহ্য, উৎসবের আনন্দ এবং দৈনন্দিন জীবনের অংশ। ভাত কেবল শর্করা নয়; বাংলার কৃষিসভ্যতার উত্তরাধিকার। ডাল কেবল উদ্ভিজ্জ প্রোটিন নয়; বহু শতাব্দীর খাদ্যসংস্কৃতির ধারাবাহিকতা।
বস্তুত খাদ্যাভ্যাসকে বোঝার জন্য প্রথমে ভূগোলকে বুঝতে হয়। যে অঞ্চলে নদী আছে, সেখানে মাছ খাদ্যের অংশ হবে। যেখানে গবাদি পশু পালন সহজ, সেখানে দুগ্ধজাত খাদ্যের গুরুত্ব বাড়বে। যেখানে পাহাড়ি জলবায়ু, সেখানে খাদ্যের ধরন অন্যরকম হবে। খাদ্যসংস্কৃতি কোনো রাজনৈতিক ঘোষণাপত্রের মাধ্যমে তৈরি হয় না; তা গড়ে ওঠে দীর্ঘ ঐতিহাসিক অভিযোজনের মাধ্যমে।
এই কারণেই পশ্চিমবঙ্গ, বাংলাদেশ, আসাম, ত্রিপুরা, মেঘালয় বা অরুণাচলে বসবাসকারী বাঙালিদের খাদ্যাভ্যাসে মিল যেমন আছে, তেমনি পার্থক্যও আছে। বরাক উপত্যকার বাঙালির খাদ্যে স্থানীয় প্রভাব আছে, ত্রিপুরার বাঙালির খাদ্যে পূর্ববঙ্গীয় ঐতিহ্যের সঙ্গে উপজাতীয় অঞ্চলের সংস্পর্শের প্রভাব আছে, আবার মেঘালয় ও অরুণাচলের বাঙালিরা নিজেদের পরিবেশের সঙ্গে খাপ খাইয়ে খাদ্যতালিকায় নানা পরিবর্তন এনেছেন। তবুও ভাত, মাছ, ডাল, শাকসবজি—এই মূল কাঠামোটি অদৃশ্য হয়নি। কারণ খাদ্যসংস্কৃতি পরিবর্তিত হয়, কিন্তু সম্পূর্ণ মুছে যায় না।
বাংলার খাদ্যঐতিহ্যের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো সহাবস্থান। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে এখানে বৈষ্ণব ও শাক্ত—উভয় ধারাই পাশাপাশি বিকশিত হয়েছে। একদিকে নিরামিষভোজনের ঐতিহ্য, অন্যদিকে মাছ-মাংস গ্রহণের ঐতিহ্য। কিন্তু এই দুই ধারার সহাবস্থানই ছিল বাংলার বৈশিষ্ট্য। বাংলার ইতিহাসে নিরামিষভোজীদের জোর করে মাছ খাওয়ানোর আন্দোলন যেমন দেখা যায় না, তেমনি আমিষভোজীদের জোর করে নিরামিষ বানানোরও কোনো ধারাবাহিক ইতিহাস নেই। সহনশীলতাই ছিল মূল বৈশিষ্ট্য।
এখানেই এসে খাদ্য নিয়ে বর্তমান বিতর্কের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি সামনে আসে—একজন মানুষ কী খাবেন, সেই সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার কার?
এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে দেখতে হবে একজন মানুষের খাদ্যাভ্যাস কীভাবে গড়ে ওঠে। ব্যক্তিগত রুচি, পারিবারিক ঐতিহ্য, ধর্মীয় বিশ্বাস, জলবায়ু, ভৌগোলিক পরিবেশ, শারীরিক গঠন, স্বাস্থ্যগত প্রয়োজন এবং অর্থনৈতিক সামর্থ্য—সব মিলিয়েই খাদ্যপছন্দ তৈরি হয়। একজন বৃদ্ধ মানুষের খাদ্যতালিকা একজন কিশোরের মতো হবে না। একজন পাহাড়ি অঞ্চলের বাসিন্দার খাদ্যাভ্যাস নদীবিধৌত সমতলের মানুষের মতো হবে না। একজন দিনমজুরের বাস্তবতা একজন উচ্চবিত্ত পেশাজীবীর বাস্তবতা থেকে ভিন্ন হবে।
তাই প্রশ্ন জাগে—ভারতের সংবিধান কি কোনো ব্যক্তি, সংগঠন, সমাজ বা রাষ্ট্রকে এই অধিকার দিয়েছে যে তারা সকল নাগরিকের জন্য একটিমাত্র খাদ্য-মানদণ্ড নির্ধারণ করবে?
রাষ্ট্রের কাজ অপুষ্টির বিরুদ্ধে লড়াই করা। রাষ্ট্রের কাজ শিশুদের সুষম খাদ্য পৌঁছে দেওয়া। রাষ্ট্রের কাজ জনস্বাস্থ্য উন্নত করা। কিন্তু গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের কাজ মানুষের ব্যক্তিগত খাদ্যপছন্দ নির্ধারণ করা নয়। কারণ খাদ্য কেবল স্বাস্থ্যগত বিষয় নয়; এটি ব্যক্তিস্বাধীনতারও অংশ।
এই আলোচনার সঙ্গে একটি অর্থনৈতিক বাস্তবতাও জড়িত। খাদ্যনীতি কখনও কেবল খাদ্যনীতি নয়; এটি কৃষিনীতি, শিল্পনীতি এবং কর্মসংস্থানের নীতিও। পশ্চিমবঙ্গে ডিম উৎপাদন ও পোলট্রি শিল্পের সঙ্গে যুক্ত হাজার হাজার ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা, খামার মালিক, শ্রমিক, পরিবহণ কর্মী এবং খাদ্য সরবরাহকারী। যদি বিদ্যালয়ভিত্তিক খাদ্যব্যবস্থায় স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত খাদ্যের পরিবর্তে এমন খাদ্যকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয় যা বাইরে থেকে আনতে হয়, তাহলে তার প্রভাব কেবল শিশুদের থালায় নয়; সমগ্র স্থানীয় অর্থনীতিতে পড়তে পারে। স্থানীয় উৎপাদনের উপর দাঁড়ানো খাদ্যব্যবস্থা সাধারণত বেশি স্থিতিশীল, পরিবহণ-নির্ভরতা কম এবং স্থানীয় কর্মসংস্থানকে শক্তিশালী করে।
প্রথমেই একটি বিষয় পরিষ্কার করা প্রয়োজন। ভারতে “৭৩ শতাংশ মানুষ প্রোটিন ঘাটতিতে ভোগেন”—এই বহুল উদ্ধৃত দাবিটি কোনো জাতীয় স্বাস্থ্য সমীক্ষার সিদ্ধান্ত নয়। এটি মূলত একটি বেসরকারি সমীক্ষার ফলাফল, যেখানে মানুষের খাদ্যাভ্যাস সম্পর্কে ধারণা নেওয়া হয়েছিল। ভারতের সরকারি পুষ্টি-তথ্য অন্য একটি বাস্তবতার দিকে ইঙ্গিত করে। সেখানে প্রধান সমস্যা হিসেবে উঠে আসে অপুষ্টি, খাদ্যের বৈচিত্র্যের অভাব, রক্তাল্পতা, শিশুদের বৃদ্ধি-সংক্রান্ত সমস্যা এবং অর্থনৈতিক বৈষম্যের কারণে সুষম খাদ্য না পাওয়া। অর্থাৎ ভারতের সমস্যা কেবল প্রোটিন নয়; বরং সামগ্রিক পুষ্টি।
খাদ্যনীতির সঙ্গে তাই সাংস্কৃতিক প্রতিনিধিত্বের প্রশ্নও জড়িত। একটি অঞ্চলের খাদ্যতালিকা সেই অঞ্চলের ইতিহাস ও সমাজের প্রতিফলন। ফলে কোনো খাদ্যনীতি নির্ধারণের সময় স্থানীয় খাদ্যসংস্কৃতি এবং জনগোষ্ঠীর বাস্তব অভ্যাসকে গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। অন্যথায় খাদ্যনীতি মানুষের কাছে কল্যাণমূলক উদ্যোগের পরিবর্তে সাংস্কৃতিক হস্তক্ষেপ হিসেবে প্রতিভাত হতে পারে।
তবে এই সমগ্র আলোচনার কেন্দ্রে থাকা উচিত একটি বিষয়—শিশুদের পুষ্টি। কারণ একটি অপুষ্ট শিশুর ক্ষতি কেবল একটি পরিবারের ক্ষতি নয়। সেটি ভবিষ্যতের একজন শিক্ষক, বিজ্ঞানী, চিকিৎসক, প্রকৌশলী, শিল্পী বা উদ্যোক্তার সম্ভাবনার ক্ষতি। অপুষ্টি শুধু উচ্চতা বা ওজনের সমস্যা নয়; এটি শিক্ষণক্ষমতা, মনোযোগ, উৎপাদনশীলতা এবং দীর্ঘমেয়াদি মানবসম্পদ গঠনের সঙ্গেও যুক্ত।
একটি জাতির সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ তার মানবসম্পদ। যদি লক্ষ লক্ষ শিশু পর্যাপ্ত পুষ্টি ছাড়া বড় হয়, তাহলে তার মূল্য সমগ্র সমাজকে দিতে হয়। তাই শিশু-পুষ্টি কোনো নিরামিষ-আমিষ বিতর্ক নয়; এটি জাতীয় উন্নয়নের প্রশ্ন।
এই প্রসঙ্গে স্বামী বিবেকানন্দের দৃষ্টিভঙ্গি বিশেষভাবে স্মরণীয়। তাঁকে অনেক সময় নিরামিষ-আমিষ বিতর্কের একপক্ষের প্রতিনিধি হিসেবে দেখানোর চেষ্টা করা হয়, কিন্তু তাঁর চিন্তা ছিল অনেক বিস্তৃত। তিনি ধর্মকে রান্নাঘরে বন্দি করার বিরোধিতা করেছিলেন। তাঁর কাছে মানুষের আধ্যাত্মিকতা বা চরিত্রের বিচার খাদ্যাভ্যাসের ভিত্তিতে হওয়া উচিত নয়। তিনি প্রশ্ন তুলেছিলেন—এক টুকরো মাংস খাওয়ার জন্য কি ঈশ্বরের কৃপা বন্ধ হয়ে যাবে? আবার অন্যদিকে তিনি দুর্বল ও অপুষ্ট জাতির ভবিষ্যৎ নিয়েও উদ্বিগ্ন ছিলেন। তাঁর কাছে মূল প্রশ্ন ছিল জাতির শক্তি, কর্মক্ষমতা এবং আত্মবিশ্বাস। তিনি নিজে আমিষভোজী ছিলেন, কিন্তু কখনও আমিষভোজনকে ধর্মীয় শ্রেষ্ঠত্বের মানদণ্ডে পরিণত করেননি। এমনকি মানুষের বৃহত্তর কল্যাণের জন্য প্রয়োজনে নিজের খাদ্যাভ্যাস পরিবর্তন করাকেও তিনি গ্রহণযোগ্য বলে মনে করতেন। অর্থাৎ খাদ্যের চেয়ে মানুষ তাঁর কাছে বড় ছিল।
সম্ভবত এই দৃষ্টিভঙ্গিই আজকের বিতর্কে সবচেয়ে প্রাসঙ্গিক। কারণ খাদ্য নিয়ে মতভেদ থাকতে পারে, কিন্তু একটি সভ্য সমাজে “তুমি কী খাও?” প্রশ্নটি কখনও “তুমি কে?” প্রশ্নের বিকল্প হতে পারে না।
শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটি ডিম না রাজমা, মাছ না পনির, নিরামিষ না আমিষ—এসবের নয়। প্রশ্নটি হলো, আমরা কি এমন একটি সমাজ গড়তে পারব যেখানে প্রত্যেক শিশু পর্যাপ্ত পুষ্টি পাবে, প্রত্যেক মানুষ নিজের বাস্তবতা ও সংস্কৃতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে খাদ্য বেছে নেওয়ার স্বাধীনতা পাবে, এবং খাদ্য বিভেদের নয়, সুস্থতা ও মানবিক বিকাশের মাধ্যম হয়ে উঠবে?
যদি সেই লক্ষ্য অর্জন করা যায়, তাহলে থালার বিষয়টি আর কেবল খাদ্যের প্রশ্ন থাকবে না; সেটি হয়ে উঠবে স্বাধীনতা, মর্যাদা এবং ভবিষ্যতের প্রশ্ন।



