১৯ মে : বরাকের ভাষা আন্দোলন, আত্মপরিচয়ের সংগ্রাম ও ইতিহাসের রক্তাক্ত আলোকবর্তিকা

Spread the news

।। এসএম জাহির আব্বাস ।।
(সাংবাদিক, শ্রীভূমি)
১৯ মে : বরাক উপত্যকার ইতিহাসে এক বেদনা-বিধুর অথচ গৌরবময় দিন ১৯শে মে। এই দিনটি শুধু একটি স্মরণ দিবস নয়; এটি আত্মমর্যাদার সংগ্রাম, সাংস্কৃতিক অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই এবং মাতৃভাষার প্রতি এক অমলিন ভালোবাসার প্রতীক। ১৯৬১ সালের ১৯ মে শিলচর রেলস্টেশনে বাংলা ভাষার স্বীকৃতির দাবিতে আন্দোলনরত নিরস্ত্র মানুষের ওপর পুলিশের গুলিবর্ষণে প্রাণ হারান এগারোজন ভাষা সৈনিক। তাঁদের আত্মত্যাগের মধ্য দিয়েই ভারতবর্ষের ভাষা আন্দোলনের ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে লেখা হয় বরাকের নাম।

আজ, ৬৫ বছর পরেও ১৯ মে কেবল ইতিহাসের একটি তারিখ হয়ে নেই। এটি বরাকের বাঙালির আত্মপরিচয়ের সঙ্গে মিশে থাকা এক আবেগ, এক চেতনা, এক প্রতিরোধের প্রতীক।

ভাষা কেবল শব্দ নয়, অস্তিত্বের পরিচয় : ভাষা কোনো সাধারণ যোগাযোগের মাধ্যম নয়। ভাষা একটি জাতির সংস্কৃতি, ইতিহাস, সাহিত্য, চিন্তা ও আত্মার পরিচায়ক। মানুষ তার মাতৃভাষার মধ্য দিয়েই প্রথম পৃথিবীকে চিনতে শেখে, অনুভূতি প্রকাশ করতে শেখে, সম্পর্ক গড়ে তোলে। তাই ভাষার ওপর আঘাত মানে একটি জনগোষ্ঠীর অস্তিত্ব ও আত্মপরিচয়ের ওপর আঘাত।
ভারত স্বাধীন হওয়ার পর ভাষাভিত্তিক রাজ্য পুনর্গঠনের প্রক্রিয়া শুরু হয়। সেই সময় অসমেও ভাষাকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক ও সামাজিক উত্তেজনা বাড়তে থাকে। ১৯৬০ সালে তৎকালীন অসম সরকার অসমিয়াকে রাজ্যের একমাত্র সরকারি ভাষা করার উদ্যোগ নেয়। “অসম অফিসিয়াল ল্যাঙ্গুয়েজ অ্যাক্ট” পাশ হওয়ার পর বরাক উপত্যকার বাংলাভাষী মানুষের মধ্যে গভীর উদ্বেগ দেখা দেয়।

কারণ, কাছাড়, শ্রীভূমি (করিমগঞ্জ) ও হাইলাকান্দি এই তিন জেলা নিয়ে গঠিত বরাক উপত্যকার অধিকাংশ মানুষের মাতৃভাষা ছিল বাংলা। প্রশাসন, শিক্ষা ও সামাজিক জীবনে দীর্ঘদিন ধরে বাংলা ভাষার ব্যবহার ছিল স্বাভাবিক বাস্তবতা। কিন্তু নতুন ভাষানীতির ফলে বাংলাভাষী মানুষের মনে আশঙ্কা তৈরি হয় যে, তাঁদের ভাষা ধীরে ধীরে সরকারি ক্ষেত্র থেকে সরিয়ে দেওয়া হবে এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্ম নিজেদের মাতৃভাষা ব্যবহারের অধিকার থেকেও বঞ্চিত হবে।

আন্দোলনের সূচনা : প্রতিবাদ থেকে গণঅভ্যুত্থান
অসম সরকারের ভাষানীতির বিরুদ্ধে বরাক উপত্যকায় শুরু হয় প্রবল গণআন্দোলন। গড়ে ওঠে “ভাষা সংগ্রাম সমিতি”। ছাত্র, শিক্ষক, সাহিত্যিক, শ্রমিক, ব্যবসায়ী— সমাজের সর্বস্তরের মানুষ একত্রিত হন। আন্দোলনের মূল দাবি ছিল স্পষ্ট— বরাক উপত্যকায় বাংলা ভাষাকে সরকারি ভাষার মর্যাদা দিতে হবে।

সেই সময় গোটা বরাক যেন এক আবেগে জেগে উঠেছিল। শহর থেকে গ্রাম— সর্বত্র সভা, মিছিল, প্রতিবাদ কর্মসূচি চলতে থাকে। মানুষ উপলব্ধি করেছিলেন, এটি কেবল ভাষার প্রশ্ন নয়; এটি তাঁদের ভবিষ্যৎ ও আত্মপরিচয়ের প্রশ্ন।

১৯৬১ সালের মে মাসে আন্দোলন আরও তীব্র আকার ধারণ করে। ভাষা সংগ্রাম সমিতির ডাকে শুরু হয় সত্যাগ্রহ কর্মসূচি। ১৯ মে শিলচর রেলস্টেশনে হাজার হাজার মানুষ শান্তিপূর্ণ অবস্থান বিক্ষোভে অংশ নেন। তাঁদের হাতে ছিল না কোনো অস্ত্র; ছিল কেবল মাতৃভাষার অধিকার রক্ষার দৃঢ় প্রত্যয়।

রক্তাক্ত ১৯ মে : শিলচর রেলস্টেশনের সেই বিকেল
১৯ মে, ১৯৬১। দুপুর গড়িয়ে বিকেল। শিলচর রেলস্টেশনে চলছিল শান্তিপূর্ণ সত্যাগ্রহ। আন্দোলনকারীরা রেল অবরোধ করে ভাষার দাবিতে স্লোগান দিচ্ছিলেন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের নামে হঠাৎই পুলিশ গুলি চালায় নিরস্ত্র মানুষের ওপর।

মুহূর্তের মধ্যে রেলস্টেশন পরিণত হয় রক্তাক্ত প্রান্তরে। চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে আতঙ্ক, আর্তনাদ ও রক্তের ধারা।

সেদিন শহিদ হন  কমলা ভট্টাচার্য-চণ্ডীচরণ সূত্রধর-কুমুদ রঞ্জন দাস-সত্যেন্দ্র দেব-সুকোমল পুরকায়স্থ-বীরেন্দ্র সূত্রধর-তরণী দেবনাথ-কানাইলাল নিয়োগী-হিতেশ বিশ্বাস-সুনীল সরকার-শচীন্দ্র পাল ভারতের ভাষা আন্দোলনের ইতিহাসে কমলা ভট্টাচার্য ছিলেন প্রথম মহিলা ভাষা শহিদ। মাত্র ষোলো বছরের এক কিশোরী নিজের মাতৃভাষার জন্য প্রাণ দিয়েছিলেন যা আজও আবেগে নাড়া দেয় গোটা বরাককে।

সেই দিনের রক্তাক্ত ঘটনা গোটা দেশে তীব্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করে। প্রতিবাদের ঝড় ওঠে বিভিন্ন মহলে। শেষ পর্যন্ত জনচাপের মুখে অসম সরকার বরাক উপত্যকায় বাংলা ভাষাকে সরকারি ভাষা হিসেবে স্বীকৃতি দিতে বাধ্য হয়। ভাষা শহিদদের আত্মত্যাগ বৃথা যায়নি।

১৯ মে ও ২১ ফেব্রুয়ারি : দুই বাংলার দুই গর্ব
বাংলাদেশের ২১ ফেব্রুয়ারির ভাষা আন্দোলন আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে বিশ্বজুড়ে স্বীকৃতি পেয়েছে। কিন্তু বরাকের ১৯ মে আন্দোলনও সমান গুরুত্বপূর্ণ এক অধ্যায়। দুই আন্দোলনের মূল চেতনা একই মাতৃভাষার মর্যাদা ও অধিকার রক্ষা।

তবে বরাকের ভাষা আন্দোলনের বিশেষ তাৎপর্য হলো এটি স্বাধীন ভারতের ভেতরে সংঘটিত এক গণতান্ত্রিক ভাষা আন্দোলন। এখানে মানুষ তাঁদের সাংবিধানিক অধিকারের দাবিতে আন্দোলনে নেমেছিলেন এবং সেই অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য প্রাণ বিসর্জন দিয়েছিলেন।

বর্তমান প্রেক্ষাপট : আমরা কোথায় দাঁড়িয়ে?
আজকের দিনে দাঁড়িয়ে প্রশ্ন জাগে— ভাষা শহিদদের সেই আত্মত্যাগের মর্যাদা আমরা কতটা রক্ষা করতে পেরেছি?
প্রযুক্তিনির্ভর আধুনিক সমাজে বাংলা ভাষার ব্যবহার ধীরে ধীরে সংকুচিত হচ্ছে। অনেক পরিবারে নতুন প্রজন্ম বাংলা পড়তে বা লিখতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে না। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিকৃত ভাষার ব্যবহার বাড়ছে। বাংলা সাহিত্য, বইপড়া ও সংস্কৃতিচর্চার প্রতিও আগ্রহ কমছে।

ইংরেজি বা অন্যান্য ভাষা শেখা অবশ্যই প্রয়োজন। বিশ্বায়নের যুগে বহুভাষিক হওয়া সময়ের দাবি। কিন্তু মাতৃভাষাকে অবহেলা করে নয়। কারণ, যে জাতি নিজের ভাষাকে সম্মান করতে জানে না, সে জাতি কখনও সাংস্কৃতিকভাবে শক্তিশালী হতে পারে না।

১৯ মে আমাদের শেখায় ভাষা মানে আত্মপরিচয়। ভাষা মানে শিকড়। ভাষা হারিয়ে গেলে ইতিহাস হারিয়ে যায়, সংস্কৃতি হারিয়ে যায়, মানুষ নিজের অস্তিত্বের সঙ্গেই বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে।

নতুন প্রজন্মের দায়িত্ব :
আজকের তরুণ সমাজের কাছে ১৯ মে শুধুমাত্র আনুষ্ঠানিক স্মরণ নয়; এটি ইতিহাস জানার এবং দায়িত্ব নেওয়ার দিন। ভাষা শহিদদের আত্মত্যাগ তখনই সার্থক হবে, যখন নতুন প্রজন্ম বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতিকে ভালোবাসবে, চর্চা করবে এবং মর্যাদা দেবে।
স্কুল-কলেজে ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস আরও গুরুত্ব সহকারে পড়ানো প্রয়োজন। সাহিত্য, নাটক, গান ও সাংস্কৃতিক চর্চার মধ্য দিয়ে নতুনদের কাছে পৌঁছে দিতে হবে সেই আত্মত্যাগের কাহিনি। কারণ ইতিহাস ভুলে গেলে জাতি তার পথ হারায়।

১৯ মে : প্রতিরোধের চিরন্তন প্রতীক
বরাকের ভাষা আন্দোলন শুধু একটি আঞ্চলিক আন্দোলন নয়; এটি ভারতের বহুভাষিক গণতন্ত্রের এক গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা। এই আন্দোলন প্রমাণ করে ভাষাগত বৈচিত্র্যকে সম্মান করেই প্রকৃত গণতন্ত্র শক্তিশালী হয়।
আজ যখন বিশ্বজুড়ে বহু ভাষা হারিয়ে যাওয়ার আশঙ্কায় রয়েছে, তখন ১৯ মে আমাদের নতুন করে মনে করিয়ে দেয় মাতৃভাষাকে বাঁচিয়ে রাখা মানে নিজের সভ্যতা ও সংস্কৃতিকে বাঁচিয়ে রাখা।
আগামীকাল যখন শহিদ বেদিতে ফুল পড়বে, যখন প্রভাতফেরিতে ধ্বনিত হবে শ্রদ্ধার গান, যখন মোমবাতির আলোয় জেগে উঠবে বরাকের রাত তখন প্রতিটি মানুষের মনে উচ্চারিত হবে একটাই অঙ্গীকার ভাষা শহিদদের আত্মত্যাগ কখনও বৃথা যেতে দেওয়া হবে না।কারণ রক্ত দিয়ে অর্জিত ভাষার মর্যাদা কখনও মুছে যায় না।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *