পাথারকান্দিতে শহিদ সুদেষ্ণা সিনহার প্রতিমূর্তি উন্মোচন

Spread the news

মোহাম্মদ জনি, পাথারকান্দি।
বরাক তরঙ্গ, ১৬ মার্চ : গভীর শ্রদ্ধা, আবেগ এবং ভাবগাম্ভীর্যের মধ্য দিয়ে করিমগঞ্জ জেলার পাথারকান্দিতে যথাযোগ্য মর্যাদায় পালিত হলো বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরি ভাষা শহিদ দিবস। বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরি ইয়ং ব্রিগেড এবং নিখিল বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরি যুব পরিষদের যৌথ উদ্যোগে দিনব্যাপী বিভিন্ন কর্মসূচির মাধ্যমে ১৯৯৬ সালের ঐতিহাসিক ভাষা আন্দোলনের বীর শহিদদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করা হয়।
দিবসটির সূচনা হয় শহিদদের স্মৃতির প্রতি পুষ্পার্ঘ্য অর্পণের মধ্য দিয়ে। সকালে মুণ্ডমালা, তিনখাল এবং বিলবাড়িতে অবস্থিত শহিদ সুদেষ্ণা সিনহার বেদিতে সংগঠনের সদস্যবৃন্দ, সমাজের বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ এবং সাধারণ মানুষ মাল্যদান ও পুষ্পার্ঘ্য অর্পণ করে শহীদের আত্মার শান্তি কামনা করেন। এ সময় উপস্থিত সকলের মধ্যে গভীর আবেগ ও শ্রদ্ধার পরিবেশ সৃষ্টি হয়।এরপর মূল অনুষ্ঠানটি অনুষ্ঠিত হয় পাথারকান্দি বাইপাস সংলগ্ন শহিদ সুদেষ্ণা তিনআলি চত্বরে।

অনুষ্ঠানের অন্যতম প্রধান আকর্ষণ ছিল ভাষা আন্দোলনের বীর শহিদ সুদেষ্ণা সিনহার প্রতিমূর্তি উন্মোচন। প্রাক্তন সৈনিক বিশ্বজিৎ সিনহার নিপুণ শিল্পকর্মে নির্মিত এই প্রতিমূর্তিটি ভাষা আন্দোলনের ইতিহাসকে নতুন করে স্মরণ করিয়ে দেয়। শহিদ সুদেষ্ণা সিনহার বড় বোন অঞ্জুলি সিনহা এবং ১৯৯৬ সালের ঐতিহাসিক ভাষা আন্দোলনের সময় পুলিশের গুলিতে আহত সত্যগ্রহীদের হাতে এই প্রতিমূর্তির আনুষ্ঠানিক উন্মোচন করা হয়। এই আবেগঘন মুহূর্তে উপস্থিত জনতার মধ্যে গভীর শ্রদ্ধা ও আবেগের সঞ্চার ঘটে।প্রতিমূর্তি উন্মোচনের পর ভাষা আন্দোলনের সকল বীর শহিদদের স্মরণে এক মিনিট নীরবতা পালন করা হয়। এরপর নির্ধারিত কর্মসূচি অনুযায়ী উদ্বোধনী সঙ্গীত পরিবেশন করেন আরতি সিনহা ও লিপিকা সিনহা। তাদের সুরেলা কণ্ঠে পরিবেশিত গান অনুষ্ঠানে উপস্থিত সকলকে আবেগাপ্লুত করে তোলে। অনুষ্ঠানের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ পর্ব ছিল ১৯৯৬ সালের ভাষা আন্দোলনের সময় পুলিশের গুলিতে আহত ৯ জন সত্যগ্রহী এবং আমন্ত্রিত অতিথিদের সংবর্ধনা প্রদান। প্রথাগত বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরি গামছা পরিয়ে তাদের সম্মাননা জানানো হয়। এই সংবর্ধনা পর্বের মাধ্যমে আন্দোলনের সেই বীর যোদ্ধাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা হয়।এরপর অনুষ্ঠিত আলোচনা সভায় বক্তারা বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরি ভাষা আন্দোলনের গুরুত্ব, ইতিহাস এবং শহিদ সুদেষ্ণা সিনহার আত্মত্যাগের কথা গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করেন।

বক্তারা বলেন, মাতৃভাষার মর্যাদা রক্ষার সংগ্রামে সুদেষ্ণা সিনহার আত্মবলিদান শুধু বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরি সমাজের নয়, বরং সমগ্র বিশ্বের ভাষা আন্দোলনের ইতিহাসে এক অনন্য ও বিরল দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে। ভাষার অধিকার রক্ষার এই সংগ্রাম নতুন প্রজন্মকে তাদের মাতৃভাষা ও সংস্কৃতির প্রতি আরও সচেতন ও দায়বদ্ধ হতে অনুপ্রাণিত করবে।উল্লেখ্য, বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরি মাতৃভাষাকে প্রাথমিক শিক্ষার স্তরে স্বীকৃতি দেওয়ার দাবিতে ১৯৯৬ সালের ১৬ মার্চ শুরু হয়েছিল ঐতিহাসিক ৫০১ ঘণ্টার রেল রুকো আন্দোলন। ভাষার অধিকার প্রতিষ্ঠার দাবিতে হাজার হাজার সাধারণ মানুষ স্বতঃস্ফূর্তভাবে এই আন্দোলনে অংশগ্রহণ করেন। আন্দোলন দমনে পুলিশ প্রথমে লাঠিচার্জ করে এবং পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে একপর্যায়ে গুলি চালায়। পুলিশের গুলিতে সেদিন ঘটনাস্থলেই শহিদ হন বীরাঙ্গনা সুদেষ্ণা সিনহা। পুলিশের গুলিতে ও লাঠিচার্জে আরও বহু আন্দোলনকারী গুরুতরভাবে আহত হন। সুদেষ্ণা সিনহাই হলেন বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরি ভাষা আন্দোলনের প্রথম মহিলা শহিদ। তার এই আত্মত্যাগ ভাষা আন্দোলনের ইতিহাসে এক অমর অধ্যায় হয়ে আছে। সেই ঘটনার পর থেকেই প্রতি বছর ১৬ মার্চ তারিখটি বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে বসবাসকারী বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরি সমাজের মানুষ গভীর শ্রদ্ধা ও মর্যাদার সঙ্গে ‘ভাষা শহিদ দিবস’ হিসেবে পালন করে আসছেন।আজকের দিনে এই দিবসটি কেবল একটি স্মরণ দিবস নয়; এটি বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরী জাতির আত্মপরিচয়, সাংস্কৃতিক অস্তিত্ব এবং মাতৃভাষার প্রতি অগাধ ভালোবাসার প্রতীক হয়ে উঠেছে। সুদেষ্ণা সিনহা কেবল একটি নাম নন—তিনি আজ বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরী ভাষার অস্তিত্ব রক্ষার এক অদম্য সাহস, সংগ্রাম ও আত্মত্যাগের প্রতীক। অনুষ্ঠানটি সুন্দর ও সুশৃঙ্খলভাবে সম্পন্ন হওয়ায় উদযাপন কমিটির পক্ষ থেকে বিশ্বজিৎ সিংহ, পৃথিরাজ সিনহা, সুবাস সিনহা, রিঙ্কু সিনহা, শ্যামল সিনহা, রাজীব সিনহা, স্বপন সিনহা সহ সংশ্লিষ্ট সকল ব্যক্তি এবং উপস্থিত জনসাধারণকে আন্তরিক ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানানো হয়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *