১২ বছরের মোদি সরকার: জনকল্যাণ, অর্থনৈতিক স্থায়িত্ব ও আধুনিক পরিকাঠামোয় এক যুগের রূপান্তর

Spread the news

১০ জুন : প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বাধীন সরকারের ১২ বছর পূর্তি ভারতের প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক ইতিহাসে এক বড় মাইলফলক হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। ২০১৪ থেকে ২০২৬ সালের এই দীর্ঘ যাত্রাপথকে পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, ভারতের শাসনব্যবস্থায় এক যুগান্তকারী পরিবর্তন এসেছে। এই রূপান্তর মূলত তিনটি মূল স্তম্ভের ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে— প্রান্তিক মানুষের জন্য নিবিড় কল্যাণমুখী প্রকল্প (Welfarism), দেশজুড়ে বিশ্বমানের আধুনিক পরিকাঠামো নির্মাণ (Infrastructure) এবং প্রযুক্তির সাহায্যে সমাজের প্রতিটি স্তরে ডিজিটাল অন্তর্ভুক্তি (Outreach)। সরকারের দাবি, এই এক যুগ ছিল দেশবাসীর ‘বিশ্বাস, বিকাশ এবং জনকল্যাণ’-এর প্রতি সম্পূর্ণ নিবেদিত।

এই দীর্ঘ শাসনকালের সবচেয়ে বড় সাফল্য এসেছে দরিদ্র কল্যাণ ও সামাজিক নিরাপত্তার ক্ষেত্রে, যার মূল অনুপ্রেরণা ছিল ‘অন্ত্যোদয়’ বা সমাজের শেষ প্রান্তে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষের উন্নয়ন। প্রত্যক্ষ সুবিধা হস্তান্তর (DBT) এবং ডিজিটাল পাবলিক ইনফ্রাস্ট্রাকচারের (DPI) মেলবন্ধনে কোনও রকম মধ্যস্বত্বভোগী বা প্রশাসনিক জটিলতা ছাড়াই সরাসরি মানুষের ব্যাংক অ্যাকাউন্টে সরকারি অনুদান পৌঁছে দেওয়া সম্ভব হয়েছে। এর ফলে অতীতে কল্যাণমূলক প্রকল্পে যে বিপুল পরিমাণ দুর্নীতি ও অপচয় হতো, তা স্থায়ীভাবে বন্ধ করা গেছে। এই ব্যবস্থার অধীনে দেশের ৮১ কোটিরও বেশি মানুষকে প্রতি মাসে বিনামূল্যে খাদ্যশস্য দেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি, ‘প্রধানমন্ত্রী আবাস যোজনা’র হাত ধরে এ পর্যন্ত ৪ কোটিরও বেশি পরিবারের জন্য পাকা বাড়ি নিশ্চিত করা হয়েছে। স্বাস্থ্যখাতে বড় বিপ্লব এনেছে ‘আয়ুষ্মান ভারত’ প্রকল্প, যার মাধ্যমে প্রায় ৭০ কোটি মানুষকে স্বাস্থ্যবিমার আওতায় আনা হয়েছে এবং ৬০ কোটিরও বেশি মানুষ বিনামূল্যে চিকিৎসার সুবিধা পেয়েছেন। গ্রামীণ জীবনের মানোন্নয়নে ‘জল জীবন মিশন’ এক অভূতপূর্ব ভূমিকা পালন করেছে, যার মাধ্যমে ১০.৫ কোটিরও বেশি গ্রামীণ পরিবারে সরাসরি কলের মাধ্যমে বিশুদ্ধ পানীয় জল পৌঁছে দেওয়া হয়েছে।

যোগাযোগ ও অর্থনৈতিক পরিকাঠামোর ক্ষেত্রেও গত বারো বছরে ভারত এক অবিশ্বাস্য গতির সাক্ষী থেকেছে। খণ্ড খণ্ড প্রকল্প বাস্তবায়নের পুরনো মানসিকতা ঝেড়ে ফেলে ‘প্রধানমন্ত্রী গতিশক্তি’ ও ‘ন্যাশনাল লজিস্টিকস পলিসি’-র মতো সমন্বিত পরিকল্পনার মাধ্যমে পরিকাঠামো নির্মাণকে গতি দেওয়া হয়েছে। ২০১৪ সালে যেখানে পাবলিক ক্যাপিটাল এক্সপেন্ডিচার (সরকারি পুঁজি বিনিয়োগ) ছিল মাত্র ২ লক্ষ কোটি টাকা, ২০২৬-২৭ অর্থবর্ষে তা বৃদ্ধি পেয়ে দাঁড়িয়েছে ১২.২ লক্ষ কোটি টাকায়। এই বিপুল বিনিয়োগের ফলেই দেশজুড়ে ২৬টি গ্রিনফিল্ড এক্সপ্রেসওয়ে নির্মিত হয়েছে, মেট্রো রেলের নেটওয়ার্ক ১,১০০ কিলোমিটারের বেশি সম্প্রসারিত হয়েছে এবং সচল বিমানবন্দরের সংখ্যা ৭৪ থেকে বেড়ে ১৬৪-তে উন্নীত হয়েছে। ‘উড়ান’ (UDAN) প্রকল্পের মাধ্যমে সাধারণ মানুষের জন্য বিমানযাত্রা সাধ্যের মধ্যে আনা হয়েছে। এছাড়াও ‘অটল টানেল’, ‘সুদর্শন সেতু’ এবং জম্মু-কাশ্মীরের ‘সোনারমার্গ টানেল’-এর মতো স্ট্র্যাটেজিক বা কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ যোগাযোগ ব্যবস্থা দেশের নিরাপত্তা ও আঞ্চলিক অর্থনীতিকে আরও শক্তিশালী করেছে।

এই পরিকাঠামোগত রূপান্তরের সমান্তরালে চলেছে দেশের ডিজিটাল ও আর্থিক ক্ষমতায়ন। ‘ডিজিটাল ইন্ডিয়া’ অভিযানের হাত ধরে দেশে ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর সংখ্যা আজ ১৩০ কোটিতে পৌঁছেছে এবং মোবাইল সংযোগের সংখ্যা ১৫১ কোটি ছাড়িয়েছে। ইউপিআই (UPI) বা ইউনিফাইড পেমেন্টস ইন্টারফেসের মাধ্যমে লেনদেনের আর্থিক মূল্য ২,১২৫ লক্ষ কোটি টাকা অতিক্রম করেছে, যা একদম প্রান্তিক স্তরের হকার ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী থেকে শুরু করে বড় কর্পোরেট— সবাইকে একটি সুসংহত অর্থনৈতিক কাঠামোর মধ্যে নিয়ে এসেছে। মহিলাদের অর্থনৈতিক স্বাধীনতার ক্ষেত্রেও এক নীরব বিপ্লব ঘটেছে, যেখানে ৩২ কোটিরও বেশি মহিলা ‘জন ধন’ অ্যাকাউন্ট খোলার মাধ্যমে সরাসরি ব্যাংকিং ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত হয়েছেন।

কৃষি ও জাতীয় নিরাপত্তার ক্ষেত্রেও এই ১২ বছরের নীতি ছিল অত্যন্ত সুদূরপ্রসারী। ‘প্রধানমন্ত্রী কিষাণ’ (PM-KISAN) প্রকল্পের আওতায় কৃষকদের অ্যাকাউন্টে সরাসরি ৪.৩ লক্ষ কোটি টাকারও বেশি পাঠানো হয়েছে এবং কৃষকদের জমির গুণমান বজায় রাখতে ৪৪ কোটি সয়েল হেলথ কার্ড বিতরণ করা হয়েছে। অন্যদিকে, আত্মনির্ভরতার পথে হেঁটে ভারতের প্রতিরক্ষা খাত এক নতুন উচ্চতায় পৌঁছেছে, যেখানে দেশের প্রতিরক্ষা রপ্তানি ৩৮,৪০০ কোটি টাকা অতিক্রম করেছে। জম্মু ও কাশ্মীরের বিশেষ মর্যাদা রদ (Article 370) থেকে শুরু করে অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা সুদৃঢ় করা— সব ক্ষেত্রেই সরকারের ‘রাষ্ট্র প্রথম’ (Nation First) নীতি স্পষ্ট প্রতিফলিত হয়েছে। বিগত ১২ বছরের এই সামগ্রিক খতিয়ান ও সম্প্রতিক ৭.৭ শতাংশ জিডিপি (GDP) বৃদ্ধির হার এটাই প্রমাণ করে যে, প্রযুক্তিকে হাতিয়ার করে একদিকে যেমন সাধারণ মানুষের মর্যাদা ও জীবনযাত্রার মান নিশ্চিত করা হয়েছে, ঠিক অন্যদিকে একবিংশ শতাব্দীর আধুনিক ভারতের জন্য একটি শক্তিশালী অর্থনৈতিক ও পরিকাঠামোগত ভিত্তি স্থাপন করা হয়েছে, যা ২০৪৭ সালের ‘বিকশিত ভারত’ বা উন্নত ভারতের লক্ষ্যপূরণের দিকে দেশকে দ্রুত এগিয়ে নিয়ে চলেছে।
খবর : আজকাল ডট ইন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *