২০ মে : দেশে বিকল্প রাজনৈতিক দলের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে সরব অনেকেই। খাতায়কলমে রাজনৈতিক দল না হলেও, রাজনৈতিক আন্দোলনের অন্তত সূচনা হল দেশে। মূলত অনলাইন মাধ্যমে সীমাবদ্ধ হলেও, ব্যঙ্গধর্মী Cockroach Janta Party সাড়া ফেলে দিয়েছে। মাত্র ৭২ ঘণ্টার মধ্যে ৭০০০০ মানুষ তাদের সদস্যতা গ্রহণ করেছে। আর এই আন্দোলনের নেপথ্যে রয়েছেন ৩০ বছরের এক যুবক। (Cockroach Janta Party)
গত ১৬ মে Cockroach Janta Party বা CJP-র সূচনা করেন অভিজিৎ ডিপকে নামের এক যুবক। মাইক্রোব্লগিং সাইট X (সাবেক ট্যুইটার)-এ একটি Google Form পোস্ট করেন তিনি। Cockroach Janta Party-তে যোগ দিতে আহ্বান জানান সকলকে। মাত্র কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই ৫০০০ জন নাম নথিভুক্ত করেন। সেই থেকে যত সময় এগিয়েছে, হু হু করে Cockroach Janta Party-র সদস্যসংখ্যা বেড়েছে। তৃণমূলের দুই সাংসদ, মহুয়া মৈত্র এবং কীর্তি আজাদও CJP-তে যোগ দিয়েছেন। (Abhijeet Dipke)
বিতর্কের সূচনা সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি সূর্যকান্তর একটি মন্তব্যকে ঘিরে। একটি মামলার শুনানি চলাকালীন তিনি বেকার ছেলেমেয়েদের ‘আরশোলা’, ‘পরজীবী’র সঙ্গে তুলনা করেন বলে অভিযোগ। সেই নিয়ে বিতর্ক চরমে উঠলে নিজের মন্তব্যের ব্য়াখ্য়াও দেন CJI সূর্যকান্ত। অভিযোগ ওঠে, বেকার ছেলেমেয়েরা যখন কিছু করতে পারে না, সাংবাদিকতা, RTI-এর মতো সমাজসেবামূলক এবং আইনের পেশায় প্রবেশ করে বলেও মন্তব্য করেন তিনি। সেই নিয়ে বিতর্ক চরমে উঠলে CJI সূর্যকান্ত জানান, তাঁর মৌখিক পর্যবেক্ষণের ভুল ব্য়াখ্যা হচ্ছে। দেশের যুবসমাজকে দেখে তাঁকে অনুপ্রেরণাই জোগান।
তত ক্ষণে যদিও আলোড়ন শুরু হয়ে গিয়েছে চারিদিকে। সেই আবহেই Cockroach Janta Party-র সূচনা করেন অভিজিৎ। মূলত ব্যঙ্গধর্মী রাজনৈতিক সংগঠন হিসেবেই CJP-কে তুলে ধরেন তিনি। তবে গত কয়েকদিনে নির্বাচনী প্রতীকচিহ্ন থেকে পাঁচ দফার ইস্তেহারও প্রকাশ করা হয়েছে। মূলত কম বয়সি ছেলেমেয়ে, Gen-Zরা ভিড় জমাতে শুরু করেছেন। তবে সব বয়সের মানুষের তরফেই ভাল সাড়া মিলেছে। আগামীতে Gen-Zদের নিয়ে সম্মেলন আয়োজন থেকে আরও বড় পরিকল্পনা রয়েছে বলে জানিয়েছে Cockroach Janta Party.তবে সরাসরি রাজনীতিতে প্রবেশ করে কি না, দল হিসেবে নাম নথিভুক্ত করে কি না, তা নিয়ে ধন্দ রয়েছে। অনেকের মতে, Cockroach Janta Party একটি ডিজিটাল আন্দোলনের প্ল্যাটফর্ম হয়ে উঠতে পারে।
প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ ডিপকে কে?
কিন্তু এমন একটি প্ল্যাটফর্ম গড়ার ভাবনা এল কোথা থেকে? আমেরিকার বস্টন ইউনিভার্সিটি থেকে স্নাতকোত্তর স্তরে পাঠরত অভিজিৎ জানান, দেশের যুবসমাজের ভাবনা, তাঁদের প্রতিবাদ তুলে ধরতেই নতুন প্ল্যাটফর্ম গড়ার ভাবনা মাথায় আসে তাঁর। The Hindu-কে দেওয়া সাক্ষাৎকারে বলেন, “সম্মানীয় প্রধান বিচারপতির মন্তব্যের বিরুদ্ধে অল্পবয়সি ছেলেমেয়েদের প্রতিবাদী স্বরই তুলে ধরে Cockroach Janta Party. প্রধান বিচারপতি সংবিধান, বাক স্বাধীনতার রক্ষক। তাঁর থেকে এমন মন্তব্য কাম্য নয়। অল্পবয়সি ছেলেমেয়েরা সমালোচনা করলে, এভাবে ছোট করা যায় না তাঁদের।”
অভিজিৎ জানিয়েছেন, তাঁরা করদাতাদের টাকায় কিছু করতে আসেননি। তাঁরা প্রশ্ন করতে এসেছেন। সিস্টেম যাঁদের কথা মনে রাখে না, তাঁদের কথা তুলে ধরা হবে। দুই বন্ধুর সঙ্গে মিলে, AI ব্যবহার করে ওয়েবসাইটও খুলে ফেলেছেন অভিজিৎ। Cockroach Janta Party-কে তিনি ‘ধর্মনিরপেক্ষ’, ‘সমাজতান্ত্রিক’, ‘গণতান্ত্রিক’, ‘জাতি বিদ্বেষ বর্জিত’ একটি সংগঠন হিসেবে তুলে ধরেছেন। জানিয়েছেন, মহাত্মা গাঁধী, বাবাসাহেব আম্বেডকর এবং জওহরলাল নেহরুর আদর্শ অনুসরণ করে চলবে সংগঠনটি। একসময় আম আদমি পার্টির সোশ্যাল মিডিয়া শাখার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন অভিজিৎ।
CJP-র ইস্তেহার
ইতিমধ্যে পাঁচ দফার একটি ইস্তেহারও প্রকাশ করেছে Cockroach Janta Party. তাদের দাবি পরিষ্কার—
১) আসনসংখ্যা না বাড়িয়েই সংসদে মহিলাদের ৫০ শতাংশ সংরক্ষণের দাবি রয়েছে।
২) দলবদল করা বিধায়ক এবং সাংসদরা যাতে দলবদলের পরই নির্বাচনে অংশ নিতে না পারেন, তার জন্য ২০ বছরের নিষেধাজ্ঞার কথা রয়েছে।
৩) বিচারপতিরা অবসরের পর যাতে রাজ্যসভায় জায়গা না পান, উল্লেখ রয়েছে তারও।
৪) বৈধ ভোটারের নাম মোছা হলে মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিককে গ্রেফতার করার কথা রয়েছে।
৫) CBSE-তে নম্বর পুনর্মূল্যায়নে ইচ্ছে মতো টাকা নেওয়া যাবে না, NEET প্রশ্নপত্র ফাঁসে পরীক্ষার্থীদের পাশে দাঁড়ানোর কথাও বলা হয়েছে।
CJP-তে যোগদানের শর্তাবলী
Cockroach Janta Party-তে যোগদানের শর্ত হল, বেকার ও অলস হতে হবে। নিয়মিত অনলাইন উপস্থিতি জরুরি। পেশাদারের মতো অভিযোগ-অনুযোগ জানাতে জানতে হবে।
ব্যঙ্গধর্মী রাজনৈতিক সংগঠন আসলে কী
ভারতে এই ধরনের ব্য়ঙ্গধর্মী সংগঠন এই প্রথম তৈরি হলেও, আমেরিকায় ছয়ের দশকেই এই রীতির সূচনা। হান্টার টমসনের নেতৃত্বে সেখানে Freak Power Movement-এর সূচনা হয়। সমাজকর্মী অ্যাবি হফম্যান এবং জেরি রুবিন তৈরি করেন Youth International Party তথা Yippies-এর। ব্রিটেনে আটের দশকে তৈরি হয় Official Moster Raving Loony Party-র, যারা মূলধারার রাজনৈতিক দলগুলির দুর্নীতি, অনাচার নিয়ে সরব ছিল। অদ্ভুত দাবিদাওয়া নিয়ে নিজেদের ইস্তেহারও প্রকাশ করত। ওই একই সময়ে পোল্যান্ডে Orange Alternative-এর সূচনা ঘটে। রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ব্যঙ্গধর্মী নাটক মঞ্চস্থ করত তারা। বছর ২০-২৫ আগে সুইডেনে Pirate Party-র সূচনা হয়, যা ইন্টারনেটে মানুষজনের মতামতকে গুরুত্ব দিতে শুরু করে। সরকার বিরোধী অবস্থান, নেটদুনিয়ার অধিকার, গোপনীয়তা রক্ষার অধিকার, নাগরিক অধিকার নিয়েও সরব হয় তারা।
CJP-র ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা
অভিজিৎ জানিয়েছেন, সিস্টেমকে প্রশ্ন করা থেকে বিরত থাকলে চলবে না। তাঁর মতে, আরশোলা সহিষ্ণুতারও প্রতীক। নেহাত রসিকতা করতে আসেননি, বরং সাধারণ মানুষের মধ্যে রাজনৈতিক সচেতনতা গড়ে তুলতে, যুবসমাজকে খুঁটিনাটি সম্পর্কে অবহিত করতে, সক্রিয় রাজনীতিতে যুক্ত হতে উৎসাহ জোগানোই তাঁদের লক্ষ্য বলে জানিয়েছেন অভিজিৎ। আন্না হাজারের নেতৃত্বে ‘India Against Corruption’ আন্দোলন গড়ে উঠেছিল একসময়। সেই আন্দোলন থেকেই উত্থান অরবিন্দ কেজরিওয়াল এবং আম আদমি পার্টির। যদিও পরবর্তী সেই কেজরিওয়ালের বিরুদ্ধেই দুর্নীতির অভিযোগ ওঠে। তাহলে কি Cockroach Janta Party-ও আগামী দিনে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবে? অভিজিৎ জানিয়েছেন, এখনই সেটা বলার সময় আসেনি। আগে সকলকে সংঘবদ্ধ করতে হবে। তাঁর মতে, সময়ের সঙ্গে রাজনীতিও বদলাচ্ছে। জনমত তৈরিতে সোশ্য়াল মিডিয়া নির্ণায়কের ভূমিকা পালন করছে। তাই অনলাইনই প্ল্যাটফর্ম তৈরির ভাবনাই মাথায় আসে তাঁর। কোনও রাজনৈতিক দলের সঙ্গে হাত মেলানোর কোনও পরিকল্পনা নেই বলেও সাফ জানিয়ে দিয়েছেন। তবে ভবিষ্যতে যদি সক্রিয় রাজনীতিতে অংশ নেনও, তাহলেও Cockroach Janta Party নামটি পাল্টানো হবে না বলে The Feferal-কে জানিয়েছেন অভিজিৎ।
খবর : abp anand



