দেশভাগ, সিলেট প্রশ্ন এবং “উদ্বাস্তু” পরিচয়ের রাজনৈতিক ইতিহাস

Spread the news

।। বিধায়ক দাশ পুরকায়স্থ ।।
৪ জুন : ভারতবর্ষের স্বাধীনতা কেবলমাত্র ঔপনিবেশিক শাসনের অবসান ঘটায়নি; এর সঙ্গে জুড়ে ছিল এক গভীর মানবিক বিপর্যয়—দেশভাগ। ১৯৪৭ সালের দেশভাগের ফলে পঞ্জাব ও বাংলার কোটি কোটি মানুষ রাতারাতি নিজেদের জন্মভূমিতে “পর” হয়ে পড়েন। বাংলার ক্ষেত্রে এই বিভাজন ছিল আরও জটিল, কারণ ভাষা, সংস্কৃতি, খাদ্যাভ্যাস, সামাজিক রীতিনীতি—সবকিছুতে ঐক্য থাকা সত্ত্বেও ধর্মের ভিত্তিতে ভূখণ্ডকে দ্বিখণ্ডিত করা হয়। এর ফলেই পূর্ববঙ্গ (পরে পূর্ব পাকিস্তান এবং আরও পরে বাংলাদেশ) থেকে বিপুল সংখ্যক বাঙালি হিন্দু পশ্চিমবঙ্গ, আসাম, ত্রিপুরা ও ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে এসে বসতি স্থাপন করেন।

ভারতের সিলেটিরা তাই “উদ্বাস্তু” নন।
তাঁরা এই দেশেরই মানুষ।
আসামেরও সন্তান।
বৃহত্তর বঙ্গীয় ইতিহাসেরও উত্তরাধিকারী।

এই মানুষদের একাংশকে রাষ্ট্র, প্রশাসন ও রাজনৈতিক পরিসরে “উদ্বাস্তু বাঙালি” বা “শরণার্থী বাঙালি” নামে চিহ্নিত করা হয়। প্রথমদিকে এই অভিধা ছিল প্রশাসনিক; কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এটি একটি রাজনৈতিক, সামাজিক এবং মানসিক পরিচয়ে পরিণত হয়। প্রশ্ন উঠেছে—এই নামকরণ কি নিছক বাস্তবতার বর্ণনা, নাকি এর পিছনে ছিল বৃহত্তর রাজনৈতিক উদ্দেশ্য? “উদ্বাস্তু” পরিচয় কি বাঙালি হিন্দুদের একটি স্থায়ী ‘অপর’ হিসেবে নির্মাণ করার প্রক্রিয়া? এবং স্বাধীনতার প্রায় আট দশক পরে এই ট্যাগের আদৌ কোনও নৈতিক, সাংবিধানিক বা রাজনৈতিক প্রয়োজনীয়তা আছে কি?

এই প্রশ্নগুলির উত্তর খুঁজতে গেলে ইতিহাসের দিকে ফিরে তাকানো জরুরি।

“উদ্বাস্তু” শব্দ : প্রশাসনিক অভিধা থেকে রাজনৈতিক পরিচয়
“উদ্বাস্তু” শব্দটি মূলত সংস্কৃত “বাস্তু” শব্দ থেকে এসেছে—অর্থাৎ যিনি নিজের বাসস্থান থেকে উৎখাত হয়েছেন। দেশভাগের পরে ভারত সরকার পূর্ববঙ্গ থেকে আগত মানুষদের সরকারি নথিতে “Refugee”, “Displaced Person”, “Evacuee” ইত্যাদি নামে চিহ্নিত করতে শুরু করে। এর মূল উদ্দেশ্য ছিল পুনর্বাসন, ত্রাণ, রেশন, জমি বণ্টন ও নাগরিক নথিভুক্তির প্রশাসনিক সুবিধা।

কিন্তু বাংলার ক্ষেত্রে বিষয়টি খুব দ্রুত রাজনৈতিক চরিত্র ধারণ করে। কারণ, পঞ্জাবের উদ্বাস্তুরা তুলনামূলকভাবে দ্রুত পুনর্বাসন ও রাজনৈতিক স্বীকৃতি পেলেও, পূর্ববঙ্গীয় হিন্দুরা দীর্ঘদিন ধরে “অস্থায়ী”, “আগত”, “বহিরাগত”, এমনকি “অর্থনৈতিক বোঝা” হিসেবেও চিহ্নিত হন। পশ্চিমবঙ্গের শহুরে সমাজে “ঘটি-বাঙাল” বিভাজন যেমন সামাজিক দূরত্ব তৈরি করেছিল, তেমনি আসাম ও উত্তর-পূর্ব ভারতে “বাঙালি” পরিচয়কে ধীরে ধীরে “বহিরাগত” রাজনীতির সঙ্গে জুড়ে দেওয়া হয়।

ফলে “উদ্বাস্তু” পরিচয়টি আর কেবল স্থানচ্যুতির বর্ণনা রইল না; এটি হয়ে উঠল ক্ষমতা, ভাষা, নাগরিকত্ব ও পরিচয়-রাজনীতির অংশ।

কারা এই পরিচয়কে স্থায়ী করল?
“উদ্বাস্তু” শব্দটি কোনও একক ব্যক্তি বা রাজনৈতিক দলের সৃষ্টি নয়। এটি রাষ্ট্র, প্রশাসন, সংবাদমাধ্যম এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক শক্তির সম্মিলিত ব্যবহারের মাধ্যমে সামাজিকভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।

ব্রিটিশ শাসন ভারতে জনগোষ্ঠীগুলিকে সর্বদা বিভক্ত ও শ্রেণিবদ্ধ করে শাসন করেছে—হিন্দু-মুসলিম, উপজাতি-অ-উপজাতি, দেশীয়-বহিরাগত ইত্যাদি পরিচয়ের মাধ্যমে। স্বাধীনতার পরেও সেই প্রশাসনিক মানসিকতার একটি ধারাবাহিকতা বজায় থাকে।

ফলে পূর্ববঙ্গ থেকে আসা মানুষদের “পূর্ণ নাগরিক” হিসেবে নয়, বরং “পুনর্বাসনের প্রাপক” হিসেবেই দেখা হয়।

একইসঙ্গে আঞ্চলিক জাতীয়তাবাদ এবং ভাষিক রাজনীতিও এই পরিচয়কে আরও শক্তিশালী করে তোলে। বিশেষত আসামে বহু ক্ষেত্রেই “বাঙালি” পরিচয়কে “বহিরাগত” ধারণার সঙ্গে যুক্ত করা হয়। অথচ বাস্তবে বহু বাঙালি পরিবার দেশভাগের বহু আগেই আসামে বসবাস করত।

“উদ্বাস্তু” ও “অনুপ্রবেশকারী” : দু’টি সম্পূর্ণ ভিন্ন বাস্তবতা
জনপরিসরে বহু সময় “উদ্বাস্তু”, “অভিবাসী”, “অনুপ্রবেশকারী” এবং “দেশভাগ-পীড়িত”—এই সম্পূর্ণ ভিন্ন বাস্তবতাগুলিকে এক করে দেখানো হয়। অথচ ইতিহাসগত ও আইনগতভাবে এদের মধ্যে মৌলিক পার্থক্য রয়েছে।

দেশভাগ-পীড়িত জনগোষ্ঠী অবিভক্ত ভারতেরই নাগরিক ছিলেন। তাঁদের বাস্তুচ্যুতি ছিল রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের ফল; কোনও বেআইনি অনুপ্রবেশের ঘটনা নয়।

এই পার্থক্যটি ইচ্ছাকৃতভাবে অস্পষ্ট করে দেওয়া হলে ইতিহাস বিকৃত হয় এবং একটি জনগোষ্ঠী সম্পর্কে দীর্ঘস্থায়ী সন্দেহের পরিবেশ তৈরি হয়।

“উদ্বাস্তু” তকমার অন্তর্নিহিত রাজনীতি
রাজনীতিতে “অপরীকরণ” বা othering একটি বহুল ব্যবহৃত কৌশল। যখন কোনও জনগোষ্ঠীকে প্রজন্মের পর প্রজন্ম “উদ্বাস্তু”, “বহিরাগত” বা “অনুপ্রবেশকারী” বলা হয়, তখন ধীরে ধীরে তাদের নাগরিক আত্মবিশ্বাস দুর্বল হয়ে পড়ে।

তারা নিজেদেরই প্রশ্ন করতে শুরু করে—
“এই দেশ কি সত্যিই আমার?”
এই মানসিক অবস্থাই রাজনৈতিকভাবে সবচেয়ে বিপজ্জনক। কারণ তখন নাগরিক অধিকার আর স্বাভাবিক অধিকার থাকে না; তা পরিণত হয় অনিশ্চিত অনুমতিতে।

ফলে একটি জনগোষ্ঠী সহজেই ভোটব্যাঙ্কে পরিণত হয়, প্রশাসনিক হয়রানির শিকার হয় এবং নিজেদের ঐতিহাসিক অবস্থান সম্পর্কেও দ্বিধাগ্রস্ত হয়ে পড়ে।

বাস্তবিক অর্থে কি বাঙালি হিন্দুরা “উদ্বাস্তু”?
এখানেই মূল বিতর্ক।
কারণ দেশভাগের আগে পূর্ববঙ্গও ছিল অবিভক্ত ভারতের অংশ। যারা ঢাকা, বরিশাল, চট্টগ্রাম, ময়মনসিংহ, নোয়াখালি বা সিলেট থেকে এসেছেন, তারা কোনও বিদেশি ভূখণ্ড থেকে আসেননি; তারা একই দেশের এক অংশ থেকে অন্য অংশে স্থানান্তরিত হয়েছেন।

সুতরাং একটি গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক সত্য হল—
তাঁরা বিদেশি নন; তাঁরা দেশভাগের বলি।
“উদ্বাস্তু” শব্দটি তাই অনেকাংশে রাজনৈতিক নির্মাণ—যা ধীরে ধীরে একটি জনগোষ্ঠীকে স্থায়ীভাবে “আগত” হিসেবে দেখানোর হাতিয়ারে পরিণত হয়েছে।

“উদ্বাস্তু” শব্দ : প্রশাসনিক অভিধা থেকে রাজনৈতিক পরিচয়
“উদ্বাস্তু” শব্দটি মূলত সংস্কৃত “বাস্তু” শব্দ থেকে এসেছে—অর্থাৎ যিনি নিজের বাসস্থান থেকে উৎখাত হয়েছেন। দেশভাগের পরে ভারত সরকার পূর্ববঙ্গ থেকে আগত মানুষদের সরকারি নথিতে “Refugee”, “Displaced Person”, “Evacuee” ইত্যাদি নামে চিহ্নিত করতে শুরু করে। এর মূল উদ্দেশ্য ছিল পুনর্বাসন, ত্রাণ, রেশন, জমি বণ্টন ও নাগরিক নথিভুক্তির প্রশাসনিক সুবিধা।

দেশভাগ মানুষকে বিভক্ত করেনি; বিভক্ত করেছিল রাজনৈতিক ক্ষমতার মানচিত্র। মানুষ, ভাষা, সংস্কৃতি ও স্মৃতি সেই বিভাজনের বহু ঊর্ধ্বে ছিল এবং আজও রয়েছে।

“সিলেট প্রশ্ন” : ইতিহাসের সবচেয়ে উপেক্ষিত সত্য
“উদ্বাস্তু বাঙালি” পরিচয় নিয়ে আলোচনা করতে গেলে “সিলেট” প্রসঙ্গ এড়িয়ে যাওয়া ইতিহাসের প্রতি অন্যায় হবে।

ঐতিহাসিকভাবে সিলেট ছিল বাংলারই অংশ। ভাষা, সংস্কৃতি, সাহিত্য, খাদ্যাভ্যাস ও সামাজিক পরিচয়ের দিক থেকে সিলেট বৃহত্তর বঙ্গীয় সভ্যতার অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ ছিল। ১৮৭৪ সালে ব্রিটিশরা প্রশাসনিক ও অর্থনৈতিক স্বার্থে সিলেটকে বাংলা প্রেসিডেন্সি থেকে বিচ্ছিন্ন করে আসাম প্রদেশের সঙ্গে যুক্ত করে।

অর্থাৎ সিলেট প্রথমে বাংলা, পরে প্রশাসনিকভাবে আসাম, তারপর দেশভাগের ফলে পূর্ব পাকিস্তান এবং পরে বাংলাদেশে অন্তর্ভুক্ত হয়।

কিন্তু এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি হল—
জমি এক হাত থেকে অন্য হাতে সরে গেলেও, তার মানুষ কি রাতারাতি বদলে যায়? নিশ্চয়ই না।
একটি ভূখণ্ডের রাজনৈতিক মালিকানা বদলাতে পারে, কিন্তু সেই ভূখণ্ডের মানুষের ইতিহাস, সংস্কৃতি, স্মৃতি ও নাগরিক সত্তা রাতারাতি বদলে যায় না।
১৯৪৭ সালের দেশভাগের ফলে লক্ষ লক্ষ সিলেটি মানুষ রাতারাতি দুই রাষ্ট্রে বিভক্ত হয়ে পড়েন। কিন্তু যারা বহু প্রজন্ম ধরে আসামে বসবাস করছিলেন, কর দিচ্ছিলেন, ব্যবসা করছিলেন, প্রশাসনে কাজ করছিলেন—তারা কীভাবে হঠাৎ “বহিরাগত” হয়ে গেলেন?

দেশভাগ ছিল রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত। কিন্তু সেই সিদ্ধান্তের শিকার মানুষদের “অনুপ্রবেশকারী” বা “উদ্বাস্তু” আখ্যা দেওয়া এক গভীর নৈতিক ও ঐতিহাসিক অসঙ্গতি।

ভারতের সিলেটিরা কারা?
ভারতের সিলেটিরা কোনও বহিরাগত জনগোষ্ঠী নন। তাঁরা এই দেশেরই নাগরিক এবং পশ্চিমবঙ্গ ও আসাম—উভয় অঞ্চলের ইতিহাস, অর্থনীতি, শিক্ষা, সাহিত্য, সংস্কৃতি ও সামাজিক বিকাশের অবিচ্ছেদ্য অংশ।

ঐতিহাসিকভাবে সিলেট প্রথমে বৃহত্তর বাংলার অংশ ছিল; পরবর্তীতে ঔপনিবেশিক প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে আসামের সঙ্গে যুক্ত হয়। ফলে সিলেটি জনগোষ্ঠীর সামাজিক ও সাংস্কৃতিক পরিচয়ের ভিত গড়ে উঠেছে বাংলা ও আসাম—উভয় ভূখণ্ডের ঐতিহাসিক অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে।

আসামের আধুনিক প্রশাসন, শিক্ষা, ব্যবসা-বাণিজ্য, চিকিৎসা, মুদ্রণ সংস্কৃতি এবং নগর সমাজ গঠনে যেমন সিলেটিদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে, তেমনি পশ্চিমবঙ্গের সাহিত্য-সংস্কৃতি, শিক্ষাক্ষেত্র ও উদ্বাস্তু-উত্তর সামাজিক পুনর্গঠনের ইতিহাসেও তাঁদের অবদান গভীরভাবে জড়িত। বরাক উপত্যকার ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে পূর্বভারতের বহু সাংস্কৃতিক ও প্রশাসনিক বিকাশের ইতিহাসে সিলেটি জনগোষ্ঠীর ভূমিকা অনস্বীকার্য।

“সিলেটি” পরিচয়ও মূলত একটি ঐতিহাসিক-সাংস্কৃতিক পরিচয়, যা ধর্মীয় বিভাজনের বহু আগেই গড়ে উঠেছিল। দেশভাগ রাজনৈতিকভাবে মানুষকে বিভক্ত করলেও ভাষা, লোকসংস্কৃতি, স্মৃতি ও আঞ্চলিক ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতা সম্পূর্ণ মুছে দিতে পারেনি।

তাই ভারতের মাটিতে বসবাসকারী সিলেটিদের “উদ্বাস্তু” বলা কেবল অপমানজনক নয়; এটি রাষ্ট্রের নিজের ইতিহাস অস্বীকার করার সামিল।

কারণ—
ভারতের সিলেটিরা আসামেরও সন্তান, বৃহত্তর বঙ্গীয় ইতিহাসেরও উত্তরাধিকারী। তাঁদের বহিরাগত বলা মানে ইতিহাসকেই অস্বীকার করা।

রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব ও ঐক্যবদ্ধ নৈতিক অবস্থানের প্রশ্ন
আজ ভারতের বিভিন্ন প্রান্তে—বিশেষত আসাম, পশ্চিমবঙ্গ, ত্রিপুরা এবং অন্যান্য রাজ্যে—অসংখ্য জনপ্রতিনিধি, বিধায়ক, সাংসদ, মন্ত্রী ও রাজনৈতিক নেতা রয়েছেন যাঁদের সামাজিক বা পারিবারিক শিকড় সিলেটি সমাজের সঙ্গে যুক্ত। তাঁরা ভিন্ন ভিন্ন রাজনৈতিক দলের সদস্য হতে পারেন, কিন্তু ইতিহাসের প্রশ্ন দলীয় সীমারেখার চেয়ে অনেক বড়।

ইতিহাসের পুনর্পাঠের প্রয়োজন
সম্ভবত সময় এসেছে দেশভাগের ইতিহাসকে নতুন করে দেখার। বিদ্বেষের দৃষ্টিতে নয়, মানবিক ও ন্যায়ভিত্তিক দৃষ্টিতে।

এই প্রেক্ষাপটে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন স্বাভাবিকভাবেই উঠে আসে—
দেশভাগের ইতিহাস, নাগরিক মর্যাদা এবং পরিচয়-সংকটের মতো মানবিক বিষয়ে কি একটি বৃহত্তর নৈতিক ঐকমত্য গড়ে তোলা সম্ভব নয়?

কারণ “ভারতের সিলেটিরা” কোনও বিচ্ছিন্ন বা অস্থায়ী জনগোষ্ঠী নন। তাঁরা এই দেশেরই মানুষ; এই দেশের অর্থনীতি, প্রশাসন, শিক্ষা, সাহিত্য, সংস্কৃতি ও রাজনৈতিক পরিসরের সক্রিয় নির্মাতা। তবু সময়ে সময়ে তাঁদের একাংশকে “উদ্বাস্তু”, “বহিরাগত”, “অনুপ্রবেশকারী”, “ঘুসপেটিয়া” ইত্যাদি অভিধায় চিহ্নিত করা হয়েছে—যা কেবল রাজনৈতিক ভাষা নয়, বহু মানুষের আত্মমর্যাদার উপরও গভীর আঘাত।

সম্ভবত সময় এসেছে রাজনৈতিক দলমতের ঊর্ধ্বে উঠে এই ঐতিহাসিক প্রশ্নটিকে নতুনভাবে দেখার। কারণ একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের শক্তি বিভাজনে নয়, বরং তার ঐতিহাসিক জনগোষ্ঠীগুলিকে মর্যাদার সঙ্গে স্বীকৃতি দেওয়ার মধ্যেই নিহিত থাকে।

ভারতের সিলেটিরা “অপর” নন। তাঁরা এই মাটিরই মানুষ।
এই ইতিহাসেরই উত্তরাধিকারী। এই দেশ ও সমাজ গঠনের সমান অংশীদার।

অসমিয়া সমাজ ও সিলেটি প্রশ্ন : সংঘাত নয়, সহাবস্থানের প্রয়োজন
এই আলোচনার উদ্দেশ্য অসমীয়া সমাজ বা তাদের ভাষাগত-সাংস্কৃতিক উদ্বেগকে অস্বীকার করা নয়। আসামের নিজস্ব ভাষা, সংস্কৃতি ও জাতিগত সত্তা রক্ষার প্রশ্নও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
কিন্তু সেই ঐতিহাসিক উদ্বেগের সমাধান কোনও জনগোষ্ঠীকে প্রজন্মের পর প্রজন্ম “বহিরাগত” আখ্যা দেওয়ার মাধ্যমে হতে পারে না। সহাবস্থান, ইতিহাসের সৎ পুনর্মূল্যায়ন এবং সাংবিধানিক নাগরিকত্বের ভিত্তিতেই দীর্ঘস্থায়ী সামাজিক সমন্বয় সম্ভব।

বর্তমান সময়ে এই তকমার প্রাসঙ্গিকতা
আজ স্বাধীনতার প্রায় আট দশক পরে বহু প্রজন্ম ভারতে জন্মেছে, বড় হয়েছে, কর দিচ্ছে, সেনাবাহিনীতে কাজ করছে, প্রশাসনে আছে, সাহিত্য-সংস্কৃতিতে অবদান রাখছে। তবু যদি তাদের “উদ্বাস্তু বাঙালি” বলা হয়, তাহলে তা কার্যত—

নাগরিক সমতার ধারণার বিরুদ্ধে যায়, সাংবিধানিক পরিচয়ের বদলে বিভাজিত পরিচয়কে জোরদার করে, নতুন প্রজন্মের মধ্যে পরিচয়-সংকট তৈরি করে, গণতান্ত্রিক সহাবস্থানকে দুর্বল করে।

একজন তৃতীয় বা চতুর্থ প্রজন্মের ভারতীয় বাঙালিকে “উদ্বাস্তু” বলা কেবল অযৌক্তিক নয়; এটি মানবিক ও রাষ্ট্রনৈতিক দিক থেকেও অসংগত।

কারণ দেশভাগ কোনও সাধারণ অভিবাসনের ঘটনা ছিল না; এটি ছিল রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের ফলে সংঘটিত এক বৃহৎ মানবিক বিপর্যয়। যারা সেই বিপর্যয়ের শিকার হয়েছিলেন, তাদের প্রজন্মের পর প্রজন্ম “আগত” হিসেবে চিহ্নিত করা ইতিহাসের অন্যায়কে দীর্ঘস্থায়ী করা ছাড়া আর কিছু নয়।

একইসঙ্গে সিলেটি সমাজেরও প্রয়োজন নিজেদের ইতিহাস, দলিল, স্মৃতি ও সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকারকে আরও সুসংগঠিতভাবে সামনে আনা। কারণ ইতিহাস যদি নীরব থাকে, তাহলে তার জায়গা দখল করে নেয় রাজনৈতিক বয়ান।

“উদ্বাস্তু বাঙালি” শব্দটি নিছক একটি প্রশাসনিক অভিধা নয়; এটি উপমহাদেশের বিভক্ত ইতিহাস, পরিচয়-রাজনীতি এবং নাগরিক মর্যাদার গভীর সংকটের প্রতীক।

ইতিহাসের সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি হল—যারা দেশভাগের শিকার হয়েছিলেন, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তাঁরাই ইতিহাসের আদালতে অভিযুক্ত হয়ে পড়েছেন।

অথচ সত্য হল—
তাঁরা এই দেশেরই মানুষ।
তাঁদের নাগরিকত্ব করুণার বিষয় নয়; এটি তাঁদের ঐতিহাসিক ও সাংবিধানিক অধিকার।

বিশেষত সিলেটের ইতিহাস আমাদের মনে করিয়ে দেয়—
ভূখণ্ডের সীমানা বদলাতে পারে,
মানচিত্র বদলাতে পারে,
শাসক বদলাতে পারে,
কিন্তু মানুষের ইতিহাস ও আত্মপরিচয় রাতারাতি বদলে যায় না।

ভারতের সিলেটিরা তাই “উদ্বাস্তু” নন।
তাঁরা এই দেশেরই মানুষ।
আসামেরও সন্তান।
বৃহত্তর বঙ্গীয় ইতিহাসেরও উত্তরাধিকারী।
দেশভাগের ক্ষত বহন করে চলা ইতিহাসের জীবন্ত সাক্ষী।
মানচিত্রের রেখা বদলাতে পারে, কিন্তু মানুষের ইতিহাসকে উদ্বাস্তু করা যায় না।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *