।। প্রদীপ দত্তরায় ।।
(লেখক ছাত্র সংগঠন আকসার প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি ও গৌহাটি হাইকোর্টের আইনজীবী)
৪ অক্টোবর : গত ২১শে সেপ্টেম্বর কেন্দ্রীয় ভুতল পরিবহন মন্ত্রী নীতিন গাড়কারি শিলচরের সাংসদ কণাদ পুরকায়স্থকে একটি চিঠির মাধ্যমে জানিয়েছেন যে শিলচর মাল্টিমডেল লজিস্টিক পার্ক নিয়ে শীঘ্রই ‘ডিটেইল ফিজিবিলিটি স্টাডি’ শুরু হতে চলেছে। এরজন্য পরামর্শদাতা নিয়োগের প্রক্রিয়া শুরু করা হচ্ছে। প্রস্তাবিত এমএলএলপির সঙ্গে বহিরাগত রেল ও সড়ক যোগাযোগের সম্ভাবনাও এই সমীক্ষায় বিশেষ ভাবে মূল্যায়ন করা হবে এবং সমীক্ষার ফলাফলের ভিত্তিতেই প্রকল্পের পরবর্তী পদক্ষেপ নির্ধারিত হবে।
এই ব্যাপারে তদ্বির করার জন্য অবশ্যই শিলচরের সাংসদের ধন্যবাদ প্রাপ্য। কিন্তু মূল ব্যাপার হচ্ছে, ২০১৮ সালে ইনল্যান্ড ওয়াটার ওয়েজ অথরিটি শিলচরকে মাল্টিমডেল লজিস্টিক পার্ক স্থাপনের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থান হিসেবে চিহ্নিত করার পর থেকে প্রায় আট বছর অতিক্রান্ত হতে চলেছে। এরমধ্যে এই প্রকল্প নিয়ে বিভিন্ন ধরনের প্রতিশ্রুতি ও রাজনৈতিক বয়ান আমরা শুনেছি। অথচ আজ ২০২৬ এ এসে আমরা ফের ফিসিবিলিটি স্টাডির কথা শুনতে পাচ্ছি। তাই এনিয়ে বিভ্রান্তি তৈরি হওয়া স্বাভাবিক।
২০১৭- ১৮ সালের দিকে কেন্দ্রের আভ্যন্তরীণ জলপথ কর্তৃপক্ষের প্রাক সম্ভাব্যতা সমীক্ষায় শিলচর ও যোগীঘোপা – এই দুই জায়গাকে উত্তর পূর্বাঞ্চলের পৃথক লজিস্টিক পার্ক কেন্দ্র হিসেবে উন্নীত করার প্রস্তাব দেওয়া হয়। এই সমীক্ষায় বলা হয়, জোগীঘোপা উত্তর অসম, অরুনাচল প্রদেশ, নাগাল্যান্ড ও ভুটানের বিস্তীর্ণ অঞ্চলকে পরিষেবা দিতে পারে। অন্যদিকে শিলচরকে দক্ষিণ আসামের বরাক উপত্যকা, ত্রিপুরা, মণিপুর ও মিজোরামের জন্য সম্ভাবনাময় কেন্দ্র হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। শিলচরের ক্ষেত্রে বরাক নদীর জাতীয় জলপথ-১৬ এবং জোগীঘোপার ক্ষেত্রে জাতীয় জলপথ-২ ,এই দুটি জলপথকে পণ্য পরিবহনের গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হিসেবে দেখা হয়েছিল।
এরপর করা হয় আরো একটি সমীক্ষা। এশীয় উন্নয়ন ব্যাঙ্ক- সমর্থিত উত্তর পূর্ব অর্থনৈতিক করিডোর সংক্রান্ত এই সমীক্ষায়ও এমএলএলপি স্থাপনের জন্য শিলচরকে সম্ভাব্য স্থান হিসেবে মান্যতা দেওয়া হয়। এই সমীক্ষায় শিলচরের বিশেষ সুবিধা হিসেবে উল্লিখিত বিষয়ের মধ্যে ছিল:
• সড়ক যোগাযোগ
• রেল যোগাযোগ
• বিমান যোগাযোগ
• বরাক নদী ও জাতীয় জলপথ -১৬
• বাংলাদেশ সীমান্তের সঙ্গে যোগাযোগ
• মণিপুর ও মায়ান্মারের দিকে যোগাযোগ
• ত্রিপুরা ও মিজোরামের সাথে আঞ্চলিক সংযোগ
এরপর ২০২০ সালে শিলচরের প্রকল্পের ‘ফিজিবিলিটি স্টাডি’ শুরু হয়। ২০২০ সালের ২৫শে ডিসেম্বর শিলচরে কেন্দ্রীয় ভুতল পরিবহন মন্ত্রী নীতিন গাড়কারি শিলচরে এমএলএলপি নির্মানের ঘোষনা করেন। শুধু তাই নয়, বলা হয় যে এজন্য হরিণছড়া গ্রামে আসাম সরকার প্রায় ২০০ বিঘা জমি দেবে।
এতদুর অবধি সব ঠিকঠাক চলছিল। কিন্তু এরপর থেকেই কোন অজ্ঞাত কারণে এই প্রকল্প নিয়ে বিভ্রান্তির সূত্রপাত হয়। ২০২২ সালের রিপোর্ট অনুযায়ী – এরজন্য শালচাপরা, শ্রীপুর ও ঘাঘরাপার এই তিনটি সম্ভাব্য স্থান হিসেবে পরীক্ষা চলছে বলা হয়। আগের হরিণ ছড়ার জমির প্রস্তাব কেন পরিত্যক্ত হল এনিয়ে কিন্তু আমরা কিছুই জানতে পারলাম না। এরমধ্যে আমরা শিলচরের বর্তমান বিধায়ক,যিনি তখন সাংসদ ছিলেন তাঁকেও এনিয়ে দৌড়ঝাঁপ করতে দেখেছি। বড়খলায় একটি সম্ভাব্য সাইট পরিদর্শনও করা হয়। কিন্তু নিটফল কিছুই দাঁড়ায়নি।
২০২৫ সালে কেন্দ্রীয় সরকার রাজ্যসভায় জানায় যে ৩৫ টি অনুমোদিত এমএলএলপির মধ্যে জোগীঘোপা, চেন্নাই, বেঙ্গালুরু, নাগপুর ও ইন্দোর – এই পাঁচটি উন্নয়নাধীন। এই তালিকায় শিলচর ছিলনা। ডিপিআর প্রস্তুত হবার পরও শিলচরের প্রকল্পকে হিমঘরে ঠেলে দেওয়া হয়েছে – ২০২৫ সালে রাজ্যসভায় এই অভিযোগও উত্থাপিত হয়।
২০১৭-১৮ সালে কেন্দ্রীয় আভ্যন্তরীণ জলপথ কর্তৃপক্ষের রিপোর্টে দুইটি প্রকল্পের সম্ভাব্যতা একই সাথে উল্লিখিত হয়েছিল। কিন্তু আজ ২০২৬এ এসে যেখানে জোগীঘোপা প্রকল্পের প্রথম পর্যায়ের (ফেস-১) কাজ সম্পুর্ন সেখানে শিলচরের ক্ষেত্রে আবার নতুন করে ফিসিবিলিটি স্টাডি শুরু হচ্ছে। কিভাবে এগিয়েছে যোগীঘোপা প্রকল্পের কাজ ? আসুন একটু দেখা নেওয়া যাক।
২০২০ সালের ১০ অক্টোবর যোগীঘোপা প্রকল্পের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করা হয়। প্রথম পর্যায়ের ব্যয় ধরা হয়েছিল ৬৯৪ কোটি টাকা। পরিকল্পনায় সড়ক, রেলপথ ও বিমান যোগাযোগের সমন্বয় ছিল।
অসম সরকার অশোক পেপার মিলের ১৯০ বিঘা জমি এই প্রকল্পের জন্য বরাদ্দ করে এবং ২০২১ সালের ফেব্রুয়ারিতে জোগীঘোপা লজিস্টিক পার্ক লিমিটেড নামে বিশেষ উদ্দেশ্যপ্রণোদিত সংস্থা (SVP) তৈরি হয়। প্রথম পর্যায়ের সড়ক,ভবন এবং রেল সাইডিং এই তিনটি প্যাকেজেরই কাজ অবিলম্বে শুরু হয়ে যায়। অর্থাৎ এইক্ষেত্রে জমি বরাদ্দ থেকে ডিপিআর,টেন্ডার এবং নির্মানের কাজ অতি দ্রুত গতিতে এগিয়েছে। ২০২১- ২২ সালে যখন এনএইচডিসিএল শিলচর প্রকল্পের ডিপিআর তথা ফিসিবিলিটি রিপোর্ট তৈরি করছে তখন যোগীঘোপা প্রকল্পের প্রথম পর্যায়ের নির্মাণ কাজ চলছে।
শুধু তাই নয়, যোগীঘোপা প্রকল্পের অংশ হিসেবে জলপথ উন্নয়নের কাজও শুরু হয় ২০২২ সালে। ‘জোগীঘোপা আভ্যন্তরীণ জলপথ পরিবহন বন্দর’ তৈরির জন্য বরাদ্দ হয় প্রায় ৬৪ কোটি টাকা। ২০২৪ এর আগস্ট মাসে কাজ শেষ হয় এবং ২০২৫ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি এর আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন কেন্দ্রীয় মন্ত্রী সর্বানন্দ সনোয়াল। ২০২৪ সালের এনএইচডিসিএল এর প্রকল্প তথ্য অনুযায়ী জোগীঘোপার সড়ক,ভবন, পরিকাঠামো, রেলপথ সাইডিং এবং বন্দর নির্মাণ সবগুলির প্রথম পর্যায়ের কাজই সম্পন্ন হয়েছে।
শিলচরের লজিস্টিক পার্কের সম্ভাবনার অভাব ছিল এমন কথা এশীয় উন্নয়ন ব্যাঙ্কের সমীক্ষা সমর্থন করেনা। বরং সেই রিপোর্টে শিলচরের সড়ক, রেল, বিমান ও জলপথের সংযোগকে তার অন্যতম শক্তি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
যা দরকার ছিল দ্রুত জমি নির্ধারণ, তাঁর সাথে রেল ও জাতীয় সড়কের সংযোগ, জলপথকে ব্যাবহার যোগ্য করে তোলা,বন্দর নির্মাণ, সম্ভাব্য পন্য পরিবহনের চাহিদা নির্ধারণ এবং বিনিয়োগ ও পরিচালনার অবকাঠামো তৈরি করা। এই সমস্ত ব্যাপারে দ্রুত ও কার্যকরী সিদ্ধান্তের জন্যই যোগীঘোপা প্রকল্প এগিয়ে গেছে যেখানে শিলচরের প্রকল্প সমীক্ষার পর্যায়ে রয়ে গেছে। যেহেতু অনেক বছর পেরিয়ে গেছে,তাই পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে আবার নতুন করে ফিজিবিলিটি স্টাডির প্রয়োজন দেখা দিয়েছে। এবং এই সমীক্ষায় উপরোক্ত বিষয়গুলোই আবার খতিয়ে দেখা হবে।
শিলচরের আশেপাশে ২০০ বিঘা জমি পাওয়া দুষ্কর ছিল এই যুক্তি বিশ্বাস করা মুশকিল। একটা সময় এই উদ্দেশ্যে পাচগ্রাম কাগজকলের জমিও প্রস্তাবিত হয়েছিল। তাই এরজন্য স্থানীয় জনপ্রতিনিধি তথা রাজ্য সরকারের প্রয়োজনীয় রাজনৈতিক সদিচ্ছা, কার্যকরী চাপ সৃষ্টি তথা উদ্যোগের অভাবই মূল কারণ বলে অনুমান করা যায়।
নতুন সম্ভাব্যতা সমীক্ষায় কি চিত্র উঠে আসবে তা অজ্ঞাত। তবে যদি রিপোর্টে শিলচর মাল্টিমডেল লজিস্টিক পার্কের উজ্জ্বল সম্ভাবনা রয়েছে বলে উল্লেখিত হয়, তারপরও এর বাস্তবায়ন দ্রুতগতিতে সম্পাদন করার জন্য কার্যকরী পদক্ষেপ গৃহীত হবে, নাকি আগের মতোই ঢিমেতালে কাজ চলবে সেটাই বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে।
মাল্টিমডেল লজিস্টিক পার্কের বাস্তবায়ন বরাকের অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা নিতে পারে। তাই এই ব্যাপারে জনমত তৈরি করে জনপ্রতিনিধি ও সরকারের উপর চাপ সৃষ্টি করতে হবে জনগনকেই। এছাড়া কোন বিকল্প নেই।
(মতামত লেখকের ব্যক্তিগত)



