অশোক সিঙ্ঘলজিও- এক কর্মযোগী

Spread the news

।। দত্তাত্রেয় হোসবালে ।।
(সরকার্যবাহ, রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘ)
৪ অক্টোবর : ভারতের জন্য এটি যুগ-নির্মাণের কাল। সমগ্র দেশ এক নতুন আত্মবিশ্বাস নিয়ে নতুন ভারত গড়ার সংকল্প নিচ্ছে। ভারত আত্মগ্লানি থেকে বেরিয়ে আত্মগৌরবের দিকে এগিয়ে চলেছে এবং তার স্ববোধ জাগ্রত হচ্ছে। এই পরিবর্তনকে ভারতের পুনরুত্থান বলা যেতে পারে।

যেসব মহাপুরুষের অক্লান্ত প্রচেষ্টায় ভারতের স্ববোধ জাগ্রত হয়েছে এবং হিন্দু সমাজে আত্মবিশ্বাসের সঞ্চার হয়েছে, তাঁদের মধ্যে মাননীয় অশোক সিঙ্ঘলজির নাম প্রথম সারিতে আসে। তাঁর প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে সমাজ তাঁকে নানা বিশেষণে ভূষিত করেছে, কেউ তাঁকে বলেছেন হিন্দু হৃদয় সম্রাট, কেউ রাম জন্মভূমি আন্দোলনের পুরোধা, কেউ হিন্দু পুনরুত্থানের নায়ক, তো কেউ রাষ্ট্র জাগরণ অভিযানের সেনাপতি।

কিন্তু যদি অশোকজির ব্যক্তিত্বের পরিচয় একটিমাত্র শব্দে দিতে হয়, তবে সেই শব্দটি হলো- কর্মযোগী।

তিনি নিষ্কাম ভাবে কর্ম করতেন। কোনও কাজে সাফল্য এলে তার কৃতিত্ব নিজে না নিয়ে ঈশ্বরকে সমর্পণ করতেন এবং সাফল্য থেকে পাওয়া খ্যাতি থেকে নিজেকে নির্লিপ্ত রাখতেন। খ্যাতির শিখরে পৌঁছেও তিনি কখনও খ্যাতির আকাঙ্ক্ষা করেননি। তাঁর উপস্থিতিতে যদি তাঁর প্রশংসা করা হতো, তিনি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করতেন না। মান-অপমান, যশ-অপযশের ঊর্ধ্বে উঠে নিজের কর্তব্যের পথে সমভাব নিয়ে চলাই এক কর্মযোগী এবং সত্যিকারের স্বয়ংসেবকের পরিচয়, আর এই গুণ অশোকজির জীবনে স্পষ্টভাবে দেখা যেত।

প্রতিভার রাষ্ট্রকার্যে সমর্পণ : অশোকজি ছিলেন অসাধারণ প্রতিভার অধিকারী এবং তীক্ষ্ণ বুদ্ধিসম্পন্ন ছাত্র। কিন্তু তাঁর মেধা ব্যক্তিগত জীবনের উন্নতির জন্য নয়, বরং রাষ্ট্রের উত্থানের জন্য সমর্পিত ছিল।

তিনি এক প্রতিষ্ঠিত ও প্রবুদ্ধ পরিবারে জন্মগ্রহণ করেছিলেন। তাঁর এক ভাই ভারতীয় পুলিশ সেবায় ছিলেন এবং উত্তরপ্রদেশের পুলিশ মহানির্দেশক পদ পর্যন্ত পৌঁছেছিলেন, অন্য ভাইয়েরা সফল ব্যবসায়ী ও শিল্পপতি হয়েছিলেন। অশোকজি নিজে বেনারস হিন্দু বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ধাতুবিজ্ঞানে ইঞ্জিনিয়ারিং শিক্ষা লাভ করেছিলেন। তাঁর সামনে ব্যক্তিগত জীবনে উন্নতির অনেক সুযোগ ছিল, কিন্তু তিনি নিজের জীবন সম্পূর্ণভাবে রাষ্ট্রের প্রতি সমর্পণ করেছিলেন।

তিনি মূলত আধ্যাত্মিক প্রকৃতির মানুষ ছিলেন। স্বামী বিবেকানন্দের মতো তিনিও নিজের জন্য কিছু পাওয়ার পরিবর্তে সমাজ ও রাষ্ট্রের জন্য নিজের জীবন উৎসর্গ করেছিলেন। তাঁর সাধনার কেন্দ্র নিজে ছিলেন না, ছিল সমাজ ও রাষ্ট্র।

সংঘ সংস্কারে গড়া ব্যক্তিত্ব : অশোকজি ছাত্রজীবনেই রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘের সংস্পর্শে আসেন। প্রাথমিক জীবনে তিনি পূজনীয় প্রফেসর রাজেন্দ্র সিংহ ‘রজ্জু ভাইয়া’র মার্গদর্শন পাওয়ার সৌভাগ্য লাভ করেন। মাননীয় ভাউরাও দেওরস এক দক্ষ শিল্পীর মতো তাঁর ব্যক্তিত্বকে গড়ে তোলেন। তিনি পূজনীয় গুরুজীর মার্গদর্শনও নিরন্তর পেয়েছেন।

তাঁর সমর্পণ, কর্মঠতা, দৃঢ় সংকল্প, পরিচালন দক্ষতা, সংগঠন-কুশলতা এবং দূরদর্শিতায় এই মহাপুরুষদের মার্গদর্শনের স্পষ্ট ছাপ দেখা যেত। ইঞ্জিনিয়ারিং শিক্ষা শেষ করেই তিনি সংঘের প্রচারক হয়ে যান। তাঁকে যে দায়িত্বই দেওয়া হতো, তিনি তা পূর্ণ নিষ্ঠা ও পরিশ্রমের সঙ্গে পালন করতেন। মনে হতো যেন তিনি সেই দায়িত্বের জন্যই তৈরি হয়েছেন।

বিরাট হিন্দু সম্মেলন এবং বিশ্ব হিন্দু পরিষদের দায়িত্ব :
যখন তিনি দিল্লি প্রান্ত, যার মধ্যে দিল্লি ও হরিয়ানা ছিল, তার প্রান্ত প্রচারক ছিলেন, তখন মীনাক্ষীপুরমের ধর্মান্তরণের ঘটনা সমগ্র সমাজকে উদ্বিগ্ন করে। হিন্দু সমাজের ব্যাপক জাগরণের প্রয়োজন অনুভব করা হচ্ছিল।

মাননীয় অশোকজিকে দিল্লিতে বিরাট হিন্দু সম্মেলনের আয়োজনের দায়িত্ব দেওয়া হয়। ড. করণ সিংহ সহ সমাজের বিভিন্ন বর্গকে সঙ্গে নিয়ে তিনি এই বিরাট হিন্দু সম্মেলনের পরিকল্পনাকে বাস্তবায়িত করেন। পূজনীয় সন্তদের মার্গদর্শনে সমাজের বিভিন্ন বর্গকে যুক্ত করে যে দক্ষতার সঙ্গে এত বিশাল অনুষ্ঠান আয়োজন করা হয়েছিল, তাতে অশোক জীর সংগঠন-ক্ষমতার পরিচয় পুরো সমাজ পায়।

এই আয়োজনের মাধ্যমে সমাজে ধর্মান্তরণের চ্যালেঞ্জের প্রতি দায়িত্ববোধ জাগ্রত হয়। এরপর ধর্মীয় ও সামাজিক ক্ষেত্রে ব্যাপক জাগরণের জন্য তাঁকে বিশ্ব হিন্দু পরিষদের দায়িত্ব দেওয়া হয়।

তিনি এই দায়িত্বও একই কর্মঠতা ও সমর্পণের সঙ্গে পালন করেন। সমাজের পরিস্থিতি বোঝা, তার অনুযায়ী চিন্তা করা, পরিকল্পনা তৈরি করা এবং তা বাস্তবে রূপ দেওয়া, এটাই ছিল তাঁর কাজের বৈশিষ্ট্য।

সমরস হিন্দু সমাজ নির্মাণের প্রচেষ্টা : হিন্দু সমাজের সামনে শতাব্দী ধরে অস্পৃশ্যতা একটি গুরুতর সামাজিক চ্যালেঞ্জ হয়ে রয়েছে। অস্পৃশ্যতা শেষ না হলে সমরস সমাজের কল্পনা পূর্ণ হতে পারে না।

অশোকজি এই বিষয়টিকে কেবল সম্মিলিত ভোজ বা প্রতীকী অনুষ্ঠানের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখেননি। তিনি পূজনীয় সন্তদের কাছে হিন্দু সমাজকে এই বার্তা দেওয়ার অনুরোধ করেন যে অস্পৃশ্যতা হিন্দু ধর্মের মূল আদর্শের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। সন্তদের তপশিলি সমাজের বস্তিতে প্রবাস শুরু হয়। এই বিষয়ে অধ্যয়ন ও আলোচনাকেও এগিয়ে নেওয়া হয়।

৯ নভেম্বর ১৯৮৯ সালে অযোধ্যায় রাম জন্মভূমি মন্দিরের শিলান্যাস অনুষ্ঠানে তপশিলি সমাজের কামেশ্বর চৌপালের ভূমিকা এই ব্যাপক সামাজিক সমরসতার বার্তার সঙ্গেই যুক্ত ছিল। সেখানে অনেক পূজনীয় সন্ত ও ধর্মাচার্য উপস্থিত ছিলেন। একইভাবে বারাণসীতে ডোম রাজার বাড়িতে পূজনীয় সন্তদের ভোজন করাও সামাজিক সমরসতার বার্তার একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ হয়ে ওঠে।

এই প্রচেষ্টাগুলি সমাজে এই বিশ্বাসকে দৃঢ় করতে সাহায্য করেছে যে সামাজিক বৈষম্য দূর করে সমরস হিন্দু সমাজ নির্মাণ করা সম্ভব।

রাম জন্মভূমি আন্দোলন এবং অশোকজি : রাম জন্মভূমি আন্দোলন আধুনিক ভারতের সবচেয়ে ব্যাপক সামাজিক-ধর্মীয় আন্দোলনগুলির মধ্যে একটি ছিল। ১৯৮০-র দশক থেকে ২০১৯ সালের সুপ্রিম কোর্টের রায় এবং তার পরবর্তী মন্দির নির্মাণ পর্যন্ত এর অনেক গুরুত্বপূর্ণ পর্যায় রয়েছে।

রাম-জানকী রথযাত্রা, শিলা-পূজন, চরণ-পাদুকা পূজন, রামজ্যোতির মতো নানা কর্মসূচির মাধ্যমে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ব্যাপক জনজাগরণ হয়।

এই পুরো আন্দোলনে অশোকজির ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছিল। ১৯৯০ সালের কারসেবার সময় উদ্ভূত পরিস্থিতি এবং বহু কার্যকর্তার বলিদান আন্দোলনকে এক নির্ণায়ক মোড় দেয়। কঠিন পরিস্থিতিতেও অশোক জীর দৃঢ় বিশ্বাস কার্যকর্তাদের জন্য প্রেরণার উৎস হয়ে ছিল।

তাঁর বিশ্বাস ছিল –
“এটি রামজির কাজ, রাম জি-ই এই কাজ অবশ্যই সম্পূর্ণ করবেন।”

তাঁর জীবদ্দশায় মন্দির নির্মাণ সম্পূর্ণ হয়নি, কিন্তু যে আন্দোলনকে তিনি দশকের পর দশক ধরে দিশা, সংগঠন ও শক্তি দিয়েছিলেন, তার ফল তাঁর মৃত্যুর পর বাস্তবায়িত হয়। ৯ নভেম্বর ২০১৯-এ সুপ্রিম কোর্টের রায়ের পর শ্রীরাম জন্মভূমিতে মন্দির নির্মাণের পথ প্রশস্ত হয় এবং ৫ আগস্ট ২০২০-তে ভূমিপূজন হয়ে ২২ জানুয়ারি ২০২৪-এ শ্রীরাম লালার প্রাণ প্রতিষ্ঠা হয় এবং আজ সেখানে ভব্য মন্দির নির্মিত হয়েছে।

কেবল রাম জন্মভূমি পর্যন্ত সীমাবদ্ধ নয় : অশোকজির পরিচয় রাম জন্মভূমি আন্দোলনের প্রধান নেতা হিসেবে তৈরি হলেও, তাঁর কর্মক্ষেত্র এর চেয়ে অনেক ব্যাপক ছিল।

রামসেতু রক্ষা, অমরনাথ যাত্রা, গো-গবেষণা ও গোবংশ সংবর্ধন, সামাজিক সমরসতা, প্রবুদ্ধ বর্গকে হিন্দু চিন্তার সঙ্গে যুক্ত করা এবং বিভিন্ন সামাজিক ও জাতীয় বিষয়ে জনজাগরণ, এই সব ক্ষেত্রে তাঁর উদ্যোগ ও মার্গদর্শন উল্লেখযোগ্য ছিল।

তিনি ধাতুবিজ্ঞানের বিজ্ঞানী ছিলেন, কিন্তু সমাজের প্রকৃতি, তার ক্ষমতা ও তার চ্যালেঞ্জগুলি বোঝার দৃষ্টিও তাঁর অত্যন্ত গভীর ছিল। তাঁর কার্যপদ্ধতিতে বৈজ্ঞানিক দৃষ্টি, সংগঠন-দক্ষতা, আধ্যাত্মিক আস্থা এবং রাষ্ট্রভক্তির এক অপূর্ব সমন্বয় দেখা যেত।

যুগদ্রষ্টা কর্মযোগী : অশোক জীর ব্যক্তিত্বের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য ছিল, তিনি কোনো সাফল্যে থেমে থাকতেন না। একটি লক্ষ্য অর্জিত হলেই তিনি পরবর্তী লক্ষ্যের দিকে এগিয়ে যেতেন। তিনি সমাজের সামনে থাকা প্রতিটি চ্যালেঞ্জকে গ্রহণ করতেন এবং তার সমাধানের জন্য সমাজকে সংগঠিত করতে লেগে যেতেন।

তাঁর কাছে সংগঠন ছিল সাধন, সমাজ ছিল সাধ্য এবং রাষ্ট্রসেবা ছিল জীবনের উদ্দেশ্য।

তিনি নিজের ব্যক্তিগত জীবনের সম্ভাবনাকে ত্যাগ করে রাষ্ট্রকার্যকে বেছে নিয়েছিলেন। তিনি খ্যাতি পেয়েছিলেন, কিন্তু খ্যাতি থেকে নিজেকে আলাদা রেখেছিলেন। তিনি নেতৃত্ব দিয়েছিলেন, কিন্তু কৃতিত্ব নিজে নেওয়ার প্রত্যাশা রাখেননি। তিনি সংগ্রাম করেছিলেন, কিন্তু ব্যক্তিগত স্বার্থের জন্য নয়।

এই কারণেই অশোক সিঙ্ঘলজির জীবন কেবল একজন ব্যক্তির জীবন নয়, বরং সমর্পণ, সাধনা, সংগঠন এবং কর্মযোগের এক প্রেরণাদায়ী অধ্যায়।

ভারতের বর্তমান পুনরুত্থানে যে মহাপুরুষদের তপস্যা, ত্যাগ ও পুরুষার্থের অবদান রয়েছে, অশোকজি তাঁদের মধ্যে অগ্রণী। তিনি হিন্দু সমাজে আত্মবিশ্বাস জাগাতে, সামাজিক সমরসতা এগিয়ে নিতে এবং রাষ্ট্রচেতনাকে সুদৃঢ় করতে নিজের পুরো জীবন উৎসর্গ করে দিয়েছিলেন।

তাই তাঁকে কেবল রাম জন্মভূমি আন্দোলনের মহানায়ক হিসেবে দেখা তাঁর বিরাট ব্যক্তিত্বকে সীমিত করা হবে।

তিনি প্রকৃতপক্ষে এক কর্মযোগী ছিলেন, এমন এক কর্মযোগী যাঁর জীবন আগামী প্রজন্মকে নিরন্তর প্রেরণা দিয়ে যাবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *