দেশাত্মবোধক গানে মুখরিত শিলচর, দেশভক্তি দিবসে তরুণরাম ফুকনকে আবেগঘন শ্রদ্ধার্ঘ্য

Spread the news

বরাক তরঙ্গ, ২৮ জুলাই : স্বাধীনতা সংগ্রামের অন্যতম পুরোধা, অসমের কিংবদন্তি দেশভক্ত তরুণরাম ফুকনের ৮৭তম প্রয়াণবার্ষিকী উপলক্ষে মঙ্গলবার শিলচরে দেশভক্তি দিবস যথাযোগ্য মর্যাদায় পালিত হয়। কাছাড় জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে এবং অসম সরকারের তথ্য ও জনসংযোগ বিভাগের বরাক উপত্যকার আঞ্চলিক কার্যালয়ের সহযোগিতায় জেলা আয়ুক্তের কার্যালয়ের পুরনো সম্মেলন কক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে দেশাত্মবোধক গানের আবেগঘন পরিবেশনা, স্মৃতিচারণ এবং আলোচনার মধ্য দিয়ে মহান স্বাধীনতা সংগ্রামীর প্রতি গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন করা হয়। অনুষ্ঠানের সূচনাতেই দেশভক্ত তরুণরাম ফুকন উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয় এবং গুরুচরণ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীদের কণ্ঠে দেশাত্মবোধক সংগীত পরিবেশিত হয়। তাঁদের হৃদয়স্পর্শী পরিবেশনায় সমগ্র সভাকক্ষ দেশপ্রেম, আত্মত্যাগ এবং জাতীয় চেতনার আবহে মুখরিত হয়ে ওঠে।

অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন কাছাড়ের অতিরিক্ত জেলা কমিশনার জাগৃতি কালওয়ার, এসিএস। স্বাগত ভাষণে তিনি বলেন, দেশভক্ত তরুণরাম ফুকন কেবল স্বাধীনতা সংগ্রামী নন, তিনি ছিলেন দূরদর্শী রাষ্ট্রনায়ক, সমাজসংস্কারক এবং জনকল্যাণে নিবেদিত এক আদর্শ ব্যক্তিত্ব। তাঁর সাহস, নেতৃত্ব এবং দেশপ্রেম নতুন প্রজন্মের কাছে আজও অনুপ্রেরণার উৎস। তিনি বলেন, তরুণ প্রজন্মের কাছে তাঁর জীবনাদর্শ পৌঁছে দেওয়াই আজকের সময়ের অন্যতম প্রয়োজন।

অনুষ্ঠানের মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন গুরুচরণ বিশ্ববিদ্যালয়ের অসমিয়া সাহিত্য বিভাগের প্রধান ড. আশরাফ হোসেন। তিনি দেশভক্ত তরুণরাম ফুকনের জীবন, সাহিত্যচর্চা এবং স্বাধীনতা আন্দোলনে তাঁর ঐতিহাসিক অবদানের বিশদ পর্যালোচনা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, কারাবাসের সময় রচিত তাঁর ভক্তিমূলক কাব্যগ্রন্থ ‘স্তুতিমালা’ শুধু সাহিত্যকর্ম নয়, বরং স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা ও আত্মিক শক্তির এক অনন্য দলিল। পাশাপাশি ১৯২৬ সালে গুয়াহাটির পান্ডুতে অনুষ্ঠিত ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের ঐতিহাসিক অধিবেশনে তাঁর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকার কথাও তুলে ধরেন তিনি।

বিশিষ্ট সাহিত্যিক দীপঙ্কর ঘোষ বলেন, ১৯২১ সালে শিলচর কারাগারে বন্দি অবস্থায় তরুণরাম ফুকন যে দেশাত্মবোধক কবিতা ও স্তোত্র রচনা করেছিলেন, তা পরবর্তীকালে অসমিয়া সাহিত্য এবং স্বাধীনতা আন্দোলনের ইতিহাসে অমূল্য সম্পদ হিসেবে স্থান পেয়েছে। তাঁর মতে, সাহিত্য ও দেশপ্রেমকে একসূত্রে গেঁথে জাতীয় চেতনা জাগিয়ে তুলতে তরুণরাম ফুকনের অবদান আজও সমান প্রাসঙ্গিক।

জেলা বার অ্যাসোসিয়েশনের সহ-সভাপতি ও বিশিষ্ট আইনজীবী তুহিনা শর্মা তাঁর বক্তব্যে বলেন, তরুণরাম ফুকন শুধু একজন রাজনৈতিক নেতা ছিলেন না; তিনি ছিলেন ন্যায়বিচার, মানবিকতা ও সাংবিধানিক মূল্যবোধের এক বলিষ্ঠ প্রবক্তা। তিনি আইনের মাধ্যমে সমাজের বঞ্চিত মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য আজীবন সংগ্রাম করেছেন। তাঁর মতে, প্রকৃত দেশপ্রেমের ভিত্তি হচ্ছে সততা, সাহস এবং মানুষের প্রতি দায়বদ্ধতা।

শিলচর উইমেন্স কলেজের অধ্যক্ষ ড. সুজিত কুমার তিওয়ারি বলেন, দেশভক্ত তরুণরাম ফুকন ব্যক্তিগত সাফল্য ও আর্থিক স্বাচ্ছন্দ্যের ঊর্ধ্বে উঠে দেশের স্বাধীনতার জন্য নিজেকে উৎসর্গ করেছিলেন। তিনি ভাষাগত সম্প্রীতির প্রবল সমর্থক ছিলেন এবং মহাত্মা গান্ধীর বক্তব্য অসমীয়ায় অনুবাদ করে সাধারণ মানুষের কাছে স্বাধীনতার বার্তা পৌঁছে দিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন। পাশাপাশি চা-শ্রমিকদের অধিকার রক্ষায় এবং বিভিন্ন গণআন্দোলনে তাঁর সক্রিয় অংশগ্রহণের কথাও তিনি স্মরণ করেন।

দেশভক্ত তরুণরাম ফুকন উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের অধ্যক্ষ বিজয় সোনার বলেন, যে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান একজন মহান স্বাধীনতা সংগ্রামীর নাম বহন করে, তার দায়িত্ব কেবল শিক্ষাদান নয়, শিক্ষার্থীদের মধ্যে দেশপ্রেম, চরিত্রগঠন ও মানবিক মূল্যবোধ গড়ে তোলাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। অন্যদিকে, শিলচর কাছাড় কলেজের অধ্যক্ষ ড. অপ্রতিম নাগ বলেন, তরুণ রাম ফুকনের জীবন ও কর্ম আগামী প্রজন্মকে দেশগঠনের পথে অনুপ্রাণিত করবে।

অনুষ্ঠানে শিক্ষাবিদ, গবেষক, সাহিত্যিক, আইনজীবী, প্রশাসনিক আধিকারিক, শিক্ষক-শিক্ষিকা, ছাত্রছাত্রী এবং সমাজের বিভিন্ন স্তরের বিশিষ্ট ব্যক্তিরা উপস্থিত ছিলেন। আলোচকরা একবাক্যে বলেন, স্বাধীনতা আন্দোলনে তরুণরাম ফুকনের আত্মত্যাগ, নেতৃত্ব এবং সাহিত্যচর্চা আজও জাতীয় চেতনার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।

আলোচনা পর্বের শেষে ছাত্রছাত্রীদের পরিবেশিত দেশাত্মবোধক সংগীত উপস্থিত সকলকে আবেগাপ্লুত করে তোলে। করতালির মধ্য দিয়ে তাঁরা মহান স্বাধীনতা সংগ্রামীর প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। অনুষ্ঠানের সমাপ্তিতে অতিরিক্ত জেলা কমিশনার জাগৃতি কালওয়ার সকল বক্তা, অতিথি ও অংশগ্রহণকারীদের ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেন। সমগ্র অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন বিপ্লব বিশ্বাস। তাঁর সাবলীল উপস্থাপনা অনুষ্ঠানের গাম্ভীর্য ও সৌন্দর্য বজায় রাখতে বিশেষ ভূমিকা রাখে। দেশভক্তি দিবস উপলক্ষে আয়োজিত এই অনুষ্ঠান শুধু একজন মহান স্বাধীনতা সংগ্রামীকে স্মরণ করার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেনি; বরং নতুন প্রজন্মের কাছে দেশপ্রেম, আত্মত্যাগ, মানবিকতা ও জাতীয় চেতনার মূল্যবোধ পৌঁছে দেওয়ার এক গুরুত্বপূর্ণ বার্তা বহন করেছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *