২৩ সেপ্টেম্বর : মুখ্য নির্বাচন কমিশনার এবং অন্য নির্বাচন কমিশনারদের নিয়োগ নিয়ে ২০২৩ সালের আইনের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করা মামলায় বুধবার সুপ্রিম কোর্টের (Supreme Court) দুই বিচারপতির বেঞ্চ কোনও রায় দিল না। দুই বিচারপতি পরস্পরবিরোধী মত জানানোয় তাঁরা মামলাটি পাঠাচ্ছেন প্রধান বিচারপতির এজলাসে। সেখানেই ঠিক হবে, সাংবিধানিক বেঞ্চ গঠন করে এই মামলার শুনানি হবে কি না।
বিচারপতি দীপঙ্কর দত্ত ও বিচারপতি সতীশচন্দ্র শর্মার বেঞ্চে এই মামলার শুনানি চলছিল টানা কয়েক দিন ধরে। কেন্দ্রের তরফে সলিসিটর জেনারেল তুষার মেহতা (Tushar Mehta) দাবি তুলেছিলেন, সাংবিধানিক প্রশ্ন জড়িয়ে থাকায় মামলাটি বড় বেঞ্চে পাঠানো হোক। গত ৩০ জুলাই সেই দাবির রায়দান স্থগিত রেখেছিল বেঞ্চ। বুধবার সেই রায় ঘোষণা হয়, আর তাতেই উঠে আসে বিচারপতিদের মতপার্থক্য।
বিচারপতি দত্ত কেন্দ্রের আর্জি খারিজ করে দেন। উল্টো দিকে বিচারপতি শর্মা মনে করেন, বিষয়টিতে গুরুত্বপূর্ণ আইনি প্রশ্ন জড়িয়ে, তাই বড় বেঞ্চেই যাওয়া উচিত। এই মতানৈক্যের জেরে দুই বিচারপতি নিজেরাই স্বীকার করে নেন, পাঁচ দিন ধরে মামলা শোনার পরেও তাঁরা এক সুরে রায় দিতে পারলেন না। প্রাতিষ্ঠানিক সংহতির স্বার্থে এক মত হওয়াই বাঞ্ছনীয় ছিল বলে বেঞ্চ নিজেই মন্তব্য করে। শেষমেশ গোটা বিষয়টি পাঠানো হয় প্রধান বিচারপতির কাছে।
রায়ে বিচারপতি দত্তের পর্যবেক্ষণ ছিল রীতিমতো তাৎপর্যপূর্ণ। তাঁর বক্তব্য, শাসকেরাও আইনের ঊর্ধ্বে নন, এটাই সংবিধানের ভিত্তি। নির্বাচন কমিশন (Election Commission of India) শুধু স্বাধীন হলে চলবে না, এটা মানুষেরও মনে হওয়া দরকার যে কমিশন স্বাধীন, নিরপেক্ষ। ২০২৩ সালের আইন অনুযায়ী কমিশনার বাছাই কমিটিতে রয়েছেন প্রধানমন্ত্রী, বিরোধী দলনেতা এবং একজন কেন্দ্রীয় মন্ত্রী। বিচারপতি দত্তের প্রশ্ন, প্রধানমন্ত্রীরই মনোনীত মন্ত্রী কী করে মন্ত্রিসভার সম্মিলিত দায়বদ্ধতার নিয়ম ভেঙে নিজের নেতার বিরুদ্ধে মত দেবেন। ফলে বাছাই কমিটিতে প্রকৃত ভারসাম্য নেই বলেই তাঁর পর্যবেক্ষণ। তাঁর মতে, এই কমিটি কার্যত একটা আনুষ্ঠানিকতার বাইরে আর কিছুই নয়। কারণ সংগত কারণেই সরকারপক্ষ ২-১ ভোটে সব সময় জিতবে।
বিচারপতি দত্তের এই মন্তব্য আসলে গোটা নিয়োগ কাঠামোর দিকেই আঙুল তোলে। প্রধান বিচারপতিকে বাদ দিয়ে দেওয়ায়, সরকারপন্থী দু’জন এবং বিরোধী দলনেতা এই তিন সদস্যের কমিটিতে ক্ষমতার ভারসাম্য কার্যত সরকারের পক্ষেই হেলে থাকে, শুনানি চলাকালীন বেঞ্চ নিজেই আগে এই আশঙ্কা প্রকাশ করেছিল।
গোটা বিতর্কের শিকড় লুকিয়ে ২০২৩ সালের অনুপ বরনওয়াল বনাম ভারত সরকার (Anoop Baranwal vs Union of India) মামলার রায়ে। সেই সাংবিধানিক বেঞ্চ নির্দেশ দিয়েছিল, সংসদ আইন প্রণয়ন না করা পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রী, বিরোধী দলনেতা এবং প্রধান বিচারপতিকে নিয়ে কমিটি গড়েই কমিশনার নিয়োগ হবে। কিন্তু কেন্দ্র নতুন আইন এনে সেই কমিটি থেকে প্রধান বিচারপতিকেই বাদ দিয়ে দেয়, বদলে বসিয়ে দেয় নিজেদের পছন্দের এক মন্ত্রীকে। মামলাকারীদের অভিযোগ, এতে সুপ্রিম কোর্টের রায়ের মূল চেতনাটাই লঙ্ঘিত হয়েছে।
শুনানিতে সলিসিটর জেনারেল যুক্তি দেন, বরনওয়াল রায় ছিল সাময়িক ব্যবস্থা মাত্র, আইনি শূন্যতা পূরণের জন্য। আইন তৈরি হয়ে যাওয়ার পর সেই সাময়িক নির্দেশের আর কোনও প্রাসঙ্গিকতা নেই বলেই কেন্দ্রের দাবি। যদিও শুনানির সময়েই বেঞ্চ একাধিকবার প্রশ্ন তুলেছিল, স্বাধীন নির্বাচন কমিশন নিশ্চিত করতে সরকার কেন উপযুক্ত আইন আনল না এত বছরেও।
মতপার্থক্যের জেরে মামলাটি এখন যাচ্ছে প্রধান বিচারপতির বেঞ্চে। সেখানেই স্থির হবে, পাঁচ বিচারপতির সাংবিধানিক বেঞ্চ গঠন করে ২০২৩ সালের গোটা আইনটির বৈধতা নিয়ে চূড়ান্ত শুনানি হবে কি না। ততদিন নির্বাচন কমিশনার নিয়োগ নিয়ে অনিশ্চয়তা কাটছে না। বিরোধী শিবিরের বহু আইনজীবীর বক্তব্য, নির্বাচন কমিশনের মতো একটি প্রতিষ্ঠানের নিরপেক্ষতা নিয়ে বারবার প্রশ্ন ওঠাটাই বলে দেয়, আইনের কাঠামোয় গলদ রয়ে গিয়েছে। প্রশ্ন থেকে যাচ্ছে, দেশের গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানের নিরপেক্ষতা রক্ষার দায় শেষ পর্যন্ত সরকার নেবে, নাকি ফের আদালতকেই হস্তক্ষেপ করতে হবে।



