পাথারকান্দির গর্ব শিক্ষাবিদ কোকিলসেনা সিনহাকে মরণোত্তর সম্মাননা গোকুলানন্দ কলাকৃষ্টি কেন্দ্রের

Spread the news

মোহাম্মদ জনি, পাথারকান্দি। 
বরাক তরঙ্গ, ২৯ নভেম্বর : পাথারকান্দির গর্ব ও কৃতীসন্তান প্রয়াত কোকিলসেনা সিনহাকে গীতিস্বামী গোকুলানন্দ কলাকৃষ্টি কেন্দ্রের পক্ষ থেকে মরণোত্তর সম্মাননায় ভূষিত। পাথারকান্দি সিঙ্গারীর কোকিলসেনা সিনহাকে মরণোত্তর সম্মাননা প্রদান করা হবে ১৩০তম গীতিস্বামী আবির্ভাব তিথিতে। শিক্ষা, সমাজসেবা ও মানবিকতার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হয়ে থাকা পাথারকান্দির বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ প্রয়াত কোকিল সেনা সিনহাকে মরণোত্তর সম্মাননা প্রদান করছে গীতিস্বামী গোকুলানন্দ কলাকৃষ্টি কেন্দ্র, গুয়াহাটি। সংস্থার রূপালী জয়ন্তীবর্ষ এবং বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরি সাহিত্য-সংস্কৃতির অন্যতম পথিকৃৎ চারণকবি গোকুলানন্দ গীতিস্বামীর ১৩০তম আবির্ভাব তিথি উপলক্ষ্যে আয়োজিত বৃহৎ সাংস্কৃতিক ও স্মারক অনুষ্ঠানে আগামীকাল ৩০ নভেম্বর, গুয়াহাটির পাঞ্জাবাড়ি শিল্পগ্রাম প্রেক্ষাগৃহে এই সম্মাননা তাঁর পরিবারের হাতে তুলে দেওয়া হবে। অনুষ্ঠানে সহযোগিতা করছে নিখিল বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরি যুব পরিষদ এবং বৃহত্তর গুয়াহাটি যুব সমাজ। আয়োজকদের মতে, “এই সম্মাননা কেবল একজন ব্যক্তিকে নয়—সমগ্র পাথারকান্দিকে, সেই অঞ্চলের শিক্ষাচর্চা ও উন্নয়ন ভাবনাকেই সম্মানিত করছে। পাথারকান্দিতে আনন্দের বন্যা  এক শিক্ষাগুরুর প্রতি সমাজের কৃতজ্ঞতা’।

সম্মাননার খবরে পাথারকান্দি থেকে সিঙ্গারী, প্রতাপগড় থেকে উনামগাঁও—সর্বত্রই বইছে আবেগ ও গর্বের স্রোত। স্থানীয় প্রবীণ সমাজকর্মী হরিশ্চন্দ্র শর্মা বলেন আমাদের সময় যদি কেউ শিক্ষার আলো জ্বালিয়ে ছিলেন, তিনি হলেন কোকিল সেনা সিনহা। তাঁকে সম্মান দেওয়া মানে পাথারকান্দির আত্মাকে সম্মান দেওয়া।

দুল্লভছড়ার বাঁশকানটিলা গ্রামে জন্ম নেওয়া কোকিল সেনা সিনহার শৈশব ছিল কঠিন বাস্তবতার সাক্ষী। খুব ছোটবেলাতেই বাবা-মাকে হারিয়ে প্রায় অনাথের মতোই আশ্রয় নেন পাথারকান্দির উনামগাঁওয়ে মামার বাড়িতে। সেখানেই শুরু তাঁর পাঠশালা, আর সেখান থেকেই গড়ে ওঠে শিক্ষার প্রতি তাঁর ভক্তি ও দায়িত্ববোধ।

পরিবারের একজন সদস্য স্মৃতিচারণ করে বলেন শৈশব থেকে তিনি ছিলেন অসম্ভব মনোযোগী। দারিদ্র্য ছিল তাঁর জীবনের সাথী, কিন্তু তিনি কখনও পড়াশোনাকে ভাঙতে দেননি। দরিদ্রতা অতিক্রম করে তিনি গুয়াহাটি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক উত্তীর্ণ হন—যা সেই সময়ে গ্রামের ছাত্রদের জন্য দৃষ্টান্তমূলক সাফল্য ছিল। ১৯৬১ সালে প্রতাপগড় অঞ্চলে শিক্ষাবিপ্লবের সূচনা হয় তার হাত দিয়েই। তিনি ১৯৬১ সালে সিঙ্গারী গ্রামে প্রতিষ্ঠা করেন প্রতাপগড় আঞ্চলিক পঞ্চায়েত এম-ই স্কুল। প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকেই তিনি ছিলেন বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক। তিনি শুধু পাঠদানই করেননি—তিনি ছিলেন শিক্ষক, সংগঠক, পরিকল্পনাকারী এবং পথপ্রদর্শক।

একজন সাবেক ছাত্র রামপ্রসাদ সেন বলেন কোকিল স্যার আমাদের শুধু বই পড়াননি, মানুষ হতে শিখিয়েছেন। তাঁর শাসন ছিল কঠিন, কিন্তু তাঁর হৃদয় ছিল সবার জন্য খোলা। ১৯৭০ সালে ওই বিদ্যালয়েই হাইস্কুল শাখার সূচনা করেন তিনি। বিদ্যালয়ের দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়নের কথা ভেবে তিনি নিজের মালিকানাধীন ১১ বিঘা জমি বিদ্যালয়ের নামে দান করেন যা আজও এলাকার মানুষের কাছে এক ঐতিহাসিক ঘটনা। সমাজ উন্নয়নের প্রতিটি স্তরে তাঁর ছাপ কোকিলসেনা সিনহা ছিলেন বহুমুখী কর্মী। তাঁর অবদান ছড়িয়ে আছে পাথারকান্দিতে আজও তিনি ছিল আজের পাথারকান্দি ব্লক বাজার প্রতিষ্ঠাতা, স্থানীয় শিবমন্দির নির্মাণে সক্রিয় ভূমিকা ছিল তাঁর পাথারকান্দি কলেজ ও বিএড কলেজ প্রতিষ্ঠা থেকে মৃত্যু দিন পর্যন্ত ছিলেন প্রতিষ্ঠা সভাপতি, ব্লক বাজারে স্কুল প্রতিষ্ঠা করা সহ গ্রামীণ সড়ক সংস্কার ও অবকাঠামো উন্নয়ন, সামাজিক সমস্যায় সচেতনতা গড়ে তোলাতে তিনি বিরাট অবদান রেখে গেছেন। এছাড়া বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য তাঁর অবদান পাথারকান্দি মডেল হাসপাতাল নির্মাণে। হাসপাতালের জন্য তিনি নিজেও ভূমি দান করেন। হাসপাতালের একজন প্রাক্তন কর্মচারী জানান এলাকার লোকেরা যাতে সহজ চিকিৎসা পায়, সেটাই ছিল তাঁর স্বপ্ন। তিনি হাসপাতাল গড়তে গিয়ে নিজের জমিও ছাড়তে দ্বিধা করেননি। গোকুলানন্দ গীতিস্বামী: সমাজজাগরণের নক্ষত্র, যাঁর আলোয় আলোকিত এই সম্মাননা গীতিস্বামী গোকুলানন্দ গীতিস্বামী বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরি সমাজের এক অনন্য স্রষ্টা গীতিকবি, নাট্যকার, সমাজ সচেতনতার পথিকৃৎ। তাঁর ১৩০তম আবির্ভাব তিথি উপলক্ষ্যে যখন রূপালি জয়ন্তীর মঞ্চ প্রস্তুত, তখন সমাজে দৃষ্টান্ত স্থাপনকারী একজন শিক্ষাবিদকে সম্মান জানানো একটি অর্থপূর্ণ উদ্যোগ বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। গীতিস্বামী গবেষক ড. নৃপেন সেনের মতে গোকুলানন্দ গীতিস্বামী ছিলেন সমাজজাগরণের প্রতীক। তাঁর মঞ্চ থেকে কোকিল সেনা সিনহাকে সম্মানিত করা মানে সমাজসেবার ধারাকে একই সুতোয় বাঁধা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *