মোহাম্মদ জনি, শ্রীভূমি।
বরাক তরঙ্গ, ১৯ অক্টোবর : শারদীয় দুর্গোৎসবের মহাষ্টমীর রাতে উৎসবের আনন্দে কার্যত জনসমুদ্রে পরিণত হলো ভারত-বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক সীমান্তবর্তী জেলা শ্রীভূমির সদর শহর। আলোর রোশনাই, বর্ণিল সাজসজ্জা, ঢাকের বাদ্যি আর সুসজ্জিত পুজো মণ্ডপের আকর্ষণে সন্ধ্যা নামতেই শহরের রাস্তাঘাটে নেমে আসে মানুষের ঢল। শহরের প্রধান সড়ক থেকে শুরু করে অলিগলি, বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ মোড় এবং পুজো মণ্ডপগুলিতে রাতভর দেখা যায় দর্শনার্থীদের উপচে পড়া ভিড়।
মহাসপ্তমীর পর মহাষ্টমীর রাতেও দুর্গাপুজোর আনন্দে মেতে ওঠেন আট থেকে আশি—সব বয়সের মানুষ। পরিবার-পরিজন, বন্ধু-বান্ধব ও প্রিয়জনদের সঙ্গে নিয়ে পুজো পরিক্রমায় বেরিয়ে পড়েন অসংখ্য মানুষ। নতুন পোশাকে সেজে শহরের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে ঘুরে বেড়ান দর্শনার্থীরা। কোথাও প্রতিমা দর্শন, কোথাও ছবি তোলার ব্যস্ততা, আবার কোথাও পরিচিতদের সঙ্গে আড্ডা—সব মিলিয়ে উৎসবের আবহে মুখরিত হয়ে ওঠে গোটা শ্রীভূমি শহর।

শুধু শহরের বাসিন্দারাই নন, জেলার বিভিন্ন প্রান্তের গ্রামাঞ্চল থেকেও বহু মানুষ মহাষ্টমীর রাতে পুজো পরিক্রমায় অংশ নিতে জেলা সদরে এসে ভিড় জমান। ফলে সন্ধ্যার পর থেকেই শহরের প্রধান সড়কগুলিতে বাড়তে থাকে মানুষের পাশাপাশি যানবাহনের চাপ। বিভিন্ন পুজো মণ্ডপের আকর্ষণীয় প্রতিমা ও আলোকসজ্জা দর্শনার্থীদের বিশেষভাবে আকৃষ্ট করে। বিশেষ করে পুলিশ পয়েন্ট সংলগ্ন ইউথ ইউনিটি ক্লাবের দুর্গাপুজো মণ্ডপে দর্শনার্থীদের উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো। শহরের অন্যান্য পুজো মণ্ডপেও রাতভর মানুষের আনাগোনা অব্যাহত থাকে।
তবে উৎসবের আনন্দের মধ্যেও শহরের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ রাস্তার বেহাল দশা সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ বাড়িয়ে তোলে। ভাঙাচোরা রাস্তা ও খানাখন্দের কারণে যাতায়াতে সমস্যার সম্মুখীন হতে হয় দর্শনার্থীদের। তা সত্ত্বেও দুর্গোৎসবের আনন্দে সামিল হতে সেই দুর্ভোগ উপেক্ষা করেই পুজো মণ্ডপে পৌঁছতে দেখা যায় বহু মানুষকে। উৎসবের মরশুমে শহরের গুরুত্বপূর্ণ রাস্তাগুলির সংস্কার ও উন্নয়নের প্রয়োজনীয়তা এই পরিস্থিতিতে নতুন করে সামনে এসেছে।

এদিকে, মহাষ্টমীর রাতে বিপুল জনসমাগমের মধ্যে নিরাপত্তা বজায় রাখা এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে তৎপর ছিল শ্রীভূমি জেলা পুলিশ। শহরের গুরুত্বপূর্ণ মোড়, জনবহুল এলাকা এবং পুজো মণ্ডপ সংলগ্ন স্থানে পুলিশি নজরদারি ও টহলদারি জোরদার করা হয়। দর্শনার্থীরা যাতে নির্বিঘ্নে প্রতিমা দর্শন করতে পারেন এবং কোনও অপ্রীতিকর ঘটনা না ঘটে, সেদিকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়।
নিরাপত্তা ব্যবস্থা সরেজমিনে খতিয়ে দেখতে পুলিশকর্মীদের নিয়ে মাঠে নামেন শ্রীভূমি জেলা পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ক্রাইম) ত্রিনয়ন ভূইয়া। শহরের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ এলাকা ও পুজো মণ্ডপ সংলগ্ন স্থানে উপস্থিত থেকে তিনি পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করেন। অন্যান্য পুলিশ আধিকারিকদেরও বিভিন্ন স্থানে দায়িত্ব পালন করতে দেখা যায়। বিপুল জনসমাগম সামাল দেওয়া, নিরাপত্তা ব্যবস্থা তদারকি এবং সাধারণ মানুষের চলাচল স্বাভাবিক রাখার ক্ষেত্রে পুলিশ আধিকারিকদের তৎপরতা ছিল চোখে পড়ার মতো।
একইভাবে, শহরের যান চলাচল স্বাভাবিক রাখতে সক্রিয় ভূমিকা পালন করে ট্রাফিক বিভাগ। সন্ধ্যা থেকে রাত পর্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সড়ক ও মোড়গুলিতে ট্রাফিক পুলিশের উপস্থিতি ছিল উল্লেখযোগ্য। পুজো মণ্ডপগুলির সামনে দর্শনার্থী ও যানবাহনের চাপ সামাল দেওয়া, যানজট নিয়ন্ত্রণ এবং সাধারণ মানুষের যাতায়াতের সুবিধা নিশ্চিত করতে ট্রাফিক কর্মীদের তৎপরতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করতে দেখা যায়।

জেলার বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা দর্শনার্থীদের শহরে প্রবেশ, পুজো মণ্ডপ পরিদর্শন এবং বাড়ি ফেরার পথে যাতে অযথা সমস্যায় পড়তে না হয়, সেদিকেও নজর রাখা হয়। বিপুল জনসমাগমের মধ্যেও যান চলাচল সুশৃঙ্খল রাখার ক্ষেত্রে জেলা পুলিশ ও ট্রাফিক বিভাগের সমন্বিত উদ্যোগ প্রশংসা কুড়িয়েছে বলে জানান শহরবাসী ও দর্শনার্থীদের একাংশ।
এ প্রসঙ্গে প্রাগ নিউজের শ্রীভূমি জেলা প্রতিনিধি সাংবাদিক রাহুল পাল বলেন, “মহাষ্টমীর রাতে শ্রীভূমি শহরে যেভাবে হাজার হাজার মানুষ উৎসবের আনন্দে শামিল হয়েছেন, তা সত্যিই নজরকাড়া। বিভিন্ন পুজো মণ্ডপে দর্শনার্থীদের উপচে পড়া ভিড়ের মধ্যেও শ্রীভূমি জেলা পুলিশ ও ট্রাফিক বিভাগের ভূমিকা অত্যন্ত প্রশংসনীয়। পুলিশ আধিকারিকদের সরেজমিনে পরিস্থিতি পরিদর্শন, পুলিশকর্মীদের নিরলস তৎপরতা এবং ট্রাফিক বিভাগের সুশৃঙ্খল যান নিয়ন্ত্রণের ফলে সাধারণ মানুষ অনেকটাই স্বাচ্ছন্দ্যে ও নিরাপদে পুজো পরিক্রমা করতে পেরেছেন।”

তিনি আরও বলেন, “উৎসবের সময় বিপুল জনসমাগম সামাল দিয়ে আইনশৃঙ্খলা বজায় রাখা এবং সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করা যথেষ্ট চ্যালেঞ্জের বিষয়। জেলা পুলিশ ও ট্রাফিক বিভাগ নিষ্ঠা, দক্ষতা ও আন্তরিকতার সঙ্গে সেই দায়িত্ব পালন করেছে। তাঁদের এই ইতিবাচক ও জনবান্ধব ভূমিকা নিঃসন্দেহে প্রশংসার দাবি রাখে।”
শহরের বিভিন্ন রাস্তার বেহাল দশা ও যাতায়াতের দুর্ভোগ সত্ত্বেও মহাষ্টমীর রাতে শ্রীভূমিতে দুর্গোৎসবের আনন্দে কোনও ভাটা পড়েনি। আলোকসজ্জা, ঢাকের বাদ্যি, সুসজ্জিত পুজো মণ্ডপ এবং দেবী দুর্গার দর্শনকে কেন্দ্র করে রাতভর উৎসবমুখর হয়ে ওঠে শহর। ভক্তি, আনন্দ ও সম্প্রীতির আবহে স্মরণীয় হয়ে থাকে মহাষ্টমীর রাত। একই সঙ্গে, হাজার হাজার মানুষের নিরাপত্তা ও নির্বিঘ্ন যাতায়াত নিশ্চিত করতে জেলা পুলিশ এবং ট্রাফিক বিভাগের সক্রিয় ভূমিকা বিশেষভাবে প্রশংসিত হয়।



