করিমগঞ্জ জেলার নাম পরিবর্তনের বিরুদ্ধে দীর্ঘস্থায়ী গণআন্দোলনের ডাক

Spread the news

বরাক তরঙ্গ, ৭ অক্টোবর : করিমগঞ্জ জেলার নাম পরিবর্তনের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে দীর্ঘস্থায়ী ও বৃহত্তর গণআন্দোলন গড়ে তোলার আহ্বান জানানো হয়েছে। বুধবার করিমগঞ্জের বিপিন চন্দ্র পাল স্মৃতি ভবনে দুপুর সাড়ে ১২টা থেকে অনুষ্ঠিত এক গণসমাবেশে এই আহ্বান জানান ‘করিমগঞ্জ জেলার নাম পরিবর্তন প্রতিরোধ নাগরিক কমিটি’র নেতৃবৃন্দ ও বক্তারা। সমাবেশে সভাপতিমণ্ডলীতে ছিলেন নাগরিক কমিটির আহ্বায়ক সুনীত রঞ্জন দত্ত, সুদীপ্তা দে চৌধুরী ও কার্যকরী সদস্য বিনয় হালাম। শুরুতেই আন্দোলনের প্রয়াত সংগঠক তথা কার্যকরী সদস্য পরিমল চক্রবর্তী ও ডা. নিলয় পালের স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে এক মিনিট নীরবতা পালন করা হয়।

সমাবেশে বক্তব্য রাখেন নাগরিক কমিটির উপদেষ্টা সুব্রত কুমার পাল, অন্যতম আহ্বায়ক অরুণাংশু ভট্টাচার্য, প্রবীণ চিকিৎসক ডাঃ মুস্তাফা আহমেদ চৌধুরী, শিলচর থেকে আগত গণআন্দোলনের নেতা অধ্যাপক অজয় রায়, বদরপুর নাম পরিবর্তনবিরোধী সংগ্রাম কমিটির প্রবীণ আহ্বায়ক হিফজুর রহমান, সুদীপ্তা দে চৌধুরী, কার্যকরী সদস্য প্রজ্জ্বল দেব এবং রাতাবাড়ির যুব নেতা হোসাইন আহমেদ।
বক্তারা অভিযোগ করেন, জনগণের মতামত উপেক্ষা করে করিমগঞ্জ জেলার ঐতিহাসিক নাম পরিবর্তন করা হয়েছে। তাঁদের বক্তব্য, একটি জেলার নাম শুধু প্রশাসনিক পরিচয় নয়; এর সঙ্গে মানুষের ইতিহাস, ঐতিহ্য, আত্মপরিচয় ও আবেগ জড়িয়ে থাকে। স্বাধীনতা আন্দোলন, মাতৃভাষার মর্যাদা রক্ষার আন্দোলন, নানকার বিদ্রোহ ও মুলুক চলো আন্দোলনের মতো ঐতিহাসিক সংগ্রামের স্মৃতি করিমগঞ্জ নামটির সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে যুক্ত বলেও তাঁরা দাবি করেন।

সমাবেশে বক্তারা প্রশ্ন তোলেন, জেলার নাম পরিবর্তনের ফলে সাধারণ মানুষ কী পেলেন? তাঁদের অভিযোগ, করিমগঞ্জ শহরের বেহাল রাস্তা, দুর্বল নিকাশি ব্যবস্থা, করিমগঞ্জ-বদরপুর সড়কের দুরবস্থা, স্বাস্থ্য পরিষেবার ঘাটতি, সরকারি স্কুল বন্ধ হয়ে যাওয়া, বেকারত্ব এবং শিল্পক্ষেত্রে স্থবিরতার মতো সমস্যাগুলির সমাধান হয়নি। পাঁচগ্রাম কাগজ কল বন্ধ হয়ে গেলেও নতুন শিল্প গড়ে ওঠেনি বলেও অভিযোগ করা হয়। পাশাপাশি রেল ও সড়ক যোগাযোগ, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, বিদ্যুৎ এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় সামগ্রীর মূল্যবৃদ্ধি নিয়েও ক্ষোভ প্রকাশ করেন বক্তারা।

তাঁদের অভিযোগ, এসব মৌলিক সমস্যা সমাধানের পরিবর্তে জেলার নাম পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত সাধারণ মানুষের ওপর অতিরিক্ত প্রশাসনিক জটিলতা ও আর্থিক চাপ সৃষ্টি করেছে। সরকারি নথি, পরিচয়পত্র, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও ব্যবসা-বাণিজ্যের ক্ষেত্রে নাম পরিবর্তনের প্রভাব পড়বে বলেও তাঁরা দাবি করেন।

বক্তারা বলেন, সাইনবোর্ড পরিবর্তন করে মানুষের হৃদয় থেকে ‘করিমগঞ্জ’ নাম মুছে ফেলা সম্ভব নয়। করিমগঞ্জের ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক পরিচয় রক্ষার জন্য দলমত, ধর্ম ও বর্ণ নির্বিশেষে মানুষকে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। তাঁদের বক্তব্য, “আমরা বিভাজন চাই না, ঐক্য চাই; ঘৃণা চাই না, অধিকার চাই।”

সমাবেশে বক্তারা বরাক উপত্যকায় বিভিন্ন প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেন। তাঁদের অভিযোগ, বিধানসভা আসন পুনর্নির্ধারণ, নাগরিকত্ব সংক্রান্ত বিভিন্ন প্রক্রিয়া এবং বদরপুরের নাম পরিবর্তনের উদ্যোগ সাধারণ মানুষের মধ্যে উদ্বেগ ও বঞ্চনার অনুভূতি তৈরি করেছে। এই পরিস্থিতিতে আরও বৃহত্তর গণআন্দোলন গড়ে তোলার প্রয়োজন রয়েছে বলে তাঁরা জানান।

নাগরিক কমিটির পক্ষ থেকে জানানো হয়, এর আগে নাম পরিবর্তনের বিরুদ্ধে ধারাবাহিক আন্দোলন ও গত বছরের ৬ সেপ্টেম্বর সর্বাত্মক জেলা সাধারণ ধর্মঘট সংগঠিত করা হয়েছিল। এবার আন্দোলনকে আরও বিস্তৃত ও সুসংগঠিত করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
আন্দোলনের পরবর্তী কর্মসূচি হিসেবে আসামের রাজ্যপাল ও মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করে স্মারকলিপি দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। জেলার বিভিন্ন স্থানে সভা, গণকমিটি গঠন ও কনভেনশন আয়োজন করা হবে। আগামী ১৯ নভেম্বর নাম পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত গ্রহণের দিনটিকে কেন্দ্র করে তীব্র প্রতিবাদ কর্মসূচি পালনেরও সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

সমাবেশের শেষে উপস্থিত প্রতিনিধিরা করিমগঞ্জ জেলার নাম পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত প্রত্যাহারের দাবিতে দীর্ঘস্থায়ী ও দুর্বার গণআন্দোলন গড়ে তোলার সংকল্প গ্রহণ করেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *