অর্পিতারানি দাসের ‘হিজল কন্যার ডায়েরি’ আমাদের গর্ব

Spread the news

।। পিঙ্কি দাস ।।
(শ্রীভূমি)
৪ মার্চ : ড. অর্পিতারানি দাসের ‘হিজল কন্যার ডায়েরি’ কাব্যগ্রন্থ শুধুমাত্র একটি কাব্যগ্রন্থ নয়–এ যেন শনবিলের আত্মকথা। ওনার কবিতার প্রতিটি পংক্তিতেই ফুটে উঠেছে শনবিলের অস্তিত্ব, সেইসব অনুচ্চারিত স্মৃতি, প্রান্তিক নারীদের নামহীন অস্তিত্বের নীরব অনুবাদ, গ্রামীণ মানুষের হাসি-কান্না, বিশ্বাস ও আচার, সংস্কৃতি ও মাটির গন্ধমাখা জনজীবনের সুরধ্বনি– যা আজকের প্রজন্মের কাছে প্রায় বিস্মৃত এক মহাকাব্যিক জীবনচিত্রের পুনর্লিখন।

আমি শনবিলের ভূমিপূত্রী নই। কিন্তু আমার জীবনের অনেকাংশ জুড়েই শনবিল। বিশেষ করে শৈশবকাল। যেহেতু শনবিল আমার মামার বাড়ি, ছোটবেলায় যখন মামার বাড়ি যেতাম, সন্ধ্যা নামার পর ওঠানে বসে সব ভাই-বোন মিলে দিদিমার কাছে গল্প শোনা ছিল রোজকার বায়না। তাই নুপুর টিলা, মোকাম আর কালীবাড়ি, চৌদ্দ মাধল মেলা, গল্পগুলো অনেক শুনেছি। পদ্মাপুরাণ, সুমেশ্বরী মেলা, জ্বরাজ্বরি ব্রত- এগুলো শুধু গল্প নয়, এইসব শব্দে সুরে-আখরে ফুটে ওঠে লোকসংস্কৃতির মহাকাব্যিক রূপ। হরিষেবা, ভুলা-পোড়া, গাইনে চিঁড়ে কুটা, ধান-কাটা, ধান মাড়াই করা, ধান ভানার মেশিন, সিংড়া, ক্ষেতের আলে বসে দুপুরে ভাত খাওয়া, আবার ঝড়ের সময় শনবিলের সেই প্রলয়ংকরী ঢেউয়ের মধ্যে প্রাণ হাতে নিয়ে বাড়ি ফেরা, মেশিন নৌকায় চেপে বরযাত্রী যাওয়া–এই সবকিছুর সঙ্গে আমি ওতপ্রোতভাবে জড়িত। অল্প হলেও অভিজ্ঞতা আছে। ‘হিজল কন্যার ডায়েরি’–আমার সুন্দর শৈশবকে আবারও ফিরিয়ে দিলো। সেই বাস্তব স্মৃতিচিত্র কবিতার শরীরে যেন নতুন জীবন পেয়েছে।

ড. অর্পিতা দাসের লেখায় যেন আমরা আবার শুনতে পাই নুপুর মাঝির গলা—তার ছন্দময় বৈঠার টান, তার নৌকা, তার নুপুরের মতো জীবন। তিনি শুধু চরিত্র সৃষ্টি করেননি, বরং আমাদের শোনান শনবিলের অন্তরাত্মার গান।

তাঁর কবিতায় চৌদ্দ মাধল মেলা, সুমেশ্বরী মেলা, হরিষেবা, মাঘ মণ্ডল ব্রত, বাঘ পূজার গান—সবকিছুই ফিরে আসে নতুন অর্থে, নতুন ব্যঞ্জনায়। পাঠক যেন শুধু পড়েন না, বরং অংশগ্রহণ করেন সেই লোকজ জীবনের প্রাণময় উৎসবে।

আজকের এই প্রযুক্তিনির্ভর যুগে, যখন মানুষ বই থেকে দূরে সরে যাচ্ছে, তখন ‘হিজল কন্যার ডায়েরি’ যেন এক আলোকবর্তিকা—যা আমাদের ফিরিয়ে নিয়ে যায় মাটি, মানুষ আর স্মৃতির কাছে। তাঁর লেখায় যেমন গ্রামীণ নারীজীবনের গোপন বেদনা, তেমনি আছে আত্মমর্যাদার দীপ্ত উচ্চারণ। তাঁর কলমের মধ্য দিয়ে আমরা নিজেদের হারানো পরিচয়, কৈবর্ত সমাজের লোকসংস্কৃতি, আমাদের নদী–পাহাড়–মাঠের সম্পর্ককে আবার চিনে নিতে পারি।

তাই এখানে জীবনানন্দ দাশের একটি কবিতার লাইন বিশেষ ভাবে প্রযোজ্য– “বাংলার মুখ আমি দেখিয়াছি,
তাই আমি পৃথিবীর রূপ
খুঁজিতে যাই না আর”

সবশেষে বলি, ড. অর্পিতারানি দাস-  আমাদের শনবিলের ‘হিজল কন্যা’, আমাদের গর্ব।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *