দুই শতাধিক মানুষের অংশগ্রহণ, ৫৪ বছরের পুরনো দাবি বাস্তবায়নের আহ্বান; সমাবেশ শেষে শান্তিপূর্ণ মিছিল করে জেলা আয়ুক্তের কার্যালয়ে স্মারকলিপি প্রদান
বরাক তরঙ্গ, ৭ নভেম্বর : বরাক উপত্যকায় গৌহাটি হাইকোর্টের একটি স্থায়ী বেঞ্চ প্রতিষ্ঠার দীর্ঘদিনের দাবিকে আরও জোরালো করে তুলতে আজ শিলচরে এক শান্তিপূর্ণ গণসমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। হাইকোর্ট বেঞ্চ ডিমান্ড ইমপ্লিমেন্টেশন কমিটি, কাছাড় জেলা ইউনিটের উদ্যোগে সকাল ১১টা থেকে দুপুর ১২টা পর্যন্ত শিলচর জেলা আয়ুক্তের কার্যালয়ের নিকট ক্ষুদিরাম বসুর মূর্তির পাদদেশে আয়োজিত এই সমাবেশে দুই শতাধিক মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ লক্ষ্য করা যায়। আইনজীবী, কবি, সাহিত্যিক, সাংবাদিক, প্রাক্তন জনপ্রতিনিধি, বিভিন্ন সামাজিক ও নাগরিক সংগঠনের প্রতিনিধি, শিক্ষাবিদ এবং ছাত্রছাত্রীসহ সমাজের বিভিন্ন স্তরের মানুষ এই কর্মসূচিতে অংশগ্রহণ করেন।
সমাবেশের মূল দাবি ছিল, বরাক উপত্যকার তিনটি জেলা কাছাড়, করিমগঞ্জ ও হাইলাকান্দি এবং পার্শ্ববর্তী ডিমা হাসাও জেলার মানুষের দীর্ঘদিনের প্রত্যাশা পূরণে বরাক উপত্যকার যেকোনো উপযুক্ত স্থানে গৌহাটি হাইকোর্টের একটি স্থায়ী বেঞ্চ প্রতিষ্ঠা করা। বক্তারা বলেন, এই দাবি কোনও বিশেষ ব্যক্তি, সংগঠন কিংবা আইনজীবী সমাজের একক দাবি নয়; বরং সমগ্র অঞ্চলের মানুষের ন্যায়বিচার লাভের সুযোগকে সহজ, সুলভ ও সুগম করার সঙ্গে সম্পর্কিত একটি গুরুত্বপূর্ণ গণদাবি।

উল্লেখ্য, বরাক উপত্যকায় হাইকোর্ট বেঞ্চ প্রতিষ্ঠার দাবি আজকের নয়। দীর্ঘ ৫৪ বছর ধরে এই দাবি বিভিন্ন পর্যায়ে উত্থাপিত হয়ে আসছে। ১৯৭২ সালের ১৯ এপ্রিল শিলচর জেলা বার সংস্থার পক্ষ থেকে এই দাবির সমর্থনে প্রথম আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব গ্রহণ করা হয়েছিল। কিন্তু পাঁচ দশকেরও বেশি সময় অতিবাহিত হওয়ার পরও সেই দাবি বাস্তবায়িত হয়নি। বক্তারা এই দীর্ঘসূত্রতার প্রসঙ্গ উল্লেখ করে বলেন, এত বছর পরেও বরাক উপত্যকার মানুষকে উচ্চ আদালতে বিচারপ্রার্থী হতে দীর্ঘ পথ অতিক্রম করতে হয়। এর ফলে সময়, অর্থ ও শ্রমের অতিরিক্ত ব্যয় বহন করতে হয়। বিশেষ করে সাধারণ ও আর্থিকভাবে দুর্বল বিচারপ্রার্থীদের জন্য এই পরিস্থিতি অত্যন্ত অসুবিধাজনক।

সমাবেশে বক্তব্য রাখেন কবি ও সাংবাদিক অতীন দাশ, প্রদীপ দত্তরায়, তৈমুর রাজা চৌধুরী, প্রাক্তন বিধায়ক নিহাররঞ্জন দাস, গৌতমপ্রসাদ দত্ত, প্রসেনজিৎ দেব, দীপক কুমার দেব, সুব্রত ভট্টাচার্য, অরুন্ধতী গুপ্ত, নিখিল পাল, সমর বিজয় চক্রবর্তী, রসরাজ দাস, কস্তুরি হোম চৌধুরী, দিলীপ কুমার দে, সঞ্জীব রায় ও গৌতম সিনহা। এছাড়াও বক্তব্য রাখেন অরুণ কুমার চন্দ মহাবিদ্যালয়ের ছাত্র স্নেহাংশু ভট্টাচার্য, রামানুজ গুপ্ত জুনিয়র কলেজের ছাত্রী নাদিয়া হাসান এবং সাংবাদিক দিলীপ সিং প্রমুখ।

বক্তারা তাঁদের বক্তব্যে বরাক উপত্যকায় স্থায়ী হাইকোর্ট বেঞ্চ প্রতিষ্ঠার ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট, ভৌগোলিক বাস্তবতা, বিচারপ্রার্থীদের দুর্ভোগ এবং ন্যায়বিচারকে মানুষের আরও কাছে পৌঁছে দেওয়ার প্রয়োজনীয়তার বিষয়গুলি তুলে ধরেন। তাঁরা বলেন, উচ্চ আদালতের বিচারিক পরিষেবার সুযোগ কেবল ভৌগোলিক বা আর্থিক সুবিধাপ্রাপ্ত মানুষের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকা উচিত নয়। বিচারব্যবস্থার বিকেন্দ্রীকরণ এবং মানুষের নাগালের মধ্যে বিচারিক পরিকাঠামো গড়ে তোলার বৃহত্তর স্বার্থেই বরাক উপত্যকায় একটি স্থায়ী বেঞ্চের দাবি যথাযথ গুরুত্ব সহকারে বিবেচনা করা প্রয়োজন।
বক্তাদের বক্তব্যে বিশেষভাবে উঠে আসে যে, বরাক উপত্যকা ও ডিমা হাসাওয়ের মানুষের উচ্চ আদালতকেন্দ্রিক বিচারিক প্রয়োজনের সঙ্গে ভৌগোলিক দূরত্বের একটি বাস্তব সম্পর্ক রয়েছে। গুয়াহাটি পর্যন্ত যাতায়াত, থাকা-খাওয়া এবং অন্যান্য আনুষঙ্গিক ব্যয় অনেক বিচারপ্রার্থীর পক্ষে বহন করা কঠিন হয়ে পড়ে। ফলে বিচারপ্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণের ক্ষেত্রেও নানা প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি হয়। তাঁদের মতে, বরাক উপত্যকায় একটি স্থায়ী বেঞ্চ প্রতিষ্ঠিত হলে বিচারপ্রার্থীদের দীর্ঘ যাত্রা ও আর্থিক বোঝা অনেকাংশে হ্রাস পাবে এবং বিচারিক পরিষেবা আরও সহজলভ্য হবে।

সমাবেশে ছাত্রছাত্রীদের অংশগ্রহণও বিশেষ তাৎপর্য বহন করে। অরুণ কুমার চন্দ মহাবিদ্যালয় ও রামানুজ গুপ্ত জুনিয়র কলেজের শিক্ষার্থীদের বক্তব্যে নতুন প্রজন্মের নাগরিক সচেতনতা এবং ন্যায়বিচারের সহজলভ্যতার প্রশ্নটি উঠে আসে। বক্তারা বলেন, হাইকোর্ট বেঞ্চ প্রতিষ্ঠার দাবি কেবল আইনজীবীদের পেশাগত সুবিধার বিষয় নয়; এটি সাধারণ মানুষের বিচার পাওয়ার সুযোগ, আঞ্চলিক সাম্য এবং বৃহত্তর জনস্বার্থের সঙ্গে যুক্ত।
সমাবেশের নির্ধারিত কর্মসূচি শেষে অংশগ্রহণকারীরা সমাবেশস্থল থেকে একটি শান্তিপূর্ণ মিছিল বের করে কাছাড়ের জেলা আয়ুক্তের কার্যালয়ের উদ্দেশ্যে অগ্রসর হন। মিছিলে অংশগ্রহণকারীরা বরাক উপত্যকায় স্থায়ী হাইকোর্ট বেঞ্চ প্রতিষ্ঠার দাবিতে বিভিন্ন স্লোগান দেন। পরে তাঁরা জেলা আয়ুক্তের কার্যালয়ে উপস্থিত হয়ে হাইকোর্ট বেঞ্চ ডিমান্ড ইমপ্লিমেন্টেশন কমিটি, কাছাড় জেলা ইউনিটের পক্ষ থেকে ভারতের মাননীয় প্রধান বিচারপতির উদ্দেশে একটি স্মারকলিপি প্রদান করেন। অতিরিক্ত জেলা আয়ুক্ত অরুণাভ চক্রবর্তী কমিটির প্রতিনিধিদের কাছ থেকে স্মারকলিপিটি গ্রহণ করেন।

স্মারকলিপিতে বরাক উপত্যকার যেকোনো উপযুক্ত স্থানে গৌহাটি হাইকোর্টের একটি স্থায়ী বেঞ্চ প্রতিষ্ঠার দাবি জানানো হয়। একই সঙ্গে ১৯৭২ সাল থেকে চলে আসা এই দাবির ঐতিহাসিক পটভূমি, অঞ্চলের ভৌগোলিক অবস্থান, বিচারপ্রার্থীদের বাস্তব সমস্যা এবং বিচারিক পরিষেবাকে সাধারণ মানুষের আরও কাছে পৌঁছে দেওয়ার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরা হয়। স্মারকলিপিটি গৌহাটি হাইকোর্টের মাননীয় প্রধান বিচারপতির মাধ্যমে ভারতের মাননীয় প্রধান বিচারপতির উদ্দেশে প্রেরণের জন্য জেলা প্রশাসনের কাছে জমা দেওয়া হয়। পাশাপাশি স্মারকলিপির একটি অনুলিপি ডাকযোগে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছেও পাঠানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
আয়োজকদের পক্ষ থেকে জানানো হয়, এই কর্মসূচির উদ্দেশ্য কোনও সংঘাত বা বিরোধ সৃষ্টি করা নয়; বরং দীর্ঘদিনের একটি গুরুত্বপূর্ণ জনদাবিকে গণতান্ত্রিক, শান্তিপূর্ণ ও সাংবিধানিক পদ্ধতিতে যথাযথ কর্তৃপক্ষের কাছে পৌঁছে দেওয়া। তাঁরা মনে করেন, বরাক উপত্যকায় স্থায়ী হাইকোর্ট বেঞ্চ প্রতিষ্ঠার প্রশ্নটি বৃহত্তর জনস্বার্থে বিবেচনা করা প্রয়োজন। এই দাবির সঙ্গে সমগ্র অঞ্চলের মানুষের বিচার পাওয়ার অধিকার, সময় ও অর্থ সাশ্রয় এবং বিচারিক পরিষেবার বিকেন্দ্রীকরণের বিষয়টি ওতপ্রোতভাবে জড়িত।

সমাবেশের মধ্য দিয়ে আরও একবার স্পষ্টভাবে উঠে আসে যে, বরাক উপত্যকায় স্থায়ী হাইকোর্ট বেঞ্চ প্রতিষ্ঠার দাবি আর কেবল আইনজীবী সমাজের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; এটি ক্রমশ বৃহত্তর নাগরিক সমাজের সম্মিলিত আকাঙ্ক্ষা ও মতামতের প্রতিফলন হয়ে উঠছে। ৫৪ বছরের দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে বরাক উপত্যকার মানুষের ন্যায়বিচার লাভের পথ আরও সহজ, সুলভ ও সুগম করার লক্ষ্যে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ এই দাবিকে গুরুত্ব সহকারে বিবেচনা করবেন, এমনই প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন সমাবেশে উপস্থিত বক্তা ও অংশগ্রহণকারীরা।
কার্যকরী সদস্য ও আইনজীবী ধর্মানন্দ দেব জানান, “গৌহাটি হাইকোর্ট যদি কোনও যুক্তিসঙ্গত কারণ ছাড়াই বরাক উপত্যকায় স্থায়ী হাইকোর্ট বেঞ্চ প্রতিষ্ঠার দাবিটি পুনরায় নাকচ করে, তবে কমিটি সুপ্রিম কোর্টের দ্বারস্থ হতেও পিছপা হবে না। একই সঙ্গে, এই ন্যায্য দাবি আদায়ের লক্ষ্যে সম্পূর্ণ গণতান্ত্রিক ও শান্তিপূর্ণ পদ্ধতিতে আন্দোলন অব্যাহত রাখা হবে।”



