মোহাম্মদ জনি, শ্রীভূমি।
বরাক তরঙ্গ, ৪ নভেম্বর : হিন্দুস্থান ক্লাবের প্রতিমা বিসর্জনকে কেন্দ্র করে বিহু শিল্পীদের উপর হামলার ঘটনায় কারাবন্দি সাত যুবক অবশেষে জামিনে মুক্তি পেলেন। বুধবার আদালতের যাবতীয় আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার পর বিকেল প্রায় চারটা নাগাদ তাঁদের কারাগার থেকে মুক্তি দেওয়া হয়। টানা ১১ দিন জেলবন্দি থাকার পর প্রিয়জনদের কাছে পেয়ে আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েন মুক্তিপ্রাপ্ত যুবকদের অনেকেই। নিকটাত্মীয়দের জড়িয়ে ধরে কান্নায় ভেঙে পড়েন তাঁরা।
জামিনে মুক্তি পেয়ে মন্ত্রী কৃষ্ণেন্দু পাল, বিধায়ক কমলাক্ষ দে পুরকায়স্থ, উত্তর ও দক্ষিণ করিমগঞ্জের বিধায়ক, জেলা বিজেপির নেতৃবৃন্দসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতা এবং সাধারণ মানুষের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন যুবকরা।

উল্লেখ্য, মঙ্গলবার চার্জশিট দাখিলের প্রক্রিয়ায় বিলম্বের কারণে তাঁদের জামিন মঞ্জুর হয়নি। তবে বুধবার সকাল থেকেই জামিনের জন্য তৎপর হয়ে ওঠেন আইনজীবীরা। মামলার তদন্ত শেষে পুলিশ বিহু শিল্পীদের উপর হামলার ঘটনায় পাঁচজনকে অভিযুক্ত করে আদালতে চার্জশিট দাখিল করে। অভিযুক্তরা হলেন অভিজিৎ দাস, অভিজিৎ দেব, দীপঙ্কর দাস, আলোক দাস ও রাকু পাল। তাঁদের বিরুদ্ধে ভারতীয় ন্যায় সংহিতার ১৮৯, ২৯৬ ও ১১৫ ধারায় মামলা দায়ের করা হয়েছে।

প্রাথমিকভাবে ভারতীয় ন্যায় সংহিতার ১০৯ ধারাও যুক্ত করা হলেও তদন্তে এই গুরুতর অভিযোগের পক্ষে যথেষ্ট তথ্যপ্রমাণ না মেলায় চার্জশিটে ওই ধারা অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। ফলে চার্জশিটে উল্লেখিত ধারাগুলি জামিনযোগ্য হওয়ায় নিম্ন আদালত অভিযুক্তদের জামিন মঞ্জুর করেন বলে জানিয়েছেন আইনজীবীরা।
জেলবন্দি যুবকদের জামিনের পক্ষে আদালতে সওয়াল করেন ডিস্ট্রিক্ট অ্যাডভোকেটস বারের সভাপতি তরুণ চক্রবর্তী, সম্পাদক বিজন কুমার পাল, রাজেশ মাল্লাহ, শুভঙ্কর চক্রবর্তী, হীরক দত্ত-সহ একাধিক আইনজীবী। বার কাউন্সিলের চেয়ারম্যান তথা গৌহাটি হাই কোর্টের বরিষ্ঠ আইনজীবী হাফিজ রশিদ আহমদ চৌধুরীর পরামর্শে ডিস্ট্রিক্ট অ্যাডভোকেটস বারের পক্ষ থেকে একটি বিশেষ আইনজীবী দল গঠন করে মামলাটি পরিচালনা করা হয়। আইনজীবী হীরক দত্ত জানান, প্রাথমিক এফআইআরের ভিত্তিতে পুলিশ যে ধারাগুলি যুক্ত করেছিল, সেগুলি ছিল অত্যন্ত গুরুতর ও জামিন-অযোগ্য। সেই কারণেই প্রথম পর্যায়ে চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালত তাঁদের জামিনের আবেদন খারিজ করেছিলেন।

পরবর্তীতে মামলাটি সেশন আদালতে বিচারাধীন থাকাকালীন পুলিশ তদন্ত শেষ করে চার্জশিট দাখিল করে। তদন্তে প্রাথমিক অভিযোগের কয়েকটি গুরুতর বিষয়ের সপক্ষে নির্দিষ্ট প্রমাণ পাওয়া যায়নি। ফলে চার্জশিটে অন্তর্ভুক্ত ধারাগুলি জামিনযোগ্য হওয়ায় ফার্স্ট ক্লাস ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে বিচারযোগ্য হয়েছে বলে তিনি জানান।
বুধবার বিকেলে জেল থেকে মুক্তি পান অর্ণব রায়, সুমিত দাস, প্রিয়াংশু পাল-সহ অন্যরা। তাঁদের স্বাগত জানাতে কারাগারের সামনে ভিড় করেন আত্মীয়স্বজন, রাজনৈতিক নেতা ও অসংখ্য সাধারণ মানুষ। উপস্থিত ছিলেন উত্তর করিমগঞ্জের বিধায়ক জাকারিয়া আহমেদ, দক্ষিণ করিমগঞ্জের বিধায়ক আমিনুর রশিদ চৌধুরী, জেলা বিজেপির প্রাক্তন সভাপতি সুব্রত ভট্টাচার্য, পুরকমিশনার ডা. দেবতোষ পাল, সৌমশঙ্কর বিশ্বাস, অনুপম দাস চৌধুরী, রাজশেখর দত্ত, সন্দীপ নন্দী, পার্থসারথী দাস, শুভজিৎ চক্রবর্তী, মান্না দে, করণ দাস পুরকায়স্থ, ময়ূরাক্ষী বিশ্বাস ও তন্ময় মজুমদার-সহ বিশিষ্ট ব্যক্তিরা। এদিকে, ভিডিও বার্তার মাধ্যমে জামিনে মুক্ত যুবকদের সঙ্গে কথা বলেন কাটিগড়ার বিধায়ক কমলাক্ষ দে পুরকায়স্থ।
দীর্ঘ ১১ দিনের কারাবাসের পর মুক্তির স্বাদ পেয়ে আবেগ সামলাতে পারেননি অনেকেই। প্রিয়জনদের কাছে পেয়ে তাঁদের চোখে ছিল আনন্দাশ্রু। মুক্তিপ্রাপ্তদের কয়েকজনের মুখে শোনা যায় একই আক্ষেপ—“দোষ না করেও দোষী সাব্যস্ত করা হয়েছে।”



